এক বর্গকিলোমিটারের কম জায়গায় ৩০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চাপে আবাসিক জীবন

এস এম আব্বাস
২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০০ আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০০

ঘর থেকে বেরোলেই চোখে পড়ে একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সড়কের এ পাশে একটি স্কুল তো ওপাশে আরেকটি। আবাসিক এলাকার একই ব্লকে কয়েক পা হাঁটলেই দেখা মিলছে নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কোথাও বাংলা মাধ্যম, কোথাও ইংরেজি মাধ্যম। কোথাও মাদ্রাসা, আবার কোথাও কোচিং সেন্টার। রাজধানীর ছোট্ট আবাসিক এলাকা লালমাটিয়া ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘনবসতিতে। অথচ একসময় এলাকাটি ছিল শান্ত আবাসিক জনপদ।

সম্প্রতি একদিন সকাল সাড়ে ১১টায় স্থানীয় রিকশাচালক দেলোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে লালমাটিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখার কাজ শুরু হয় এই প্রতিবেদকের। মোহাম্মদপুর ও লালমাটিয়ার অলিগলি তার চেনা। জাকির হোসেন রোড ধরে সি ব্লকে ঢুকতেই চোখে পড়ে একের পর এক স্কুল। একই সড়কে কয়েক পা হাঁটলেই পাওয়া যায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত ঘুরে ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া যায়।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তথ্য অনুযায়ী, লালমাটিয়া আবাসিক এলাকার আয়তন মাত্র শূন্য দশমিক ৭৩ বর্গকিলোমিটার। এই এলাকায় সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, কোচিং সেন্টার ও নানা ধরনের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আশপাশেও আছে কারিগরি ও উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাপ শুধু শ্রেণিকক্ষের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই; প্রভাব পড়ছে সড়ক, ফুটপাত ও আবাসিক পরিবেশেও।

সরেজমিন বিভিন্ন ব্লক ঘুরে দেখা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠান কাছাকাছি অবস্থানে পরিচালিত হচ্ছে। কোনও কোনও প্রতিষ্ঠানের একাধিক শাখাও রয়েছে। অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল নামে একটি স্কুলের অন্তত ছয়টি ক্যাম্পাস দেখা গেছে এই লালমাটিয়ায়।

লালমাটিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন, অনুমোদিত ক্যাম্পাসের সংখ্যা ও শিক্ষাক্রম সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও নিবন্ধনের অবস্থা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর পরিচালনা ও তদারকির বিষয়টিও সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব দেখার কেউ নেই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ইংরেজি মাধ্যমের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য কোরআন শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। কোথাও সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাক্রম ও পরিচালনাব্যবস্থা এক নয়। তবে অভিভাবকদের চাহিদা, শিক্ষার ধরন ও অনুমোদনের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সরকারি-বেসরকারি স্কুল, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা

সরেজমিনে দেখা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে লালমাটিয়া সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও লালমাটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ ছাড়া রয়েছে লালমাটিয়া গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ফাউন্ডেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বেঙ্গলি মিডিয়াম হাই স্কুল ও সহজ পাঠ উচ্চবিদ্যালয়।

ইংরেজি মাধ্যম ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, কোকাবুররা অস্ট্রেলিয়ান স্ট্যান্ডার্ড স্কুল, সেন্ট পল’স স্কুল, অ্যাকাডেমিয়া, অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ওয়েটন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ক্রেস্টউড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, ম্যাংগ্রোভ স্কুল, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া স্কুল, এক্সিলেন্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, লিজেন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও প্রিমিয়ার স্কুল, ঢাকা।

ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জামিয়া ইসলামিয়া, মাদ্রাসা নূরে মদিনা, মাশকুল কোরআন, মাদরাসাতুল কলম ও ইসলামিয়া মাদ্রাসা। সামাওয়াত ইসলামিক স্কুলের পাশাপাশি হেফজুল কোরআন শিক্ষার ব্যবস্থার কথাও জানা গেছে।

স্কুলের বাইরে আছে শান্ত-মারিয়াম ইনস্টিটিউট অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, ফিউচার ব্যারিস্টার্স অ্যাকাডেমি ও বিভিন্ন কোচিং সেন্টার। এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সঙ্গে এডুকেট অ্যাকাডেমি নামে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালিত হয় এই আবাসিক এলাকায়।

