দেশে বিভিন্ন সময়ই পরিবর্তন করা হয়েছে পাঠ্যবই। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বদলেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়বস্তু। ফলে এক প্রজন্মের শিক্ষার্থী যে ইতিহাস ও সংস্কৃতি জেনে বেড়ে উঠেছে, পরবর্তী প্রজন্ম জানছে বদলে যাওয়া বইয়ের লেখা ইতিহাস ও সংস্কৃতি। দীর্ঘ সময় ধরে পাঠ্যবইয়ের এই পরিবর্তনের প্রভাবে শিক্ষার্থীরা ‘গিনিপিগ’ হচ্ছে কিনা; তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়ন না হওয়া থেকেই শিক্ষাব্যবস্থার সংকট শুরু হয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। ১৯৭৫ সালের পর থেকেই পাঠ্যবই ও কনটেন্টে পরিবর্তন আসতে থাকে। তবে ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের পর এই পরিবর্তনের পরিমাণ ও ধারাবাহিকতা আরও বেড়ে যায়।
২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি যুগোপযোগী করার কথা বলা হয়। এর আলোকে ২০১২ সালে মাধ্যমিক স্তরের নতুন শিক্ষাক্রম প্রকাশ করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ২০১৩ সাল থেকে এ শিক্ষাক্রমের অধীনে পরিমার্জিত পাঠ্যবই চালু হয়। এরপর কখনও নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে বই নতুন করে প্রণয়ন, কখনও লেখা ও বিষয়বস্তু বাদ-সংযোজন, আবার কখনও ছাপার পর ভুলত্রুটি সংশোধন করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে সবচেয়ে বড় পরিসরে একসঙ্গে ৪৪১টি পাঠ্যবই পরিবর্তন করা হয়। এর এক বছর পর ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও মাধ্যমিক স্তরের ৯৯টি বই পরিবর্তন করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক স্তরের আরও ৩৬টি বই পরিবর্তনের কাজ নেওয়া হয়েছে।
২০১৭ সালে বড় পরিবর্তন
২০১৭ সালে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুতে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়। বিভিন্ন শ্রেণির বাংলা বইয়ে লেখা বাদ দেওয়া ও নতুন লেখা যুক্ত করা হয়। নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ‘সাহিত্য সংকলন’ থেকে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’, জ্ঞানদাসের ‘সুখের লাগিয়া’, ভারতচন্দ্রের ‘আমার সন্তান’, লালন শাহের ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাঁকোটা দুলছে’ বাদ দেওয়া হয়। যুক্ত করা হয় শাহ মোহাম্মদ সগীরের ‘বন্দনা’, আলাওলের ‘হামদ’, আব্দুল হাকিমের ‘বঙ্গবাণী’, গোলাম মোস্তফার ‘জীবন বিনিময়’ ও কাজী নজরুল ইসলামের ‘উমর-ফারুক’।
সে সময় হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির প্রেক্ষাপটও আলোচনায় আসে। দাবিগুলোর মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামী ভাবধারা প্রতিষ্ঠা এবং পাঠ্যসূচি থেকে ‘ইসলামবিরোধী’ বিষয় বাদ দেওয়ার দাবি ছিল। পাঠ্যবই থেকে বিভিন্ন প্রগতিশীল ও অমুসলিম কবি-সাহিত্যিকের লেখা বাদ দিয়ে ইসলামী ভাবধারার লেখা যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে তখন সমালোচনা হয়।
নতুন শিক্ষাক্রম, নতুন বিতর্ক
২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের পরিবর্তে ২০২৩ সালে প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমের বই চালু করা হয়। নতুন বই প্রকাশের পর সমালোচনা শুরু হয়। মূল্যায়ন ব্যবস্থা চূড়ান্ত করতে না পারায় সমালোচনা গতি পায়। আর ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনের ৪৮টি বই পর্যালোচনা করে এনসিটিবি ৪০০টির বেশি সংশোধনী দেয়।
বিবর্তনবাদ বিতর্কে একই বছর ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের ‘অনুসন্ধানী পাঠ’ বই দুটি পাঠদান থেকে প্রত্যাহার করা হয়। নতুন শিক্ষাক্রমের বিজ্ঞান বইয়ের ‘বিবর্তনবাদ’ নিয়েও বিতর্ক শুরু করেন একটি বিশেষ গোষ্ঠী। সমালোচনার মুখে বিবর্তনবাদ-সংক্রান্ত কনটেন্ট বাদ দেওয়া হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট বইয়ে ‘বানর থেকে মানুষের সৃষ্টি’—এমন বক্তব্য ছিল না।
২০২৪ সালে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বইয়ে আরও ১৪৭টি ভুল সংশোধন করে এনসিটিবি। একই বছর সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের ‘শরীফার গল্প’ নিয়েও বিতর্ক শুরু করে বিশেষ একটি গোষ্ঠী। মানুষে মানুষে সাদৃশ্য ও ভিন্নতার ধারণা দিতে গল্পটি যুক্ত করা হয়েছিল। সমালোচনার পর বই থেকে গল্পটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর পরিবর্তে হিজড়াদের নিয়ে নতুন গল্প যুক্ত করার কথা জানানো হয়।
