২০৩১ সালের মধ্যে দেশের সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ৪৫ লাখ নিরক্ষর নারী-পুরুষকে প্রায়োগিক সাক্ষরতার আওতায় আনার পাশাপাশি বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-কিশোর ও তরুণদের শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আগামী ৮ সেপ্টেম্বর দেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হবে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘লিটারেসি ফর পিপল, দ্য প্ল্যানেট অ্যান্ড প্রসপারিটি’। বাংলায় যার ভাবানুবাদ ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা।’
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বিবি হাজ্জাজ এসব তথ্য জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “সাক্ষরতাকে শুধু পড়া, লেখা ও গণনা শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। মানুষের সামগ্রিক উন্নয়ন, পরিবেশ সচেতনতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে সাক্ষরতাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”
শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ সাক্ষরতা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও এখনও বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং নিরক্ষর প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশ শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগের বাইরে রয়েছে।
বিদ্যালয়বহির্ভূত কিশোর-কিশোরীদের দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার আওতায় আনতে কক্সবাজারে স্কিলফো (স্কিল ফোকাসড লিটারেসি ফর আউট অব স্কুল অ্যাডোলেসেন্ট) পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ৬ হাজার ৮২৫ জন কিশোর-কিশোরীকে ১৩টি পেশায় মৌলিক সাক্ষরতা, গণনা দক্ষতা ও প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলার সদর উপজেলায় ‘কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ (প্রাক-বৃত্তিমূলক পর্যায়)’ কার্যক্রম চলছে। প্রথম ধাপে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৫ হাজার ১২০ জন ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি কোর্সে ৪৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণের মধ্যে ১০০ ঘণ্টা কার্যকর সাক্ষরতা ও ৩৬০ ঘণ্টা দক্ষতা প্রশিক্ষণ রয়েছে।
বিশেষ কার্যক্রমে নিবন্ধিত ৪ হাজার ৩১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪ হাজার ১৯৮ জন কম্পিটেন্ট হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৮৮২ জন কোনও না কোনও ধরনের জব লিংকেজ পেয়েছে। সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছে ৬০৩ জন, শোভন কাজে শিক্ষানবীশ হিসেবে ৮৭৯ জন এবং উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩০৪ জন।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অলটারনেটিভ লার্নিং অপরচুনিটি বা এএলও কার্যক্রমের মাধ্যমে ৬৪ জেলার নির্বাচিত ৬৪টি উপজেলায় ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১৯ হাজার ২০০ বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-কিশোরকে পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী আরও ১৯ হাজার ২০০ তরুণকে জীবিকায়ন দক্ষতা দেওয়া হবে।
এছাড়া স্কিলফো কার্যক্রম দেশের আরও ১৬ জেলায় সম্প্রসারণ করে তিন বছরে ১ লাখ কিশোর-কিশোরীকে দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘ইচ ওয়ান টিচ ওয়ান’ মডেলের আলোকে অ্যাডাল্ট লিটারেসি অ্যান্ড ফাংশনাল এবিলিটি বা আলফা এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাইলট পর্যায়ে ৪০ জেলার ৪০ উপজেলায় ৩৫ হাজার নিরক্ষর নারী-পুরুষকে প্রায়োগিক সাক্ষরতা দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষর নারী ও পুরুষকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশ দূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও খাদ্যনিরাপত্তার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সচেতন নাগরিক প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিজিটাল তথ্য গ্রহণ, যাচাই ও ব্যবহার, অনলাইন সেবা এবং ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের সক্ষমতাও আধুনিক সাক্ষরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
তিনি বলেন, “সাক্ষরতা বিস্তার শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়, এটি জাতীয় দায়িত্ব। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক-প্রশিক্ষক, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি সংস্থা, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া শতভাগ সাক্ষর ও দক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
“কেউ শিক্ষার সুযোগের বাইরে থাকবে না, কেউ সাক্ষরতার আলো থেকে বঞ্চিত থাকবে না— শিক্ষা ও দক্ষতার মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিককে জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।”








