১১৫ দিন ক্লাস করেই বসতে হবে আগামী এসএসসিতে 

এস এম আববাস 
১৭ মে ২০২৬, ০৮:০০ আপডেট : ১৭ মে ২০২৬, ০৮:০৪

আগামী ২০২৭ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা ক্যালেন্ডার হিসাব করে দেখা গেছে, দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা চলতি বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত বাকি সাড়ে ৭ মাসে মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণি পাঠদানের (ক্লাস) সুযোগ পাবে মাত্র ১১৫ দিন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস শেষ করে শিক্ষার্থীরা কীভাবে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হবে— তা নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে।

শিক্ষা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ১৪ মে থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বছরের বাকি থাকে ২৩০ দিন। এর মধ্যে শুক্রবার ও শনিবার মিলিয়ে সাপ্তাহিক ছুটি রয়েছে ৭০ দিন। এছাড়া ঈদুল আজহা এবং গ্রীষ্মকালীন ছুটি ১২ দিন, আশুরা একদিন (শুক্রবার), আষাঢ়ি পূর্ণিমা একদিন, ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস একদিন, আখেরি চাহার সোম্বা একদিন, ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী একদিন, জন্মাষ্টমী একদিন, ফাতেহা-ই-ইয়াজ দাহম একদিন, মধু পূর্ণিমা একদিন, মহালয়া একদিন, ১৮ থেকে ২২ অক্টোবর দুর্গাপূজা ৫ দিন, ২৫ অক্টোবর লক্ষ্মীপূজা ও প্রবারণা পূর্ণিমা একদিন, নভেম্বর শ্যামাপূজার একদিনসহ মোট ছুটি আছে ২৮ দিন।

অর্থাৎ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ছুটি ২৮ দিন এবং সাপ্তাহিক ছুটি ৭০ দিন মিলিয়ে মোট ছুটি ৯৮ দিন। তবে সাপ্তাহিক ছুটির ভেতর কিছু সরকারি ছুটি পড়ে যাওয়ায় মোট ছুটির দিন দাঁড়ায় ৯১ দিন।

২৩০ দিন থেকে ৯১ দিন বাদ দিলে সেশন থাকে ১৩৯ দিন। এর মধ্যে অর্ধবার্ষিক, বার্ষিক, প্রি-টেস্ট ও টেস্ট পরীক্ষার কারণে আরও ২৪ দিন শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। ফলে সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের সরাসরি ক্লাস করার জন্য অবশিষ্ট থাকছে মাত্র ১১৫ দিন।

পরীক্ষা এগিয়ে আনার এই সিদ্ধান্তে অনেক অভিভাবকই উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, পরীক্ষা যদি প্রথাগতভাবে ফেব্রুয়ারিতে শুরু করা যেতো, তবে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রস্তুত করার জন্য আরও কিছুটা সময় পেতো। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণ করা বেশ কঠিন হবে বলে মনে করছেন অভিভাবকরা।

শ্রেণিপাঠ ব্যাহত হওয়ার নেপথ্যে 

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা গত বছরেও নানা কারণে শ্রেণিপাঠ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম দুই মাস দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পড়ালেখা ব্যাহত হয়েছিল। এরপর চলতি বছরের শুরুতেও সময়মতো পাঠ্যবই হাতে না পাওয়া এবং জাতীয় নির্বাচনের ছুটির কারণে ক্লাস ঠিকমতো হয়নি। ফলে জানুয়ারি থেকে ১৪ মে পর্যন্ত যে পরিমাণ সিলেবাস শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা সম্ভব হয়নি। 

‘তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত, বাড়বে কোচিংয়ের নির্ভরতা’  

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী প্রধান ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী সরকারের সময় বাঁচানোর সদিচ্ছাকে সাধুবাদ জানালেও মাঠের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকা মহানগরীর বাইরে চর বা হাওর অঞ্চলের স্কুলগুলোর এই সময়ে সিলেবাস শেষ করার মতো প্রস্তুতি কতটুকু, তা ভাবা দরকার ছিল। এর ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর অহেতুক মানসিক চাপ তৈরি হবে।’

তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ‘শ্রেণিকক্ষে পঠন-পাঠনের মান এমনিতেই ঘাটতিতে রয়েছে, তার ওপর সময় কমে যাওয়ায় অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে সন্তানদের কোচিং ও প্রাইভেটের দিকে ঠেলে দেবেন।’ এই বাণিজ্য রুখতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে শিক্ষকদের কোচিং করানো বন্ধে হাইকোর্টের যে নির্দেশনা রয়েছে, তা কঠোরভাবে মনিটরিং করার জন্য তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানান। 

সিলেবাস শেষ হওয়া নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরীক্ষার্থীরা গত বছর যখন নবম শ্রেণিতে উঠেছিল, তখনই তারা অসংখ্য ক্লাস মিস করেছে। সাধারণত নবম শ্রেণিতে ওঠার পর নতুন সিলেবাস ও কঠিন পাঠ্যপুস্তকের কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর এমনিতেই একটি বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি হয়।’