২০২৫ সালে ৪৪১ বইয়ে পরিবর্তন
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন শিক্ষাক্রম বাদ দিয়ে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফেরার সিদ্ধান্ত হয়। বিভিন্ন শ্রেণির বই পরিমার্জনের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। ঐতিহাসিক তথ্যের ‘অতিরঞ্জন’ ও ব্যক্তিবিশেষের ‘অপ্রয়োজনীয় গৌরবগাথা’ বাদ দেওয়ার কথাও জানানো হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ৪১ জন বিশেষজ্ঞকে দিয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ৪৪১টি পাঠ্যবই পরিবর্তন করা হয়। বিভিন্ন গদ্য, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা বাদ দেওয়ার পাশাপাশি নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিষয়বস্তুও গল্প, কবিতা, ছবি ও গ্রাফিতির মাধ্যমে বিভিন্ন বইয়ে স্থান পায়। এনসিটিবির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় আড়াই মাসে বইগুলো পরিবর্তন করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও পরিবর্তন
২০২৫ সালের পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসের উপস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ও অবদান সংক্রান্ত একাধিক লেখা, কবিতা ও গদ্য বাদ দেওয়া বা পরিবর্তন করা হয়; কমানো হয় ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির পিতা’ পরিচয়ের ব্যবহার।
স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনাতেও পরিবর্তন এনে ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আবার ঘোষণা দেন’ এমন বর্ণনা যুক্ত করা হয়। ‘অতিরঞ্জিত’ বা ‘প্রমাণভিত্তিক নয়’; এমন ইতিহাস বাদ দেওয়ার যুক্তি দেখানো হলেও নতুন বইয়ে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিভিন্ন কনটেন্ট বাদ বা পরিবর্তন করা হয়।
পঞ্চম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ’ অধ্যায়ও পরিমার্জন করা হয়। ফলে আগের বইয়ের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উপস্থাপনায় দৃশ্যমান পার্থক্য তৈরি হয়।
এক বছর পর আবার ৯৯ বই
২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও মাধ্যমিক স্তরের ৯৯টি বই পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের আরও ৩৬টি বই পরিবর্তনের কাজ নেওয়া হয়েছে। ইতিহাসের অংশেও পরিবর্তন এসেছে। ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পাশাপাশি নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের বিষয় যুক্ত করা হয়েছে।
অষ্টম শ্রেণির বাংলা বই থেকে ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দিয়ে জুলাই-আগস্ট আন্দোলন যুক্ত করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের একটি সংস্করণে ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার কথাও লেখা হয়েছে।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে নতুন পরিবর্তন
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বইয়েও মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী এবং অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ব্রিগেড ফোর্সের বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে।
ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বিভিন্ন বইয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার ভূমিকা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে জিয়াউর রহমানের ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধও যুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কারণ, ঘটনাপ্রবাহ, হতাহত, শহীদদের আত্মত্যাগ, নারীদের ভূমিকা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিভিন্ন বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আনন্দময় শিক্ষা’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ নামে চারটি নতুন বইও যুক্ত হচ্ছে।
বারবার কেন বদল
গত দেড় দশকে পাঠ্যবই পরিবর্তনের কারণ এক নয়। কখনও শিক্ষাক্রম পরিবর্তন, কখনও ভুলত্রুটি সংশোধন, আবার কখনও বিতর্ক বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কনটেন্ট বদলানো হয়েছে। ২০১৭ সালের লেখা বাদ-সংযোজন, ২০২৩-২৪ সালে নতুন শিক্ষাক্রমের বইয়ে ভুল সংশোধন ও বিভিন্ন কনটেন্ট নিয়ে বিতর্ক, ২০২৫ সালে একসঙ্গে ৪৪১টি বইয়ে পরিবর্তন এবং ২০২৬ সালে ৯৯টি মাধ্যমিক বইয়ে পরিবর্তন তার উদাহরণ।
