আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই ছাপিয়ে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে পাঠানোর লক্ষ্য থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে মুদ্রণকাজ ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় সময়মতো বই সরবরাহ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত ৬১৭টি বিষয়ের প্রায় ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপানো হবে। ইতোমধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ শুরু হয়েছে। রবিবার (৩০ আগস্ট) থেকে প্রাথমিক স্তরের বই ছাপানোর কাজও শুরু হয়েছে। আর সোমবার (৩১ আগস্ট) মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোর জন্য মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ৭০ দিনের মধ্যে মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ শেষ করার কথা।
এনসিটিবির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সরবরাহ শেষ করা হবে। এরপর ডিসেম্বরেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর আগে গত কয়েক বছর শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সব বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এবার সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে— তাই আগেভাগেই মুদ্রণ ও সরবরাহ শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে বই ছাপানোর এই কর্মযজ্ঞে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন ছাপাখানায় লোডশেডিংয়ের কারণে মুদ্রণকাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে এনসিটিবির জানতে পেরেছে। কোথাও কোথাও দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও রয়েছে। ছোট ছাপাখানাগুলোর অনেকের জেনারেটর না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো জেনারেটর ব্যবহার করলেও এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে ছাপাখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে গত ২৩ আগস্ট বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিয়েছে এনসিটিবি। চিঠিতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক সরবরাহকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম উল্লেখ করে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এনসিটিবির উৎপাদন নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘পাঠ্যবই ছাপায় লোডশেডিং, জোনভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় জেনারেটর দিয়ে প্রেস চালানো হচ্ছে।’’
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, লোডশেডিংয়ের কারণে প্রেসগুলো ঠিকমতো বই ছাপতে পারছে না। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি প্রেস এলাকায় লোডশেডিং কমানো অথবা নির্দিষ্ট সময়ে সীমিত রাখার অনুরোধ করা হয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে ।
এদিকে এনসিটিবির ই-জিপি নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিভিন্ন শ্রেণির বই মুদ্রণের দরপত্র ও কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের জন্য আলাদা টেন্ডার হয়েছে। মাধ্যমিকের ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বইয়ের মুদ্রণ ও সরবরাহের জন্যও বিভিন্ন প্যাকেজে দরপত্র প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যবইয়ে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে চারটি নতুন বই। চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আনন্দময় শিক্ষা’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ নামে বই চারটি যুক্ত হবে।’’
২০২৭ সালের সম্ভাব্য পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তরের জন্য মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ করা হবে। এর আগে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে সারা দেশে ৩১ কোটি গুণগত মানসম্পন্ন নতুন পাঠ্যবই বিতরণ করা হবে।
স্তরভিত্তিক বইয়ের সংখ্যা ও সম্ভাব্য ব্যয়
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক স্তরে (প্রাক-প্রাথমিক ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ) ১৪৩টি লটে ৮ কোটি ৫১ লাখ ৫৫ হাজার ১৭৮ কপি বই ছাপানো হবে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের জন্য ৩০টি লটে ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ কপি, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য ১১০টি লটে ৭ কোটি ৯৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৩৮ কপি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ১টি লটে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৭১৫ কপি বই থাকবে। এ খাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫৯ কোটি ৮৫ লাখ ১ হাজার ৫১৫ টাকা।
অন্যদিকে, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তরের প্রথম থেকে নবম শ্রেণির জন্য ৪৪১টি লটে ২২ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার ৯২৩ কপি পাঠ্যবই মুদ্রণ করা হবে। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ৫ কোটি ১০ লাখ ১৯ হাজার ৫৯ কপি, সপ্তম শ্রেণির জন্য ৪ কোটি ১৩ লাখ ২ হাজার ৭২৩ কপি, অষ্টম শ্রেণির জন্য ৩ কোটি ৯৮ লাখ ১০ হাজার ১১৯ কপি এবং নবম শ্রেণির জন্য ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৩১ হাজার ৭২২ কপি বই ছাপানো হবে। এ খাতে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় হবে ১ হাজার ১৮৩ কোটি ৩৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।
এনসিটিবির লক্ষ্য
এবারের লক্ষ্য, আগের বছরের মতো শিক্ষাবর্ষ শুরুর পর কয়েক মাস ধরে বই সরবরাহ না করে এবার বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে প্রয়োজনীয় সব বই পৌঁছে দেওয়া। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বই ছাপানোর ক্ষেত্রে লোডশেডিং পরিস্থিতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে পুরো কর্মপরিকল্পনাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জোনভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ
এনসিটিবির উৎপাদন নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপার কাজে যাতে বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে জোনভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি আমি জানি। চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় জেনারেটর দিয়ে প্রেস চালানো হচ্ছে। আমরা আশাবাদী।’’
বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য জোনভিত্তিক সংশ্লিষ্ট প্রেসের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘পল্লী বিদ্যুৎ ও ডিপিডিসির সংশ্লিষ্ট জোনে যোগাযোগ করার জন্য আমরা একটি চিঠি তৈরি করছি। ডিপিডিসিতে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বিষয়টি যাতে মন্ত্রণালয় থেকেও সংশ্লিষ্টদের ফোন করে জানানো হয়, সে জন্য চিঠিটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’’
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপার অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘প্রি-প্রাইমারির বইয়ের ছাপা আগে থেকেই চলছে। প্রাইমারির বইয়ের ছাপাও শুরু হয়েছে। চার-পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে শুরু করেছে।’’
এনসিটিবির এই কর্মকর্তা জানান, ‘রাজধানীর মাতুয়াইলের ন্যাশনাল প্রিন্টার্স, অটো প্রিন্টার্সসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শুরু করেছে। বগুড়াতেও কাজ শুরু হয়েছে। বাকিরা কাগজের অনুমোদন পেয়েছে। শিগগিরই তারা ছাপার কাজ শুরু করে দেবে।’’
মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘মাধ্যমিকও যেহেতু একই সঙ্গে নেওয়া হয়েছে, সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। হয়তো ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই ছাপা শুরু করতে পারবে। এইটের অনুমোদন এখনও আসেনি।’’









