বাইরে তুমুল বৃষ্টি। ভেতরে তিল পরিমাণ ঠাঁই নেই। অডিটরিয়ামের বারান্দায় উপচানো ভিড়। বৃষ্টিস্নাত এই সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) জুড়ে যেন নতুন রূপে ফিরে এসেছেন অজস্র লাকী আখান্দ। গিটার হাতে সমস্বরে গেয়ে চলেছেন তারা- এই নীল মনিহার/ এই স্বর্ণালী দিনে/ তোমায় দিয়ে গেলাম/ শুধু মনে রেখো...।
কালজয়ী গানের কথা ধরে এই কিংবদন্তিকে এখনই বিদায় জানাতে প্রস্তুত নন এই প্রজন্মের অগুনতি লাকী আখান্দ। যারা আজ মঙ্গলবার সকাল দশটা থেকে এই আসরে গাইছেন, বাজাচ্ছেন, কণ্ঠ মেলাচ্ছেন অথবা গেল এক সপ্তাহ ধরে ‘ট্রিবিউট টু স্যার লাকী আখান্দ’ শিরোনামের আয়োজনটি বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। এদিন সন্ধ্যায় সহমত জানিয়ে আকাশটাও বুঝি কেঁদেছে বৃষ্টির সুরে।
কনসার্টের আজ (১৬ আগস্ট) প্রথমদিন। সকাল থেকে যে প্রবেশ পত্র ৫০-এ পাওয়া গেছে বিকাল পাঁচটা নাগাদ সেটি দাঁড়িয়েছে ন্যূনতম ৩০০ টাকায়। নির্দিষ্ট টাকার ওপরে স্বেচ্ছায় বাড়তি দিচ্ছেন যার যেটুকু সামর্থ। যার অধিকাংশই তরুণ কিংবা ছাত্র। অগুনতি লাকীপ্রিয় প্রবেশপত্র হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন অডিটরিয়ামের বাইরে। না, ভেতরে যাওয়ার জন্য নয়- এই অপেক্ষা প্রার্থনার আদলে। লাকী আখান্দকে ফেরানোর তাড়নায় এই নীরবতা।
সংগীতশিল্পী-মুক্তিযোদ্ধা লাকী আখান্দ দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ক্যানসারে ভুগছেন। চলমান চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজন প্রচুর অর্থের। সেই ভাবনা থেকে এই কিংবদন্তির চিকিৎসা চালিয়ে নিতে তহবিল সংগ্রহের জন্য টানা দুই দিনের কনসার্ট আয়োজন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যান্ড সোসাইটি।
এদিকে আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাবি কালচারাল সোসাইটি ছাড়াও এই মঞ্চে পারফর্ম করেছে ব্যান্ড স্ক্রিচ, ফ্রিড, স্কিল্ড, সায়নাইড, আনস্পেসিফাইড, মানব, হ্যাশ, এক্সেনেমি, রোদ, ওয়ারসাইট, দুর্গ, সহজিয়া এবং অ্যাশেস।
তাহসান অ্যান্ড দ্য ব্যান্ড রাত ৮টায় এবং প্রথম দিনের শো স্টপার হিসেবে সাড়ে ৮টায় পারফর্ম করবে ব্যান্ড আরবোভাইরাস।
কাল বুধবার একই মঞ্চে পারফর্ম করার কথা রয়েছে এভয়েড রাফা, ওয়ারসাইট, অর্জন, নিউ সোনার বাংলা সার্কাস, ওল্ড স্কুল, চাতক, আপেক্ষিক, অর্ব অব উইন্টার, অ্যাক্রিড, অজ্ঞাতনামা, নীল নকশা, অসৃক, ঢাকা ১২০৭, রোদ, ইকুয়েশন, রেডিয়েশন প্রভৃতি ব্যান্ড।
‘ট্রিবিউট টু স্যার লাকী আখান্দ’ কনসার্টের অন্যতম সমন্বয়কারী লালন মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই কনসার্ট উপভোগ করার জন্য আনুষ্ঠানিক কোনও টিকেটের ব্যবস্থা করা হয়নি। এমনকি এতে অংশ নেওয়া ব্যান্ডগুলোর সদস্যরাও কোনও পারিশ্রমিক নিচ্ছেন না। তবে লাকী স্যারের চিকিৎসা তহবিল সংগ্রহের জন্য সকাল থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত কনসার্ট অডিটরিয়ামের প্রবেশ মুখে ন্যুনতম ৫০ টাকার বিনিময়ে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছি। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে দর্শক-শ্রোতাদের চাপ বেড়ে যায়। দুপুর নাগাদ ১৫০০ আসনের অডিটরিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। সে জন্য বিকাল পাঁচটার দিকে প্রবেশ মূল ন্যূনতম ৩০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। এতেও শ্রোতাদের আগ্রহে এতটুকু ভাটা পড়েনি। অসংখ্য শ্রোতা অডিটরিয়ামের বাইরে অপেক্ষা করছেন। জানি, স্যার (লাকী আখান্দ) এই দৃশ্য দেখলে খুব খুশি হতেন। তাঁর এই খুশি আমরা ধরে রাখতে চাই।’
উল্লেখ্য, বাংলা গানের কিংবদন্তি লাকী আখান্দ ছয় মাসের চিকিৎসা শেষে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থেকে চলতি বছরের ২৫ মার্চ দেশে ফেরেন। সেখানে কেমোথেরাপি নেওয়ার পর শারীরিক অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়েছিল তার। এ বছরের জুনে আবারও থেরাপির জন্য ব্যাংকক যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি যেতে পারেননি।
বিশেষ সূত্রে জানা যায়, মূলত আর্থিক সংকটের কারণেই উন্নত চিকিৎসা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন তিনি ও তার পরিবার।
এখন তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
ছবি: ফাহিম হাসান।
/এমএম/




