বিদেশে পড়াশোনা এখন শুধু একটি স্বপ্ন নয়, বরং উন্নত শিক্ষা, নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় এবং বৈশ্বিক ক্যারিয়ার গড়ার অন্যতম সুযোগ। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লাখো শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান বিদেশে। তবে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, পছন্দের বিষয় কিংবা বৃত্তির পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাষা।
অনেক দেশেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, দৈনন্দিন জীবন এবং পরবর্তী কর্মজীবনে সফল হতে স্থানীয় ভাষার দক্ষতা প্রয়োজন হয়। আবার কিছু দেশে ইংরেজি মাধ্যমের কোর্স থাকলেও স্থানীয় ভাষা জানলে পড়াশোনা, খণ্ডকালীন চাকরি এবং সমাজের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া অনেক সহজ হয়।
তবে ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে আপনি কোন দেশে যাচ্ছেন, কোন ভাষায় পড়বেন এবং ব্যাচেলর, মাস্টার্স নাকি পিএইচডি—কোন স্তরের প্রোগ্রামে ভর্তি হচ্ছেন তার ওপর। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কোন দেশে পড়তে গেলে কোন ভাষা শেখা প্রয়োজন।
জার্মানি: জার্মান ভাষা জানলে বাড়ে সুযোগ
ইউরোপে উচ্চশিক্ষার অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য জার্মানি। দেশটির অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি নেই বা খুবই কম। তবে জার্মান ভাষার গুরুত্ব অনেক।
জার্মান ভাষায় পরিচালিত কোর্সে ভর্তি হতে সাধারণত B2 বা C1 স্তরের ভাষা দক্ষতা প্রয়োজন হয়। ইংরেজি মাধ্যমে মাস্টার্স করা সম্ভব হলেও দৈনন্দিন জীবন, পার্ট-টাইম চাকরি এবং স্থায়ী কর্মসংস্থানের জন্য জার্মান ভাষা জানা বড় সুবিধা।
জার্মান ভাষার দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য তিনটি পরীক্ষার ফলাফল বেশি গ্রহণযোগ্য—
- টেস্টড্যাফ (TestDaF): আন্তর্জাতিক জার্মান ভাষা দক্ষতা পরীক্ষা। এতে পঠন, শ্রবণ, লিখন ও কথন—এই চারটি দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়। ফলাফল TDN ৩, ৪ ও ৫ স্তরে প্রকাশ করা হয়। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে TDN 4 গ্রহণযোগ্য।
- ডিএসএইচ (DSH): বিদেশি শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য নেওয়া ভাষা পরীক্ষা। এর তিনটি স্তর—DSH-1, DSH-2 ও DSH-3। সাধারণত DSH-2 অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রহণযোগ্য।
- গ্যেটে সার্টিফিকেট (Goethe-Zertifikat): গ্যেটে ইনস্টিটিউট প্রদত্ত আন্তর্জাতিক জার্মান ভাষা সনদ। এর স্তর A1 থেকে C2 পর্যন্ত।
ফ্রান্স: ফরাসি ভাষা শেখা সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ
ফ্রান্সের অধিকাংশ ব্যাচেলর প্রোগ্রাম ফরাসি ভাষায় পরিচালিত হয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে সাধারণত B2 স্তরের ভাষা দক্ষতা প্রয়োজন হয়। ইংরেজি মাধ্যমের কোর্স থাকলেও ফরাসি ভাষা জানলে ইন্টার্নশিপ, চাকরি ও দৈনন্দিন জীবন অনেক সহজ হয়।
ফরাসি ভাষার প্রধান পরীক্ষাগুলো হলো—
- ডেলফ (DELF): A1 থেকে B2 স্তরের আন্তর্জাতিক ফরাসি ভাষা সনদ।
- ডালফ (DALF): C1 ও C2 স্তরের উন্নত ফরাসি ভাষা দক্ষতার সনদ।
- টিসিএফ (TCF): ফরাসি ভাষা দক্ষতা মূল্যায়নের আন্তর্জাতিক পরীক্ষা, যা উচ্চশিক্ষা ও অভিবাসনের ক্ষেত্রেও গ্রহণযোগ্য।
সব পরীক্ষায় পঠন, শ্রবণ, লিখন ও কথন দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়।
জাপান: ভাষা জানলে বাড়ে সম্ভাবনা