তিনি পূর্বের ঘাটতিগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘২০২৫ সালের প্রথম দুই মাস (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) দেশে প্রায় কোনও পড়াশোনাই হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ছুটিছাটা ও আন্দোলনের কারণে দফায় দফায় স্কুল বন্ধ থেকেছে। পূর্বের এই বিশাল শিখন ঘাটতি বহাল থাকা অবস্থায় বছরের বাকি সময়ে মাত্র ১১৫ দিন ক্লাস পেয়ে শিক্ষার্থীরা কীভাবে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস শেষ করবে, তা সত্যিই উদ্বেগের বিষয়।’

স্কুলে মনিটরিং বাড়ানো, পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার ও নমনীয়তার প্রস্তাব 

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ মনে করেন, এক বছরের মধ্যেই সবকিছু মেশিনের মতো রুটিনে আনার কোনও প্রয়োজন ছিল না। এই বছর কিছুটা নমনীয় হয়ে পরীক্ষা ফেব্রুয়ারি বা মার্চে নেওয়া যেতো। 

পাবলিক পরীক্ষার সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এসএসসি ও এইচএসসিতে সব বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ও-লেভেলের মতো বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো প্রধান ৫টি বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে, যা এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করা সম্ভব। এতে মেধা যাচাইয়ে কোনও তফাত হবে না। বাকি বিষয়গুলোর মূল্যায়ন স্কুলেই ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও অর্ধবার্ষিক-বার্ষিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষকরা করতে পারেন। একই সঙ্গে ব্যবহারিক (প্র্যাক্টিক্যাল) পরীক্ষাও বোর্ড থেকে বাদ দিয়ে স্কুলেই রাখা উচিত।’ তিনি শিক্ষাবর্ষকে জানুয়ারি-ডিসেম্বরের বদলে উচ্চশিক্ষার মতো জুলাই-আগস্ট থেকে শুরু করারও পরামর্শ দেন। 

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রথমত স্কুলেই পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত করতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিং বা নজরদারি বাড়াতে হবে। পাবলিক পরীক্ষা হলো মেধা যাচাইয়ের সামগ্রিক একটি নির্দেশক (ইন্ডিকেটর), তাই এর গুরুত্ব অবশ্যই থাকবে।

সদিচ্ছা থাকলে সম্ভব, প্রয়োজন রেমিডিয়াল ক্লাস 

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে যে সময় নষ্ট হয়, তা একটি সিস্টেম লস। সদিচ্ছা ও যথাযথ প্রচেষ্টা থাকলে এই সময়ের মধ্যেও সিলেবাস শেষ করা সম্ভব।’

তবে শিখন ঘাটতির ঝুঁকির কথা স্বীকার করে তিনি কিছু অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার সুপারিশ করেন— 

প্রি-টেস্ট পরীক্ষা এগিয়ে আনা: কে এম এনামুল হকের মতে, প্রি-টেস্টে পরীক্ষার পর টেস্ট পরীক্ষা পর্যন্ত এক ধরনের বিদ্যালয়ভিত্তিক বিশেষ উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। টেস্ট পরীক্ষার পর বিদ্যালয়ের ভূমিকা তুলনামূলক কম থাকে। সেই সময় শিক্ষার্থীদের নিজস্ব প্রস্তুতি, পারিবারিক সহযোগিতা  এবং বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এই নতুন ঘোষণা সিলেবাস শেষ করা খুব বড় অনুষঙ্গ হবে না। তবে বিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পর ব্যক্তিগত প্রস্তুতির জায়গায় সংকোচন হবে। ফলে গাইড বই, নোট বই ব্যবহার প্রাইভেট টিউশনের মতো বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলোর প্রভাব তুলনামূলক কম থাকবে।

কন্টাক্ট আওয়ার বাড়ানো: দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন অন্তত ১ ঘণ্টা করে ক্লাসের সময় বাড়িয়ে দেওয়া অথবা প্রয়োজনে সাপ্তাহিক ছুটি কমিয়ে কন্টাক্ট আওয়ার বাড়ানো। 

রেমিডিয়াল লার্নিং: কোভিডকালীন সময়ের মতো পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিখন কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা। 

দুর্যোগকালীন পরিকল্পনা: জুলাই থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে বন্যা বা অতিবৃষ্টির কারণে যেসব অঞ্চলে পাঠদান বন্ধ থাকে, সেখানে প্রতিদিন ৪০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া। 

/এসটি/ইউএস/
সম্পর্কিত
ফল প্রকাশ পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া তদারকি করবেন আমিনুল হক
এসএসসিতে অকৃতকার্যদের ৩ মাসের মধ্যে ফের পরীক্ষার সুযোগ দিতে চায় সরকার
আইনজীবী অন্তর্ভুক্তির রিটকারীরা পাচ্ছেন ভাইভা দেওয়ার সুযোগ
সর্বশেষ খবর
ঘুষ দাবির অভিযোগে থানা থেকে এএসআই প্রত্যাহার
ঘুষ দাবির অভিযোগে থানা থেকে এএসআই প্রত্যাহার
আওয়ামী লীগকে ‘পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চোরের দল’ বললেন স্পিকার
আওয়ামী লীগকে ‘পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চোরের দল’ বললেন স্পিকার
সু চিকে যে দুটি বই পাঠালেন রাজা তৃতীয় চার্লস
সু চিকে যে দুটি বই পাঠালেন রাজা তৃতীয় চার্লস
দিলীপ আগরওয়ালা ১ দিনের রিমান্ডে
দিলীপ আগরওয়ালা ১ দিনের রিমান্ডে
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