‘অর্ডার, অর্ডার’—কাঠের হাতুড়িতে বাড়ি দিয়ে মহামান্য বিচারকের বলা এ শব্দটা বাংলা সিনেমায় খুব পরিচিত। চলচ্চিত্রের এই দৃশ্য বাস্তব হয়েছে এখন। কাঠগড়ার সেই চৌকাঠে উঠেছেন ঢাকাই ছবির দুই শিল্পী নিপুণ ও জায়েদ খান। মূল বিষয় সাধারণ সম্পাদক পদ।
আর সে কারণেই এখনও চলছে এফডিসিতে দ্বৈত নিয়ম-নীতি। যেখানে এক পক্ষের আয়োজনে পাওয়া যাচ্ছে না অপরজনকে। তবে গেলো ক’দিন এফডিসিতে নিপুণের পক্ষে ও নির্দেশেই হচ্ছে অনেক কাজ। বিশেষ করে পুরনো চেয়ার ফেলে সমিতিতে ঢুকেছে নতুন চেয়ার, টেবিলে উঠেছে নতুন নেমপ্লেট, বদলেছে তালা, পরিবর্তন করা হয়েছে সিসি টিভির পাসওয়ার্ড, সমিতির বারান্দায় ঝোলানো খাঁচা থেকে টিয়া পাখি উন্মুক্ত করার নির্দেশ... ইত্যাদি!
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) হলো মিষ্টিমুখ। চললো ফটোসেশনও। সাধারণ সম্পাদকের চেয়ারে বসে টেবিলের সামনে নতুন নেমপ্লেট রেখে হলো ফটোসেশনও!
আর সেখানেই বোধহয় মহামান্য আদালতের নির্দেশনা অবমাননার বিষয়টি দাঁড়ালো। অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করলেন, আদালত যেখানে এই পদে স্থিতাবস্থা জারি করেছেন, সেখানে এমন আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম চলে কেমন করে!
বিস্মিত জায়েদ খানও। বলেন, ‘তারা কি আইন-কানুনের ঊর্ধ্বে চলে গেছে? এটা কীসের বহিঃপ্রকাশ? ক্ষমতা? কোন ক্ষমতা বলে নিপুণ এসব করছেন? যারা সাধারণ মানুষ তারা একটু ভাবলেই বুঝবেন, গায়ের জোরে এসব করা হচ্ছে। যেমনভাবে শত শত বহিরাগত এনে কথিত আপিল বোর্ড বানিয়ে নিজেকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করেছেন নিপুণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘মহামান্য আদালত একটা বিষয় নিয়ে আদেশ দিয়েছেন তারা সেটা মানছেন না। বুঝলাম না তারা কি আদালতের আদেশ বোঝেন না? আমি আর এই বিষয়ে কথা বলবো না, মহামান্য আদালত যা বলার বলবেন।’
অন্তত আদালতের শেষ আদেশটা পড়লে জায়েদের এই বিস্ময় প্রকাশের বিষয়টি টের পাওয়া যায়।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের চেম্বার জজ আদালত আদেশ দেন বাংলাদেশ শিল্পী সমিতি নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদের ওপর স্থিতাবস্থার। এর ফলে আপাতত আর কেউ ওই পদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। একইসঙ্গে আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়।
সংযুক্তিতে আদালত আরও স্পষ্ট করে বলেন, আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিপুণ বা জায়েদ খান কেউ শিল্পী সমিতিতে দায়িত্ব পালনে যেতে পারবে না। চেয়ারে বসতেও পারবে না।
বিষয়টি নিয়ে নিপুণের ফোনে যোগাযোগ করা হয় একাধিকবার। যথারীতি তাকে পাওয়া যায়নি। কথা বলেছেন সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক সাইমন সাদিক।
বলেন, ‘মহামান্য আদালত আগের করা হাইকোর্টের রিটটি স্থগিত করেছেন। মানে আপিলে আদালত নিপুণ আক্তারের পক্ষে আদেশ দিয়েছেন। তাই তিনিই এখন সাধারণ সম্পাদক। আর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কিনা, এটা আমরা নকল (আদেশ) দেখে বলতে পারবো।’
এদিকে বিষয়টির বিস্তারিত জানান বাংলা ট্রিবিউন-এর উচ্চ আদালত প্রতিনিধি ও আইনজীবী বাহাউদ্দিন ইমরান। তিনি বলেন, ‘এখানে আদালত দুটি বিষয়ে আদেশ দিয়েছেন। প্রথমত, বাংলাদেশ শিল্পী সমিতি নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদের ওপর আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থিতাবস্থা দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, একই তারিখ পর্যন্ত হাইকোর্টে করা জায়েদ খানের রিটের আদেশ স্থগিত করেছেন। এছাড়াও সর্বশেষ মহামান্য আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন, এই সময় পর্যন্ত ওই পদের দুই প্রার্থীর কেউই কার্যালয়ে যাবেন না এবং সাধারণ সম্পাদকের চেয়ারে বসবেন না।’
তবে বিষয়গুলো নিয়ে গলা ঝেড়ে কথা বলতে চান না ইলিয়াস কাঞ্চন-নিপুণ প্যানেলের কেউ। আর সে কারণে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বৃহস্পতিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে সমিতির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন কাঞ্চন-নিপুণ। যেখানে দেখা যায়নি মিশা-জায়েদ প্যানেলের নির্বাচিত কাউকে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সমিতির সভাপতি ইলিয়াস কাঞ্চন, সহ-সাধারণ সম্পাদক সাইমন সাদিক, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া সম্পাদক ইমন, কার্যকরী সদস্য ফেরদৌসসহ অনেকেই।
বিষয়টি নিয়ে সহ-সাধারণ সম্পাদক সাইমন সাদিক বলেন, ‘নিপুণ আপা সাধারণ সম্পাদক। কারণ, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেছেন।’
তবে এটাও ঠিক, সাধারণ সম্পাদকের এই পদটি নিয়ে এত জলঘোলা সাধারণভাবে নিচ্ছে না চলচ্চিত্র ও অভিনয় সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করছেন, পদ নিয়ে শিল্পীদের আদালত পর্যন্ত যাওয়া কখনোই ইতিবাচক কিছু নয়। অন্যদিকে, দ্বারস্থ হলেও মহামান্য আদালতের সেই ‘অর্ডার, অর্ডার’ শব্দগুলো সেখানকার চার দেয়ালেই আটকে আছে। পৌঁছাচ্ছে না চলচ্চিত্র শিল্পের সূতিকাগার এফডিসিতে।