এখন প্রশ্ন উঠছে, পাঠ্যবই প্রণয়নের আগে গবেষণা, সম্পাদনা ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর ছিল; যে কারণে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানোর পরও বারবার তা সংশোধন বা পরিমার্জনের প্রয়োজন হচ্ছে।
সরকার বদলালে বদলে যায় কনটেন্ট
শিক্ষায় এগিয়ে আছে, এমন দেশগুলোতেও পাঠ্যক্রমে নিয়মিত পরিবর্তন করা হয়। তবে এসব দেশের বেশিরভাগ কারিকুলামই পরিবর্তন হয় মূলত তথ্য ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন পাঠের জন্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক কারণে এক্ষেত্রে ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়েই বেশি পাঠ বদলায়। গত দেড় দশকের পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তন পর্যালোচনা করলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে ইতিহাস ও বিভিন্ন কনটেন্টের উপস্থাপনেও পরিবর্তনের নজির দেখা যায়।
২০১৭ সালে হেফাজতে ইসলামের দাবির প্রেক্ষাপটে পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। পরে নতুন শিক্ষাক্রমে ‘বিবর্তনবাদ’ এবং ২০২৪ সালে ‘শরীফার গল্প’ নিয়েও বিতর্কের পর পরিবর্তন আসে।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ সালের বইয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসের উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ও উদ্ধৃতি বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা, মুক্তিযুদ্ধের গল্প-কবিতা ও অন্যান্য কনটেন্ট বাদ দেওয়া এবং সংযোজন করা হয়। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনা, আবু সাঈদ ও মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত করা হয়।
২০২৬ সালের বইয়েও অষ্টম শ্রেণির বাংলা বই থেকে ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দিয়ে জুলাই-আগস্ট আন্দোলন যুক্ত করা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা কীভাবে পাঠ্যবইয়ে উপস্থাপিত হবে, তা সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে বদলানোর নজির দেখা যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব কী
শিক্ষাবিদরা বলছেন, পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের ওপর কী প্রভাব ফেলছে; এর সরাসরি উত্তর পেতে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন। তবে একই শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ভিন্ন সময়ে ভিন্ন কনটেন্ট পড়ায় মুক্তিযুদ্ধ, গণঅভ্যুত্থান, রাজনৈতিক ইতিহাস, সাহিত্য ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে প্রজন্মভেদে শেখা তথ্যের পার্থক্য তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সময়ের সঙ্গে পাঠ্যবই হালনাগাদ করা স্বাভাবিক। তবে ইতিহাস ও মূল্যবোধ সম্পর্কিত বিষয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত বদলালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্ঞান কাঠামো তৈরি কঠিন হতে পারে। তাই পাঠ্যবই প্রণয়নে গবেষণা, প্রমাণ ও শিক্ষাবিজ্ঞানের ভিত্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রশ্নটি সামনে আসছে।
শিক্ষাবিদদের বক্তব্য
শিক্ষাবিদ, নাট্যকার ও নাট্যনির্দেশক অধ্যাপক মলয় ভৌমিক বলেন, ‘বারবার পাঠ্যবই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেক সময় যথেচ্ছ বা উদ্দেশ্যমূলক পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে। পাঠ্যবই পরিবর্তনের সংকট শুধু ২০১০ সাল থেকে শুরু হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকেই শিক্ষাব্যবস্থায় সংকট রয়েছে। কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত ছিল, সেটি আলোর মুখ দেখেনি। সেখান থেকেই সংকটের শুরু।’
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে প্রাথমিকের কোমলমতি শিশুদের কয়েক বছর পরপর নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে ফেলা হলে তারা যেন গিনিপিগ হয়ে যাচ্ছে। অন্তত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রকৃত ইতিহাস ও সংস্কৃতির জায়গায় বারবার হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। একটি শিশু আজ যে ইতিহাস একভাবে পড়ছে, কয়েক বছর পর যদি তার বিপরীত কিছু পড়ে, তাহলে তার মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হবে; আমি আগে যা পড়েছি, সেটা তাহলে ঠিক ছিল না?’
