দীর্ঘদিন কমতে থাকা শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার আবারও বাড়ছে। প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার বেড়ে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মাধ্যমিকে এ হার ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিকেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগেই একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর (ডিপিই) এবং বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সাল থেকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী ছিল ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। পরীক্ষার প্রথম দিন অনুপস্থিত ছিল ২৪ হাজার ৭৮৪ জন। এর বাইরে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেও প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফরম পূরণ করেনি। ফলে তারা এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারিয়েছে। শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার উদ্বেগজনক প্রবণতারই প্রতিফলন এই চিত্র।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। ওই সময়ে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একাদশ শ্রেণিতে মোট ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করে। তাদের মধ্যে পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন। বাকি ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন ফরম পূরণ করেনি। অর্থাৎ নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ পরীক্ষার বাইরে চলে গেছে।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম প্রথম বর্ষে নিবন্ধন করেছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ৭৮ হাজার ২৬৯ জন ফরম পূরণ করেছে। বাকি ৬১ হাজার ৬৬০ জন ফরম পূরণ না করায় পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। এ বোর্ডে ফরম পূরণ না করার হার ৪৪ দশমিক ০৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একাদশ শ্রেণির (ভোকেশনাল) ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। তাদের মধ্যে ফরম পূরণ করেছে ৭৫ হাজার ১৯৭ জন। ফলে ৯০ হাজার ৩৪৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা থেকে ছিটকে গেছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ফরম পূরণ না করা শিক্ষার্থীর হার ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা তিনটি ধারার মধ্যে সর্বোচ্চ।
সব মিলিয়ে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেও প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের প্রায় চার লাখ, মাদ্রাসা বোর্ডের ৬১ হাজারের বেশি এবং কারিগরি বোর্ডের ৯০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে।
শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার এই চিত্র সামনে আসার পর গত ২ জুলাই এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, আগে এসএসসির পর সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ত। কিন্তু এবার সাধারণ শিক্ষায় ৩৩ শতাংশ, মাদ্রাসায় ৪৪ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষায় ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং সরকারের জন্য বড় প্রশ্ন।
এদিকে চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রথম দিন মোট ২৪ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ১৭ হাজার ২৩৩ জন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৪ হাজার ৪৭৮ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৩ হাজার ৭৩ জন।
সরকারি পরিসংখ্যানে বাড়ছে ঝরে পড়ার হার
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের (ডিপিই) বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে। দীর্ঘ সময় ধরে কমতে থাকা এ হার আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
২০২৪ সালে প্রাথমিক স্তরে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার ১৯ দশমিক ০২ শতাংশ এবং মেয়েদের ১৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রাথমিক স্তরে বর্তমানে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক বেশি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ছিল ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ, উচ্চমাধ্যমিকে ২১ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং ডিপ্লোমা পর্যায়ে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার সব শিক্ষাস্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ স্তরে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার ৩০ দশমিক ৬৩ শতাংশ হলেও মেয়েদের হার ৩৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিকেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়।
বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ১ লাখ ২ হাজার ১৫ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজ থেকে ঝরে পড়েছে। এর মধ্যে ৬২ হাজার ৩০৮ জন ছিল মেয়ে, যা মোট ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর ৬১ দশমিক ০৮ শতাংশ।
কেন ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা
বিভিন্ন সরকারি ও গবেষণা প্রতিবেদনে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে দারিদ্র্য, পারিবারিক আর্থিক সংকট, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুজনিত ক্ষতি, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সমস্যা, শিক্ষার মান ও শেখার আগ্রহ কমে যাওয়া, অভিভাবকদের অনাগ্রহ এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে শিক্ষাব্যয় বহনে অক্ষমতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক নানা কারণের কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক বেশি।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর শিক্ষাঙ্গনে মব-সংস্কৃতি ও অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে। শিক্ষকরা তটস্থ হয়ে পড়েন এবং অনেক শিক্ষার্থী মনে করেছে, আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় সম্ভব। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে অটোপাস দেওয়ার ঘটনাও এ প্রবণতাকে উৎসাহিত করেছে। এতে শুধু শিখন-ক্ষতিই নয়, শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ ও সমাজেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তিনি বলেন, গত তিন-চার বছর ধরে মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার আগেই অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। আবার নিবন্ধনের পরও অনেকে টেস্ট পরীক্ষার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে বা নিবন্ধন করেও পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। বিষয়টি এতদিন গুরুত্ব পায়নি।
রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম এবং শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাওয়া ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ। সরকার উপবৃত্তি, বই ও অন্যান্য সহায়তা দিলেও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক এখনও অবৈতনিক নয়। এসডিজির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালুর পরামর্শ দেন তিনি।
শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, কোভিড-১৯-এর প্রভাব ও অর্থনৈতিক সংকটে অনেক পরিবার কর্মসংস্থান হারিয়ে বড় শহর ছেড়ে শহরতলি বা গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এতে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে। আবার শিক্ষা ব্যয়, কোচিং ও পরীক্ষা প্রস্তুতির খরচ বহন করতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেও পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি কিংবা স্বল্পব্যয়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে গেছে।
তিনি বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পাশাপাশি স্কুল টু ওয়ার্ক ট্রানজিশনকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ছাত্র আন্দোলনের পর অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে ফিরতে পারেনি। ফলে পড়াশোনার সঙ্গে তাদের সংযোগ দুর্বল হয়েছে। টেস্ট পরীক্ষার সময় আত্মবিশ্বাসের অভাবে একটি অংশ ঝরে পড়ছে। তাই ‘ব্যাক টু স্কুল’ কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ঝরে পড়া ঠেকাতে কী করছে সরকার
সরকার ঝরে পড়া কমাতে উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, জুতা-মোজা প্রদান এবং ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেওয়াসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
গত ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমাতে সরকার বিনামূল্যে চার রঙা পাঠ্যবই বিতরণ, উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং, শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ড্রেস, জুতা-মোজা বিতরণসহ একগুচ্ছ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।