জাপানের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার সুযোগ থাকলেও জাপানি ভাষা জানলে সুযোগ আরও বাড়ে।
জাপানি ভাষার কোর্সে ভর্তি হতে সাধারণত জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ প্রোফিসিয়েন্সি টেস্ট (JLPT)-এর N2 বা N1 স্তরের সনদ প্রয়োজন হয়। এই সনদ থাকলে চাকরি ও গবেষণার ক্ষেত্রেও সুবিধা পাওয়া যায়।
দক্ষিণ কোরিয়া: কোরিয়ান ভাষার চাহিদা বাড়ছে
দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক ইংরেজি প্রোগ্রাম রয়েছে। তবে কোরিয়ান ভাষা জানলে বৃত্তি, পার্ট-টাইম চাকরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
কোরিয়ান ভাষা দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য নেওয়া হয় টপিক (TOPIK—Test of Proficiency in Korean) পরীক্ষা। এটি TOPIK I ও TOPIK II—এই দুই ধাপে অনুষ্ঠিত হয় এবং পঠন, শ্রবণ ও লিখন দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়।
চীন: ম্যান্ডারিন জানলে সুবিধা বেশি
চীনের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমে মাস্টার্স ও পিএইচডি করার সুযোগ রয়েছে। তবে ম্যান্ডারিন ভাষা জানলে দৈনন্দিন জীবন ও চাকরির ক্ষেত্রে বড় সুবিধা পাওয়া যায়।
চীনা ভাষার দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য এইচএসকে (HSK) পরীক্ষা নেওয়া হয়। চীনা ভাষার প্রোগ্রামে ভর্তি হতে সাধারণত HSK সনদ প্রয়োজন হয়।
ইতালি: স্থানীয় ভাষা শেখা লাভজনক
ইতালিতে অনেক আন্তর্জাতিক কোর্স ইংরেজিতে হলেও স্থানীয় ভাষা জানলে জীবনযাপন ও চাকরি পাওয়া সহজ হয়। ইতালীয় ভাষার কোর্সে সাধারণত B2 স্তরের দক্ষতা প্রয়োজন হয়।
ইতালীয় ভাষার দুটি স্বীকৃত পরীক্ষা হলো—
- সিলস (CILS): সিয়েনা বিদেশি শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত আন্তর্জাতিক ইতালীয় ভাষা সনদ।
- চেলি (CELI): পেরুজিয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত আন্তর্জাতিক ইতালীয় ভাষা সনদ।
উভয় পরীক্ষায় পঠন, শ্রবণ, লিখন ও কথন দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়।
স্পেন: স্প্যানিশ ভাষা শেখা প্রয়োজন
স্পেনের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্প্যানিশ ভাষায় পাঠদান করা হয়। তাই স্প্যানিশ ভাষার কোর্সে ভর্তি হতে সাধারণত B2 স্তরের ভাষা দক্ষতা প্রয়োজন হয়। ইংরেজি প্রোগ্রাম থাকলেও স্থানীয় ভাষা জানলে চাকরি ও সামাজিক জীবনে সুবিধা পাওয়া যায়।
যেসব দেশে স্থানীয় ভাষা আগে শেখা বাধ্যতামূলক নয়
কিছু দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য মূলত ইংরেজি ভাষার দক্ষতাই যথেষ্ট। যেমন—
- যুক্তরাষ্ট্র: IELTS বা TOEFL গ্রহণযোগ্য।
- যুক্তরাজ্য: সাধারণত IELTS প্রয়োজন হয়।
- কানাডা: IELTS, TOEFL বা CELPIP গ্রহণযোগ্য। কিছু অঞ্চলে ফরাসি ভাষারও প্রয়োজন হতে পারে।
- অস্ট্রেলিয়া: ইংরেজি ভাষার দক্ষতার প্রমাণ আবশ্যক।
- নিউজিল্যান্ড: ইংরেজি দক্ষতার আন্তর্জাতিক সনদ প্রয়োজন হয়।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন নয়, সেই দেশের ভাষা সম্পর্কেও আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। কারণ স্থানীয় ভাষা জানা শুধু ভর্তি প্রক্রিয়াই সহজ করে না, বরং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, পার্ট-টাইম চাকরি পাওয়া এবং ভবিষ্যতে ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মতো দেশে ভাষা দক্ষতা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সুযোগ তৈরি করে।