পাঠ্যবই পরিবর্তনের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে শিক্ষাকে সংকীর্ণ দলীয়করণ করা হয়েছে। যারা ক্ষমতায় আসে, তারা তাদের বয়ান বা ন্যারেটিভ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঢোকাতে চায়। স্বাধীনতার পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে একটি রাজনৈতিক সংকট রয়েছে। ফলে সময়ের সঙ্গে ন্যারেটিভও পরিবর্তিত হয়েছে।’
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে. চৌধূরীও মনে করেন, বারবার পাঠ্যবই পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে বাচ্চাদের গিনিপিগ বানিয়ে ফেলছি। এর সুযোগে গাইড বই ও কোচিংনির্ভরতা বাড়ছে, যা পরিবারের ব্যয়ও বাড়াচ্ছে। ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নিই না। ইতিহাস কি বদলে দেওয়া যায়? ইতিহাস যুগে যুগে থাকে। নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের মতো করে বদলানোর চেষ্টা করলেও মূল কথাটা বাদ পড়ে গেলে ক্ষতিটা শিক্ষার্থীদেরই হয়।’
তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী এক শ্রেণিতে যে ইতিহাস পড়ছে, পরবর্তী সময়ে তার সঙ্গে মিল না পেলে মনে প্রশ্ন তৈরি হয়; আমি যেটা পড়ছি, সেটা তাহলে ঠিক নয়? এভাবে প্রজন্মের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ইতিহাস বদলানোর চেষ্টা পৃথিবীর কোনও দেশেই সফল হয়নি।’
পাঠ্যবই পরিবর্তনের পেছনে রাজনীতি ও ব্যবসা কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটা কারণ হচ্ছে রাজনীতি, আরেকটা কারণ হচ্ছে ব্যবসা। পাঠ্যপুস্তক বদলালেই গাইড বই ও কোচিংয়ের ব্যবসা বাড়ে।’
তিনি বলেন, ‘সময়, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে পাঠ্যবই পরিবর্তন স্বাভাবিক। ভুল তথ্য সংশোধন ও নতুন জ্ঞান যুক্ত করাও প্রয়োজন। তবে পরিবর্তন যখন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত হয়ে পড়ে, তখন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।’
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন গবেষণা ও প্রমাণের ভিত্তিতে ইতিহাস পরিমার্জন করা সম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ইতিহাসের মৌলিক বয়ান বারবার বদলালে একটি প্রজন্ম বিভ্রান্ত হতে পারে। প্রয়োজন সরকার পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে স্থায়ী, গবেষণাভিত্তিক ও বিশেষজ্ঞনির্ভর পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যবই পর্যালোচনা ব্যবস্থা।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক কাবেরী গয়েন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সব সরকারের আমলেই সরকারি কর্তাব্যক্তিদের অভিনব চিন্তার প্রথম প্রয়োগ আমরা দেখি শিক্ষার্থীদের ওপরেই। তাদের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শিক্ষার্থীদের ওপর এর প্রভাব মারাত্মক হতে পারে। কিছু দিন পরপর নতুন পাঠ্যক্রম চালুর ফলে শিক্ষার্থীরা একটি শিক্ষা পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হওয়ার আগেই ভিন্ন পদ্ধতির মুখোমুখি হয়। এতে অনিশ্চয়তা ও অসহায়ত্ব তৈরি হয়।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সব শিক্ষার্থীর পারিবারিক শিক্ষাসূচক এক নয়। ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা। বাড়ে ব্যক্তিগত শিক্ষক ও কোচিং নির্ভরতা। নতুন বই, শিক্ষকদের অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং পরীক্ষা পদ্ধতি বদলে যাওয়ার কারণে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের সেরা পারফরম্যান্স দেওয়া সম্ভব না হলে অনিবার্য ভিকটিম হয়ে পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এর প্রভাব পরীক্ষার ফলাফলেও দেখা যায়। পাশাপাশি মানসিক চাপ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়, যা কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যার মতো ঘটনাতেও গড়াতে পারে।’
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পাঠ্যবই ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের দেশের রাজনৈতিক অসৌজন্য ও অসহিষ্ণুতার রোগ, যার ভিকটিম হতে হয় শিক্ষার্থীদের। ইতিহাস বিকৃতি যেকোনও সভ্য দেশেই মারাত্মক অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হলেও আমাদের দেশে অহরহ ঘটছে। এর পরিণতি ভয়াবহ।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা অনেক সময় জেনেই ইতিহাস মুখস্থ করে বা পরীক্ষার খাতায় লেখে যে এটি সত্য নয়, শুধু পাস করার জন্য পড়ছে। ফলে জাতির ইতিহাস শেখার প্রতি তারা অমনোযোগী হয়ে পড়ে এবং লিখিত ইতিহাসের প্রতি সন্দেহ ও বিতৃষ্ণা নিয়ে বেড়ে ওঠে। যে জাতি সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত রাখে, সে জাতি ইতিহাসবিমুখ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। সঠিক ইতিহাস জানা কতটা জরুরি, দলীয় স্বার্থের কারণে আমাদের রাজনীতি বরাবরই তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর দায় সাধারণ মানুষকে নিতে হচ্ছে এবং হবে।’
শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১৭ সালে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুতে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়। সে সময় বিভিন্ন শ্রেণির বাংলা বইয়ে লেখা বাদ দেওয়া ও নতুন লেখা যুক্ত করা হয়। নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বই থেকেও পাঁচটি লেখা বাদ দিয়ে পাঁচটি নতুন লেখা যুক্ত করা হয়। এ নিয়ে তখন ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।’