কর্মচারীর হাতে শিক্ষিকা খুন 

বিধি উপেক্ষা করে দেড় শতাধিক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ 

এস এম আববাস 
০৯ মার্চ ২০২৬, ২১:০০আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ২২:৫৬

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ দায়িত্ব গ্রহণের দেড় বছরের মধ্যেই বিধি উপেক্ষা করে দেড় শতাধিক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন। কোনও যাচাই-বাছাই ছাড়া শুধু তদবির আর বাণিজ্যের আশ্রয় নিয়ে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে একের পর এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর অবৈধভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া কর্মচারীর হাতেই সম্প্রতি শিক্ষিকা খুন হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক। ক্যাম্পাসে তৈরি হয়েছে ভীতিকর পরিবেশ। উপাচার্যের নানা অনিয়মে ভেঙে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাও। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমতি ছাড়াই নিয়োগ কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য নকীব নসরুল্লাহ এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিভিন্ন তদবির আমল নিয়েও বাণিজ্যের আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন সময় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন। নিয়োগপ্রাপ্ত চুক্তিভিত্তিক অনেক কর্মচারী মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত বলেও জানা গেছে। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত কর্মচারীরাও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিধি বহির্ভূতভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা (ইউজিসি) চিঠি দিচ্ছি, নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও অনুমতি না নিয়ে কতজনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।” 

ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল ইউজিসি থেকে ইবি উপাচার্যকে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও অনুমতি না নিয়ে কতজনকে আগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং উপাচার্য যোগদানের পর থেকে কতজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য জানার পর রাষ্ট্রপতির কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে ইউজিসি। 

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অভিযোগ, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের নিয়মিত কর্মচারীদের মতো প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা তদারকির আওতায় রাখা হয় না। এতে তাদের কার্যক্রমে দায়বদ্ধতা কম থাকে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ফাঁকফোকর তৈরি হয়। 

উপাচার্য হিসেবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিয়োগ পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য মনোনয়ন দেন উপাচার্য নকীব নসরুল্লাহ। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় বিএনপিপন্থিদের বাদ দিয়ে জামায়াতপন্থিদের সুবিধা দেন তিনি। এর প্রতিবাদে তৎকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিএনপিপন্থি তিন শিক্ষক নেতা পদত্যাগ করেন। পদত্যাগ করার শিক্ষক নেতারা হলেন, জিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় মহাসচিব অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন, সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান এবং ইউট্যাব ইবি শাখার সভাপতি অধ্যাপক ড. তোজাম্মেল হোসেন। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় উপাচার্য বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের ‘সাইড’ করে রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।  

বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় বিভিন্ন দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের বঞ্চিত করে রাখলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফুল দিয়ে উপাচার্যের চেয়ার ধরে রাখার চেষ্টা করছেন এই উপাচার্য। সম্প্রতি ঢাকায় গিয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে ফুল দেন তিনি।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পরও উপাচার্য নকীব নসরুল্লার বিরুদ্ধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে অসম্মানের অভিযোগ ওঠে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া মোনাজাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ না করাকে কেন্দ্র করেও হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্বিতীয় দফায় দোয়া মোনাজাত করা হয় এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। উপাচার্যের নানান অপ্রীতিকর কর্মকাণ্ড নিয়ে বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। নিয়োগ নিয়েও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। 

নিয়োগ ও বিশৃঙ্খলা নিয়ে জানতে চাইলে ইউট্যাব ইবি শাখার সভাপতি অধ্যাপক ড. তোজাম্মেল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “কীভাবে নিয়োগ হলো—উপাচার্যের কাছে জানতে চান। আমরা এই নিয়োগের পক্ষে নই। আমাদের সঙ্গে পরামর্শও করেননি উপাচার্য। উপাচার্য যোগদানের পর থেকে তিনি কোনও পরামর্শ করেননি।”

বর্তমান উপাচার্য নকিব নসরুল্লাহর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই অস্থিরতা তৈরি হয়নি বরং তার দফতরেও শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীরা একাধিকবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ নিয়েও শুরু হয়েছিল সমালোচনা। 

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাজিদ আবদুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় বছর হতে চললেও এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শিক্ষকদের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। গত ১৭ জুলাই সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুর থেকে তার ভাসমান লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তাকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনা উঠে আসে। শিক্ষার্থীর এমন হত্যাকাণ্ডের পর ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্পট ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নির্দেশে আগে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের বেতন বোনাস না দিয়ে পরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের বেতন বোনাস দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জটিলতায় শিক্ষিকাকে খুনের শিকার হতে হয়েছে।   

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতে, সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা, সমন্বয়হীনতা ও দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ক্যাম্পাসে স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা, জবাবদিহি এবং কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ব্যর্থতার অভিযোগসহ নানা প্রসঙ্গে উপাচার্য অধ্যাপক নকিব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে সোমবার দুপুরে বলেন, “আমার এখন সময় নেই আমি এখন হলের প্রোগ্রামে আছি।” 

এরপর থেকে রাত আটটা পর্যন্ত কয়েক দফায় ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। মেসেজ দিলেও উত্তর পাওয়া যায়নি।  

/এসটি/ এমওএফ/
সম্পর্কিত
ট্রাকের নিচে অটোরিকশা চাপা পড়ে প্রাণ গেলো ৩ জনের
যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো ২ মোটরসাইকেল আরোহীর
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলা, আরও এক মার্কিন সেনা নিহত
সর্বশেষ খবর
আজও দেশের বেশিরভাগ এলাকায় বৃষ্টির পূর্বাভাস, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের শঙ্কা
আজও দেশের বেশিরভাগ এলাকায় বৃষ্টির পূর্বাভাস, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের শঙ্কা
বিএনপি শুধু গণভোটকে অস্বীকার নয়, তাদের ৩১ দফা অঙ্গীকারও মানছে না: আখতার হোসেন
বিএনপি শুধু গণভোটকে অস্বীকার নয়, তাদের ৩১ দফা অঙ্গীকারও মানছে না: আখতার হোসেন
যমজ দুই বোনের সাফল্য দেখে গর্বিত বাবা-মা, খুশি শিক্ষকরা
যমজ দুই বোনের সাফল্য দেখে গর্বিত বাবা-মা, খুশি শিক্ষকরা
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
সর্বাধিক পঠিত
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
দলীয় এমপির ভিডিও ভাইরাল ইস্যুতে যা বললো জামায়াত
দলীয় এমপির ভিডিও ভাইরাল ইস্যুতে যা বললো জামায়াত
শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধের মুখে টিটিই বরখাস্ত, ৮ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু
শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধের মুখে টিটিই বরখাস্ত, ৮ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু