নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাঁকা মহাবিদ্যালয়ে পেছনের তারিখে (ব্যাকডেটে) অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে চার জন কর্মচারী নিয়োগের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হয়েছে। এই ঘটনায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর এবং স্থানীয় প্রশাসনের কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগের পর শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক তদন্ত। তবে অভিযোগ ও তদন্ত শুরুর পর থেকেই কলেজে আসা কমিয়ে দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বিতর্কিত অধ্যক্ষ মোছাম্মাৎ জাকিফা খাতুন। এমনকি তদন্ত কর্মকর্তার তলবেও তিনি অফিসে হাজির হননি।
অভিযোগ রয়েছে, পূর্বেও নিয়মিত কলেজে না এসে বাড়িতে হাজিরা খাতা নিয়ে গিয়ে সই করতেন অধ্যক্ষ। আর বর্তমানে নিয়োগ জালিয়াতি প্রকাশ্যে আসার পর হঠাৎ হঠাৎ কলেজে এসে চুপচাপ খাতায় সই করে চলে যান তিনি।
তদন্তের মুখে অনুপস্থিত অধ্যক্ষ
নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর বাগাতিপাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ওয়াজেদ আলী মৃধাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত ২৩ জুলাই এ বিষয়ে তদন্ত শুরুর কথা ছিল এবং অধ্যক্ষকে অফিসে তলব করা হয়েছিল।
গতকাল শুক্রবার (৩১ জুলাই) উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. ওয়াজেদ আলী মৃধা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তদন্তের জন্য অধ্যক্ষকে শিক্ষা অফিসে ডাকা হলেও তিনি আসেননি। তবে অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ জাকিফা খাতুন দাবি করেন, তিনি সে সময় ‘টাইম পিটিশন’ বা সময়ের আবেদন দিয়েছেন।
শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ শেষ হলে দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব হবে।
যেভাবে ধরা পড়লো ‘ব্যাকডেটে’ অবৈধ নিয়োগ
কলেজ গভর্নিং বডির (অ্যাডহক কমিটি) বর্তমান সভাপতি আবু আবদুল্লাহ বুলবুলের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, অনিয়ম, জালিয়াতি ও বিপুল অর্থের বিনিময়ে ২০২৩ সালের ব্যাকডেটে তিন জন ল্যাব সহকারী ও একজন অফিস সহকারী নিয়োগ দিয়েছেন অধ্যক্ষ। অথচ ২০২৩ কিংবা ২০২৫ সালের কলেজের হাজিরা খাতায় ওই চার জনের কোনও অস্তিত্ব বা স্বাক্ষর ছিল না।
এমনকি বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইজ) ওয়েবসাইট এবং ২০২৫ সালের এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের তালিকাতেও তাদের নাম ছিল না। কিন্তু ২০২৬ সালের তালিকায় হঠাৎ করেই ওই চার জনের নাম যুক্ত করা হয়।
কলেজ গভর্নিং বডির (অ্যাডহক কমিটি) বর্তমান সভাপতি আবু আব্দুল্লা বুলবুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “চার কর্মচারীর নিয়োগ যে শতভাগ অবৈধ— তা স্পষ্ট। তাদের ২০২৩ ও ২০২৫ সালের হাজিরা খাতা বা কোনও তালিকায় নাম ছিল না। অধ্যক্ষ এসব অবৈধ নিয়োগ বৈধ করতে আমার কাছে সই চাইতে এলে আমি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও মহাপরিচালকের (ডিজি) প্রতিনিধির মনোনয়নপত্র দেখতে চাই। তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হন এবং পরে ‘ম্যানেজ’ করে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাকে সই করতে চাপ দেন। আমি রাজি না হওয়ায় তিনি উল্টো আমার বিরুদ্ধে ইউএনও কার্যালয়ে মিথ্যা অভিযোগ দেন।”
অধ্যক্ষের বক্তব্য ও লিখিত অঙ্গীকারনামা
অধ্যক্ষ জাকিফা খাতুন বর্তমানে চার কর্মচারীর নিয়োগ ২০২৩ সালে সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করলেও অনুসন্ধানে তারই সই করা একটি ভিন্ন অঙ্গীকারনামা উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর গভর্নিং বডির কাছে দেওয়া এক লিখিত ঘোষণাপত্রে অধ্যক্ষ জাকিফা খাতুন নিজের প্যাডে স্পষ্ট উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমি এই মর্মে ঘোষণা করছি যে, ০৪/০১/২০২৪ তারিখের স্মারকে গভর্নিং বডির মাধ্যমে অদ্যাবধি পাঁকা মহাবিদ্যালয়ে কোনোরূপ কর্মচারী নিয়োগ প্রদান করি নাই এবং নিয়োগ প্রদান করিলেও তা সম্পূর্ণ অবৈধ বলে বিবেচিত হইবে।’
২০২৪ সালে নিজ হাতে নিয়োগ দেননি বলে ঘোষণা দিয়ে, ২০২৬ সালে এসে পুনরায় একই চার জনের নিয়োগ ২০২৩ সালে হয়েছে বলে দাবি করাকে সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী ও জালিয়াতির স্পষ্ট প্রমাণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পূর্বে ৯ শিক্ষক নিয়োগেও অর্থ লোপাটের অভিযোগ
অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। ২০২৪ সালের ১৪ জানুয়ারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. হোসেন আলীসহ ৩২ জন শিক্ষক-কর্মচারী তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ১১ দফা লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়, বিগত সময়ে অধ্যক্ষ ৮ থেকে ৯ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা লোপাট করেছেন। এছাড়া ফ্যাসিলিটিজ বিল্ডিং বরাদ্দ, কলেজের প্রবেশদ্বারের জমি ক্রয়, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি এবং দাফতরিক কাজের অজুহাতে শিক্ষকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়েছে। কলেজের টিউশন ফি বা সরকারি টাকা ব্যাংকে না রেখে তিনি পুরোটাই আত্মসাৎ করেছেন বলে সহকর্মীদের অভিযোগ।
উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও স্থানীয়রা
নিয়োগ জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিষয়ে গত ১ জুলাই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) রাজশাহীর আঞ্চলিক পরিচালকের কাছে এবং ইউএনও কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন ছাত্র অভিভাবক মো. আরিদুজ্জামান সরদার।
অভিযোগকারীরা জানান, বহিরাগত লোক দিয়ে কলেজে নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করে রেখেছেন অধ্যক্ষ। এলাকাবাসীর দাবি, মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নিরপেক্ষ ও জোরালো তদন্তের মাধ্যমে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যক্ষ জাকিফা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি নিয়মিতই কলেজে যাতায়াত করি।” চার কর্মচারী ব্যাকডেটের নিয়োগের তদেন্তের দিন অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি টাইম পিটিশন দিয়েছিলাম।”