এত অল্প জায়গায় এত ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পেছনে শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও অভিভাবকদের পছন্দের ভূমিকা থাকলেও প্রশ্ন উঠছে, আবাসিক এলাকার ধারণক্ষমতা কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

ডি ব্লকে ‘পিস স্কুল’-এর কার্যক্রম

লালমাটিয়ার ডি ব্লকে আলোচিত ‘পিস স্কুল’-এর কার্যক্রম চলতে দেখা গেছে। ২০১৬ সালের আগস্টে বিতর্কিত কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় লালমাটিয়ার পিস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পাঠদানের অনুমতি বাতিলের নির্দেশ দেয়। একই সময়ে পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ এবং জাকির নায়েকের বক্তব্যে গুলশানের হলি আর্টিজান হামলাকারীদের কেউ কেউ প্রভাবিত হয়েছিলেন, এমন অভিযোগ সামনে আসার পর পিস স্কুলগুলোর কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। পরে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড স্কুলটির সাময়িক নিবন্ধন বাতিল করে।

লালমাটিয়া এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

পিস স্কুল বন্ধ হওয়ার পর আগের ভবনটি ভেঙে সেখানে অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, পিস স্কুলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে নতুন ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন। স্কুলটির কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর এর শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ নতুন প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়েছিলেন বলেও তারা জানান।

একসময় অনুমোদন বাতিল হওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর একই এলাকায় নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা এবং পরবর্তী সময়ে আবার পিস স্কুলের কার্যক্রম দেখা যাওয়ার বিষয়টি শিক্ষা প্রশাসনের নজরে নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে ডি ব্লকে পরিচালিত পিস স্কুলটির নিবন্ধন ও অনুমোদনের অবস্থা যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আশপাশেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘনত্ব

লালমাটিয়ার আশপাশে রয়েছে সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউট, সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ (ইউডা) ও সেন্ট জোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়। মোহাম্মদপুরে রয়েছে ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজ ও মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়।

লালমাটিয়ার ভেতরের প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রতিদিন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের যাতায়াত রয়েছে। ফলে পুরো এলাকার সড়কব্যবস্থা ও আবাসিক পরিবেশের ওপর সম্মিলিত চাপ কতটা পড়ছে, তা নিয়ে পরিকল্পিত পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

‘এলাকাবাসী জিম্মি’

লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটির নিরাপত্তা কমিটির সভাপতি বেলাল আহমেদ বলেন, ‘লালমাটিয়ায় কোচিং সেন্টার ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সংখ্যা এত বেড়ে গেছে যে, আমরা এলাকাবাসী এখন অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছি। এসব প্রতিষ্ঠানের কারণে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। স্কুলের ক্লাস শুরু ও ছুটির সময় সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়। আশপাশের দোকানপাট ও সড়কেও নানা ধরনের সমস্যা হচ্ছে। আমরা যারা এখানে বসবাস করি, তারা এখন অনেকটা বিপদের মধ্যে আছি।’

নিজের পরিবারের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এলাকার পরিবর্তনে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘লালমাটিয়া আমার খুব প্রিয় এলাকা। আমার বাবা ও দাদার জন্মও এখানে। আমার মেয়েও লালমাটিয়া কলেজে পড়েছে। অথচ একসময় যে এলাকাটি এত সুন্দর ও বসবাসের উপযোগী ছিল, সেখানে এখন একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এত অল্প জায়গায় এতগুলো স্কুল ও কোচিং সেন্টারের আসলেই প্রয়োজন আছে কি না, তা ভেবে দেখা দরকার।’

বেলাল আহমেদের ভাষ্য, একের পর এক প্রতিষ্ঠানের শাখা গড়ে উঠলেও এলাকার ধারণক্ষমতা এবং বাসিন্দাদের সুবিধা-অসুবিধা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট অধিদফতর এ বিষয়ে উদ্যোগ নিক। লালমাটিয়ায় কতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, কোথায় সেগুলো স্থাপন করা যাবে এবং কোন প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় বা অধিদফতরে আবেদন করার সুযোগ থাকলে আমরা সেই উদ্যোগ নিতে চাই।’

লালমাটিয়াকে আরও সুন্দর ও পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন বেলাল আহমেদ। তবে নিরাপত্তা কমিটির নিজস্ব জায়গা ও পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় কার্যক্রম চালাতে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকেরা পাশে দাঁড়ালে এলাকার সমস্যাগুলো সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

