বিশিষ্ট লেখক এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে বছর দেড়েক আগে মৌলবাদী চক্র প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার পর থেকেই তাকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তখন থেকেই তার নিরাপত্তায় প্রতিদিন ২১ জন পুলিশ নিযুক্ত ছিলেন। ২৪ ঘণ্টায় পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করতেন তারা। গত ৩ মার্চ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অনুষ্ঠান চলাকালে জাফর ইকবালের ওপর যখন হামলা হয় তখনও তার নিরাপত্তায় সেখানে তিন জন পুলিশ দাঁড়িয়েছিল। অর্থাৎ নিরাপত্তারক্ষী থাকা অবস্থায় হামলার শিকার হয়েছেন তিনি। এ কারণে এই শিক্ষাবিদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও ঢিলেমি ছিল কিনা হামলার পর এখন সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
সোমবার (৫ মার্চ) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শাবির টিচার্স কোয়ার্টারের এক নম্বর বিল্ডিংয়ের সামনে দুই পুলিশ অবস্থান করছে। এই বিল্ডিংয়ের তিন তলায় অধ্যাপক জাফর ইকবালের বাসা। টিচার্স কোয়ার্টারের প্রবেশ মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রহরী রয়েছে। এখানে সার্বক্ষণিক একজন করে প্রহরী অবস্থান করেন। কানু নাথ,মনির, জামাল এবং কবির মোট চার জন প্রহরী পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।
গিয়ে দেখা মেলে প্রহরী কানু নাথের। তিনি অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘অনেক আগে স্যারের (জাফর ইকবাল) বাসার সামনে ও সঙ্গে অনেকগুলো পুলিশ এবং গাড়ি থাকতো। তবে ইদানিং দুই-তিন জন করে থাকে।’ হামলার ঘটনার দিন (শনিবার) কানু নাথ সকালের ডিউটিতে ছিলেন। তিনি জানান, সকাল ৯টার দিকে অধ্যাপক জাফর ইকবাল বাসা থেকে বের হলে দুই-তিন জন পুলিশ তার সঙ্গে ক্যাম্পাসে যায়। পরে দুপুর ২টায় ডিউটি শেষে কানু নাথ বাড়ি চলে যান বলে জানান।
কথা হয় প্রহরী মনির উদ্দিনের সঙ্গেও। অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলার দিন দুপুর ২টায় ছিল তার ডিউটি। তিনিও জানান, ইদানিং অধ্যাপক জাফর ইকবালের নিরাপত্তায় পুলিশ কম দেখছেন তারা। মনির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জাফর ইকবাল দম্পতিকে হত্যার হুমকি দেওয়ার পর অনেক পুলিশ বাসার সামনে এবং সব সময় সঙ্গে থাকতো। তবে এখন আর সেটা দেখা যায় না।’ আগে কত জন থাকতো জানতে চাইলে তিনি জানান, আগে সঙ্গে ৫/৬জন এবং বাসার সামনেও ৫/৬জন থাকতো। তবে এখন ২/৩জনের মতো থাকতে দেখা যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, পুলিশের ফোর্স কম থাকায় আগের তুলনায় কম পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে। ২০১৬ সালে হত্যার হুমকির পরে ড. জাফর ইকবালের সঙ্গে যে পরিমাণ পুলিশ মোতায়েন ছিল ততো পুলিশ এখন মোতায়েন নেই বলেও জানান তিনি।
২০১৬ সালের ১২ অক্টোবর অধ্যাপক ড.মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও তার স্ত্রী অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হককে মোবইল ফোনে হত্যার হুমকি দেওয়ার ঘটনায় জালালাবাদ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তারা। জঙ্গি সংগঠন আনসার উল্লাহ বাংলা টিমের পরিচয়ে এ হুমকি দেওয়া হয়। এরপর থেকে তাদের নিরাপত্তার জন্য ১২ জন পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মো. আবদুল ওয়াহাব বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, অধ্যাপক জাফর ইকবালের জন্য সার্বক্ষণিক ২১ জন পুলিশ নিযুক্ত আছে। ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই তৎকালীন ডিআইজি কামরুল হাসান স্বাক্ষরিত নির্দেশ অনুযায়ী, জাফর ইকবালে বাসায় মোট পাঁচ জন, তিনি যেখানে ক্লাস নেন সেই আইআইসিটি ভবনে ছয় জন, প্রশাসনিক ভবনে পাঁচ জন, মাইক্রোবাসের সঙ্গে পাঁচ জন, হাঁটার সময়ে সামনে তিন জন পেছনে তিন জনসহ মোট ছয় জন, সবসময় সাদা পোশাকে একজন মোতায়েন রয়েছেন। এই নির্দেশ অনুযায়ীই তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা চলছে।
সব সময় পুলিশ তাদের ডিউটি পালন করছে উল্লেখ করে জালালাবাদ থানার (ওসি) শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওপর মহলের নির্দেশনায় জাফর স্যারের সঙ্গে অনেক আগে থেকেই পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এমনকি স্যার ঢাকায় গেলেও পুলিশ প্রোটেকশনে যান। উনার বাসা, অফিসেও সার্বক্ষণিক পুলিশ তাদের ডিউটি পালন করছে।’
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের বাসভবনসহ উনার সঙ্গে সার্বক্ষণিক পুলিশের নিরাপত্তা থাকতো। পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোনও কমতি ছিল না। তবুও আমাদের দুই পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।’
অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ব্যক্তিগত সহকারী মো. জয়নাল আবেদীন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বর্তমানে শাবির টিচার্স কোয়ার্টারের বাসায় কেউ অবস্থান করছেন না।
উল্লেখ্য, শনিবার (৩ মার্চ) বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটে শাবি ক্যাম্পাসে একটি অনুষ্ঠান চলাকালে ড. জাফর ইকবালকে পেছন থেকে মাথায় ছুরিকাঘাত করে ২৪-২৫ বছর বয়সী এক তরুণ। এরপর তাকে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রাতেই তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচে) নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে তিনি শঙ্কামুক্ত রয়েছেন বলে জানান চিকিৎসকরা।







