শিক্ষার্থীরা কেন কাঁদবে, গলদ কোথায়?

জাকিয়া আহমেদ
১৮ আগস্ট ২০১৬, ২২:৫৭আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৬, ২৩:৩২

আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের কান্না ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠজুড়ে তখন শিক্ষার্থীদের বাঁধভাঙা উল্লাস। কখনও বাদ্যের তালে তালে, কখনও মাইকে বাজানো গানের সঙ্গে সমানতালে নেচে চলেছে এবারের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ-ফাইভ পাওয়া শিক্ষার্থীরা। এরই মাঝে দৃষ্টি কাড়ে কয়েকজন। মায়ের বুকে আর বন্ধুর কাঁধে মাথা রেখে কাঁদছে কয়েকজন শিক্ষার্থী। কিন্তু কেন শিক্ষার্থীরা জিপিএ-৫ না পেয়ে কাঁদবে? এ প্রসঙ্গে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা মনে করেন,  প্রচলিত ত্রুটিযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা, পারিবারিক ও সামাজিক চাপ শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপে ফেলছে। আশানুরূপ ফল না পেয়ে তারা হতাশ হচ্ছে। তারা বলছেন, জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় নামার প্রবণতাই দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান গলদ। সমাজের এই ভ্রান্ত ধারণা বদলেরও পরামর্শ দেন তারা।

সরেজমিনে দেখে গেছে, ফল ঘোষণার পর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাণিজ্য বিভাগ থেকে ৪ দশমিক ৫ পেয়ে লিজা জিপিএ ফাইভ পাওয়া বন্ধু যুথীর কাঁধে মাথা রেখে কাঁদছিল। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল অন্য বন্ধুরাও। জিপিএ ফাইভ পেলেও তারা বন্ধুর জন্য কাঁদছে। বলছে, এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। আমরা একই শিক্ষকের কাছে পড়েছি, সবসময় গ্রুপ স্টাডি করেছি। তাই আজ ওর এই কান্না মেনে নিতে পারছি না। শুধু লিজাই নয়, মায়ের বুকে মাথা রেখে কাঁদছিল তাহিয়াও। কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, বাবা তো আমার সঙ্গে কথাই বলবেন না। মেয়েকে সান্ত্বনা দিলেও মায়ের চোখে ছিল জল।  মেয়ের চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলছিলেন, মন খারাপ করার কিছু নেই, সামনে এখনও অনেক সময় আছে।

এ প্রসঙ্গে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সুফিয়া খাতুন বলেন, গতবারের তুলনায়  এবারে জিপিএ ফাইভ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। গতবার জিপিএ ফাইভ পেয়েছিলেন ৯৩৩ জন আর এবার ১ হাজার ১৪০ জন। গতবার পাসের হার ছিল ৯৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ আর এবার সে সংখ্যা ৯৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ।  

পাসের হার এবং জিপিএ-হার বেশি হওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের এ কান্না থামেনি, আর এ কান্না উদ্বেগে ফেলেছে সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, জিপিএ ফাইভ না পাওয়াটা যতটা না পড়াশোনার ভালোমন্দ নির্ণয় করে, তার চেয়ে বেশি  সামাজিক-পারিবারিক স্ট্যাটাস নির্ণয় করে। আর তাই জিপিএ ফাইভ না পাওয়াটা হয়ে গিয়েছে কান্নার মূল কারণ।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জানা গেল, এবছর নতুন করে প্রায় এক যুগ পর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় চালু হয়েছে নম্বর পদ্ধতি, যোগ হয়েছে গ্রেড পদ্ধতিও।

গ্রেড পয়েন্ট এবং নম্বরের কারণে অনেকেই এবার ফাইভ পায়নি বলে জানালেন যুথী। শিক্ষার্থীদের থেকে জানা গেল, নতুন যুক্ত হওয়া এ পদ্ধতিতে ৮০ থেকে ১০০ নম্বর পেলে সেটি এ প্লাস।  গ্রেড পয়েন্ট ৫। গ্রেড পয়েন্ট ৪ এবং এ গ্রেডের নম্বর ৭০ থেকে ৭৯। কোন বিষয়ে ৬০ থেকে ৬৯ নম্বর পেলে সেটি এ মাইনাস এবং ৩ দশমিক ৫ গ্রেড পয়েন্ট হবে এ মাইনাসের জন্য। শিক্ষার্থীরা কেন কাঁদবে, গলদ কোথায়?

