রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর চত্বর এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীরাও হামলার শিকার হয়েছেন। পুলিশ বলছে, ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করা হকাররা এসব হামলা চালিয়েছেন।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে মিরপুর ১০ নম্বরের হোপ মার্কেট এলাকায় অভিযান শুরু হয়। এ সময় হকাররা পুলিশের একটি গাড়ি এবং ডিএনসিসির তিনটি গাড়ি ভাঙচুর করেন। ডিএনসিসির দুটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। রাত পৌনে ৮টা পর্যন্ত ৩৫ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের সবাই হকার।
অভিযান চলাকালে ১০ নম্বর গোল চত্বরসংলগ্ন একটি মসজিদ মার্কেটে আগুন লাগে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ডিশ লাইনের সংযোগ খুলতে গিয়ে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে আগুন ট্রান্সফরমারে ছড়িয়ে পড়লে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটে। একপর্যায়ে বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদের পশ্চিম পাশের নিচতলায় আগুন দেখা যায়। ফায়ার সার্ভিসের দুটি গাড়ি গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
হকারদের দাবি, আগুন লাগা মার্কেটে তাদের মালামাল ছিল। আগুনে সেগুলো পুড়ে গেছে।
এরপর হকাররা সিটি করপোরেশনের কর্মী ও পুলিশের ওপর হামলা চালান। লাঠি-সোটা ও ইট-পাটকেল নিয়ে হামলার পাশাপাশি মিরপুর ১০ নম্বরের পুলিশ বক্স ভাঙচুর করা হয়। সিটি করপোরেশনের গাড়িতেও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। পুলিশ জানিয়েছে, হামলায় আট সদস্য আহত হয়েছেন।
সাংবাদিকদের ওপরও হামলা
অভিযানের সংবাদ সংগ্রহের সময় গণমাধ্যমকর্মীদের ওপরও হামলা হয়। একাত্তর টেলিভিশনের সাংবাদিক তানভীর সুমনকে হকাররা ঘিরে ধরেন। তার ভাষ্য, দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর হকারদের একটি অংশের সহায়তায় তিনি বের হতে পারেন।
তানভীর সুমন জানান, যমুনা টেলিভিশনের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। সময় টিভির রিপোর্টার ও ক্যামেরাম্যানকে ধাওয়া করে একপর্যায়ে মারধর করা হয়। প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিকের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়া হলেও পরে ফেরত দেওয়া হয়। সমকালের ফটোসাংবাদিককেও লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
দোকান পুড়ে ক্ষতির অভিযোগ
অভিযানের সময় বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেটের সীমানায় ভেকু ঢোকানোর কারণে আগুন লেগে দোকান পুড়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন দোকানি মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম। তার প্রশ্ন, এ ক্ষয়ক্ষতির দায় কে নেবে।
শরিফুল ইসলামের অভিযোগ, ফুটপাতের অংশ ভাঙতে গিয়ে সিটি করপোরেশনের লোকজন মসজিদের নির্মাণাধীন মিনারের অংশের ভেতরে ভেকু দিয়ে টান দেন। সেখানে বৈদ্যুতিক লাইন থাকায় শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগে এবং পরে দোকানগুলো পুড়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, এটা মসজিদের কাজের জায়গা। এখানে হাত দেবেন না। তারপরও তাঁরা ভেতরে এসে হস্তক্ষেপ করেছেন। এতে আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেল।’
শরিফুল জানান, সেখানে মোট পাঁচটি দোকান ছিল। তার দোকানসহ অন্য দোকানগুলোতে নারী ও শিশুদের পোশাক, জুতা ও স্বর্ণালংকার ছিল। এসব দোকানের আয়েই তাদের সংসার চলত।
তার ভাষ্য, অভিযানের সময় তিনি দোকানে ছিলেন এবং সিটি করপোরেশনের লোকজনকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তারা ভেকু চালালে বৈদ্যুতিক লাইনে সমস্যা হয়ে আগুন ধরে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভায়।
শরিফুল বলেন, ‘এ দোকানই আমার একমাত্র আয়ের উৎস। আয় বন্ধ করে দিয়ে গেলে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা কে করবে।’
পৃথক মামলা হবে
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার আবুল বাশার মোল্লা বলেন, হকারদের হামলায় আট পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। সিটি করপোরেশনের গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায়ও মামলা হবে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ডিএনসিসির নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের সময় হকাররা পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলা করেন। পরে অতিরিক্ত ফোর্স এনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
হামলায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানও চলবে। সংঘর্ষের পর আবার অভিযান শুরু করে কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, উচ্ছেদ অভিযানে বাধা ও হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার কর্মসূচি চলবে।
তিনি বলেন, বুধবারের কর্মসূচিতে যারা অরাজকতা সৃষ্টি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের পাশাপাশি ডিএনসিসির পক্ষ থেকেও মামলা করা হবে। অবৈধভাবে কাউকে ফুটপাত দখল করতে দেওয়া হবে না। কারও ইন্ধনে আবার দখলের চেষ্টা করা হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।