লালমাটিয়ায় সেদিন নিজের ব্যক্তিগত কাজে এসেছিলেন বাংলাদেশের ব্যান্ড ‘অ্যাশেজ’-এর ড্রামার তৌফিক আহমেদ বিজয়। তিনিও মনে করেন, এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেশি। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানে কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, তা সরকারের ঠিক করা উচিত। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলো কত টাকা টিউশন ফি নিতে পারবে, সেটিও নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এখানে জনঘনত্ব বেশি, রাস্তাও চাপা। স্কুল ছুটি হলে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়।’

তবে যানজটের জন্য শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেননি এই শিল্পী। তার মতে, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ফুটপাত দখলও যানজটের অন্যতম কারণ। এসব বিষয়ে সরকারের নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

লালমাটিয়ায় কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, কোনগুলোর নিবন্ধন ও অনুমোদন আছে, এক নিবন্ধনের আওতায় একাধিক ক্যাম্পাস পরিচালিত হচ্ছে কি না এবং আবাসিক এলাকায় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের শর্ত যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি চান স্থানীয় বাসিন্দারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এফ ব্লকের এক বাসিন্দা জানান, স্কুলের সামনে যানজট, ফুটপাত দখল ও সড়কের ওপর চাপ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। শিক্ষার প্রসার অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই প্রসার যেন আবাসিক এলাকার স্বাভাবিক জীবনকে গ্রাস না করে, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্ব নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য

বাংলা মাধ্যমের বেসরকারি বিদ্যালয় স্থাপন, পাঠদানের অনুমতি ও অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনে পরিবর্তন এসেছে। ২০২২ সালের নীতিমালায় এসব অনুমোদনের চূড়ান্ত দায়িত্ব শিক্ষা বোর্ডের হাতে দেওয়া হয়। তবে ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে এসব অনুমোদনের দায়িত্ব ন্যস্ত করে অফিস আদেশ জারি করা হয়। ওই বছরের ২৯ জুলাই একই বিষয়ে সংশোধিত আদেশ প্রকাশ করা হয়।

এরপরও মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের দিয়ে বিদ্যালয় সরেজমিন পরিদর্শন ও আবেদন যাচাইয়ের পর পাঠদানের অনুমোদন ও অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি ও অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতির আবেদন যাচাইয়ে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়। অক্টোবরে প্রকাশিত আদেশেও অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতির আবেদন যাচাইয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদন-সংক্রান্ত কার্যক্রমের দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকলেও যাচাই-বাছাই করে শিক্ষা বোর্ড।

অন্যদিকে, ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ের নিবন্ধন আলাদা বিধিমালার আওতায় পরিচালিত হয়। ২০১৭ সালের বিদেশি কারিকুলামে পরিচালিত বেসরকারি বিদ্যালয় নিবন্ধন বিধিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ের নিবন্ধন ও নবায়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে।

জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন। এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও স্বীকৃতির বিষয়টি ঢাকা শিক্ষা বোর্ড দেখে। আমাদের সঙ্গে এ বিষয়ে তাদের কোনও যোগাযোগ নেই। এ ধরনের স্কুলের বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের স্কুল পরিদর্শক ও চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। স্কুল চালু করা বা বন্ধ করার বিষয়টিও তাদের এখতিয়ার।’

জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্ব এখন আমাদের এখতিয়ারবহির্ভূত। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেয়। আগে শিক্ষা বোর্ডের এ দায়িত্ব ছিল। তবে বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। আমরা মূলত পরীক্ষা, রেজিস্ট্রেশন, ফরম পূরণ, নাম সংশোধনসহ পরীক্ষা-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করি। পরীক্ষা-সংক্রান্ত কোনও অনিয়ম হলে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার আমাদের রয়েছে। এর বাইরে অন্যান্য কার্যক্রম সাধারণত আমরা নিয়ন্ত্রণ করি না।’

একই এলাকায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের চাহিদার ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া হয়। শহরাঞ্চলে একই ভবনে দুই-তিনটি প্রতিষ্ঠানও থাকতে পারে। সেখানে শিক্ষার্থীর অভাব হয় না। তবে গ্রামাঞ্চলে এভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে অপরিকল্পিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পরিচালনা কমিটি পুরোপুরি আমাদের এখতিয়ারাধীন। কমিটির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কমিটি ভেঙে দেওয়া থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।’

‘শিক্ষা খাতে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাব’

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে আলাপের সময় নাম উদ্ধৃত করে বক্তব্য দিতে চাননি কেউই। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন কয়েকজন। তাদের ভাষ্য, শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যবসা সম্প্রসারণেও প্রতিষ্ঠানগুলোর নজর বেশি। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিশুদের খেলাধুলার জন্য মাঠ নেই। শ্রেণিকক্ষ ও ভবনের মধ্যেই তাদের দিনের বড় অংশ কাটে। স্থানীয় এক বাসিন্দার ভাষায়, ‘শিশুরা যেন ফার্মের মুরগির মতো বড় হচ্ছে।’

সাবেক অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ, শিশুসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিষয়ক নিবন্ধকার মো. রহমত উল্লাহ বলেন, ছোট্ট এলাকা লালমাটিয়ায় অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার বিষয়টি শিক্ষা খাতে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবের দিকটি সামনে আনে। দেশে বাংলা মাধ্যম, ইংলিশ ভার্সন, ইংলিশ মিডিয়াম, আরবি মাধ্যমসহ নানা ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও সেগুলোর পাঠ্যক্রম, শিক্ষকদের যোগ্যতা, শিক্ষার পরিবেশ, বেতন-ফি এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর তদারকি কতটা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

তার মতে, সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও মাদ্রাসার অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ আলাদা হওয়ায় সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি অনুমোদনহীন কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে। সরকারি ও অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাঙ্ক্ষিত মান বজায় রাখতে না পারাও নতুন নতুন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার অন্যতম কারণ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় সমন্বিত ও পরিকল্পিত সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি।

সম্প্রতি শিক্ষায় ক্রমবর্ধমান বৈষম্য প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এ বিষয়ে কথা বলেন শিক্ষাবিদ রাশেদা কে. চৌধূরী। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধ করতে হবে। কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। শুধু ইংরেজি মাধ্যম না, দেদার যেখানে সেখানে স্কুল মাদ্রাসা গড়ে উঠছে সেখানে আমাদের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকারের উচিত এই দেশে কত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন তা নিরূপণ করা। সারা দেশে যে যার মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করছে, কিন্তু মনিটরিংয়ের সক্ষমতা কতটুকু। কোথায় প্রতিষ্ঠান দরকার কোথায় দরকার নেই তা নিশ্চিত করা দরকার অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে। মনিটরিংয়ের জন্য লোকবল বাড়াতে হবে।’

/আইএএম/ইউএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
পুরান ঢাকায় অগ্নিঝুঁকি কমাতে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চান ডিএসসিসি প্রশাসক
ব্যবসায়ীকে আটকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি: ডিজিএফআই-আনসার সদস্যসহ ৬ জন কারাগারে
যাত্রাবাড়ীর তাইম হত্যা: দ্বিতীয় দিনের যুক্তিতর্ক পিছিয়ে গেলো
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কাছে জামায়াত-এনসিপি বিরিয়ানির ভাগ চাইলেও পাওয়ার সম্ভাবনা নেই: রাশেদ খাঁন
বিএনপির কাছে জামায়াত-এনসিপি বিরিয়ানির ভাগ চাইলেও পাওয়ার সম্ভাবনা নেই: রাশেদ খাঁন
ভিড় জমিয়ে টাকা-স্বর্ণালঙ্কার চুরিই তাদের পেশা
ভিড় জমিয়ে টাকা-স্বর্ণালঙ্কার চুরিই তাদের পেশা
নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে চতুর্থ মেয়াদে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ফিলিস্তিনপন্থী লুলা
নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে চতুর্থ মেয়াদে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ফিলিস্তিনপন্থী লুলা
বরফের দেশে রক্তের জলপ্রপাত!
বরফের দেশে রক্তের জলপ্রপাত!
সর্বাধিক পঠিত
জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন কারা
জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন কারা
একসঙ্গে ২৫ জেলে আটক, ৮০ কেজি ইলিশ গেলো এতিমখানায়
একসঙ্গে ২৫ জেলে আটক, ৮০ কেজি ইলিশ গেলো এতিমখানায়
ঋতুস্রাবের সময় বিজয়ের সেবাযত্নের প্রশংসায় রাশমিকা
ঋতুস্রাবের সময় বিজয়ের সেবাযত্নের প্রশংসায় রাশমিকা
‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’-কমেন্ট কেন করেছিলেন, আদালতকে জানালেন সেই যুবক
‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’-কমেন্ট কেন করেছিলেন, আদালতকে জানালেন সেই যুবক
ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করা নারী আটক
ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করা নারী আটক