অন্যদিকে, গ্রেড বি এর গ্রেড পয়েন্ট ৩ আর এ লেটার গ্রেডের নম্বর ৫০ থেকে ৫৯। সি গ্রেডে তুলতে হবে ৪০ থেকে ৪৯ নম্বর।এক্ষেত্রে গ্রেড পয়েন্ট ২। ডি গ্রেড পেলে তার গ্রেড পয়েন্ট ১ এবং এ গ্রেডের নম্বর ৩৩ থেকে ৩৯।

আর ৩৩-এর কম নম্বর পেলেই সেটি হবে এফ গ্রেড। কোনও বিষয়ে ০ থেকে ৩২ নম্বর পেলে তিনি অকৃতকার্য বিবেচিত হবেন আর এ নম্বরের কোনও গ্রেড পয়েন্ট নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‍শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মো.আবদুল আউয়াল খান বাংলা টিবিউনকে বলেন, জিপিএ ফাইভ পাওয়াটা এখন হয়ে গেছে সামাজিক মানসম্মানের  প্রতীক। কিন্তু জিপিএ ফাইভ আর প্রকৃত জ্ঞানার্জন যে এক নয়—এটা আমরা শিক্ষকরাও বুঝি না।  তিনি বলেন,  শিক্ষার্থীদের ভেতর গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে, জিপিএ ফাইভ না পেলে সামাজিক সম্মান থাকবে না। অভিভাবকদের এ ক্ষেত্রে গাইড করতে হবে ঠিকমতো। শিক্ষার্থীদের সব রকমের সমস্যা চিহ্নিত করে তাদের সে অনুযায়ী সমাধান দিতে হবে। আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে।

শিক্ষার্থীরা কেন কাঁদবে, গলদ কোথায়?

রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড মানসিকতা আমাদের শিক্ষার্থীদের এ কান্নার জন্য দায়ী বলে মনে করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম।তিনি বলেন, পরিবার  এবং সমাজ থেকে আমাদের সন্তানদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তোমাকে প্রথম হতে হবে, জিপিএ ফাইভ পেতে হবে, নতুবা সমাজে মুখ দেখানো যাবে না। এই যে আজ শিক্ষার্থীরা কাঁদছে, তার যতটা তাদের জিপিএ ফাইভ না পাওয়ার জন্য, তারচেয়ে বেশি তার নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের সমাজের কাছে হেয় হওয়ার আশঙ্কায়। 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সুফিয়া খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জিপিএ ফাইভ না পাওয়া কোনও হতাশার বিষয় নয়। জীবনে সাফল্যের পালক অনেকভাবেই যুক্ত করা যায়। সেদিকে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ দেওয়া দরকার।     

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যারা এবার ফাইভ না পেয়ে ভাবছেন জীবনের সব শেষ হয়ে গেল, তাদের বলছি, জীবন মাত্র শুরু। কান্না কোনও সমাধান নয়। জীবনে অনেক কিছু করার আছে। অনেক সুযোগ সামনে পড়ে আছে। কেউ যদি ট্যালেন্ট হয়, তাহলে সে বেরিয়ে আসবে, সাফল্য এসে ধরা দেবে তার হাতে।

উল্লেখ্য, এবার সারা দেশে আটটি সাধারণ শিক্ষাবোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের গড় হার ৭৪ দশমিক ৭০। কলেজ বোর্ডগুলোর ফলাফলে পাসের হার ৭২.৪৭ শতাংশ। মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৮৮ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৮৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

 আরও পড়ুন: এইচএসসিতে পাসের হার ৭৪.৭০%

/এমএনএইচ/

 

 

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাশিয়া যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান
রাশিয়া যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
শুরু হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ভাতা পরিশোধ
শুরু হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ভাতা পরিশোধ
২০০ টাকায় দেখা যাবে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজ
২০০ টাকায় দেখা যাবে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজ
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী