বাফটা অ্যাওয়ার্ডসে সেরা চলচ্চিত্রসহ বড় জয় পেলো হলিউড তারকা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও অভিনীত ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। সর্বাধিক ৬টি পুরস্কার জিতেছে ছবিটি। সেরা শিশুতোষ ও পারিবারিক চলচ্চিত্র বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে ভারতের মণিপুরি ভাষায় নির্মিত ‘বুং’। এর অন্যতম প্রযোজক বলিউড অভিনেতা-নির্মাতা ফারহান আখতার।
‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ ছবির নির্মাতা পল টমাস অ্যান্ডারসন সেরা প্রযোজক, সেরা পরিচালক ও সেরা রূপান্তরিত চিত্রনাট্য বিভাগের স্বীকৃতি বাগিয়ে নিয়েছেন। ডার্ক কমেডি থ্রিলার সিনেমাটিতে দুর্নীতিগ্রস্ত সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল স্টিভেন জে. লকজো চরিত্রের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হয়েছেন আমেরিকান তারকা শন পেন। তবে অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন না। ছবিটির গল্পে দেখা যায়, একজন বাবা (ডিক্যাপ্রিও) তার মেয়ে (চেস ইনফিনিটি) অপহরণের পর সাবেক বিপ্লবীদের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করে।
লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী পরিচালিত ‘বুং’ ছবিতে মণিপুরের উত্তপ্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্থানীয় এক কিশোরের দিনলিপি তুলে ধরা হয়েছে। তার নাম বুং। ছেলেটি নিজের হারানো বাবাকে খুঁজে পেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কারণ সে জানে, বাবাকে খুঁজে আনলেই মায়ের মুখে হাসি ফুটবে। উত্তর-পূর্ব ভারতের আঞ্চলিক চলচ্চিত্রের জন্য বাফটায় পুরস্কার জয় একটি মাইলফলক বলা যায়।
তিনটি করে পুরস্কার জিতেছে মেক্সিকান নির্মাতা গিয়ের্মো দেল তোরোর ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ ও অস্কারে মনোনয়নে রেকর্ড গড়া ভ্যাম্পায়ার-হরর ‘সিনার্স’। উনমি মোসাকু ‘সিনার্স’-এ অ্যানি চরিত্রের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী হয়েছেন। তার মাধ্যমে চার বছর পর কোনও ব্রিটিশ তারকার হাতে উঠলো এই সম্মান। সিনেমাটির পরিচালক রায়ান কুগলার সেরা মৌলিক চিত্রনাট্যের স্বীকৃতি পেয়েছেন। এছাড়া সেরা আবহ সংগীত বিভাগে ‘সিনার্স’-এর জন্য পুরস্কার জিতেছেন সুইডিশ সুরকার লুদভিগ ইয়োরানসন।
সেরা অভিনেতা বিভাগে চমক
হলিউডের পাঁচ হেভিওয়েট তারকা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও, টিমোতি শালামে, মাইকেল বি. জর্ডান, ইথান হক ও জেসি প্লেমন্সকে হটিয়ে সেরা অভিনেতার ট্রফি জিতে বড় চমক দেখিয়েছেন রবার্ট আরামেয়ো। ‘আই সোয়্যার’ ছবিতে ট্যুরেট সিনড্রোম বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করা জন ডেভিডসনের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য এই স্বীকৃতি উঠেছে তার হাতে। এছাড়া দর্শকদের ভোটে উদীয়মান অভিনেতা হিসেবে বাফটা রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ তারকা। বাফটার একই আসরে কোনও অভিনেতা বা অভিনেত্রীর দুটি বিভাগেই পুরস্কার জয়ের ঘটনা এটাই প্রথম। ব্রিটিশ নির্মাতা কার্ক জোন্স পরিচালিত ‘আই সোয়্যার’ সেরা কাস্টিং স্বীকৃতিও পেয়েছে।
অসাধারণ ব্রিটিশ চলচ্চিত্রসহ দুটি পুরস্কার জিতেছে চীনের ক্লোয়ি জাও পরিচালিত ‘হ্যামনেট’। ম্যাগি ও’ফ্যারেলের উপন্যাস অবলম্বনে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের পরিবারের গল্পে অনুপ্রাণিত ‘হ্যামনেট’ ছবির জন্য প্রত্যাশিতভাবে সেরা অভিনেত্রী হয়েছেন জেসি বাকলি। শেক্সপিয়রের শোকাহত স্ত্রী অ্যাগনেস চরিত্রে হৃদয়ছোঁয়া নৈপুণ্য দেখিয়েছেন তিনি। তার মাধ্যমে প্রথমবার কোনও আইরিশ তারকার ঘরে গেলো সেরা অভিনেত্রীর স্বীকৃতি।
ব্রাজিলিয়ান থ্রিলার ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’কে হটিয়ে নরওয়ের পারিবারিক ড্রামা ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ সেরা অ-ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে। সেরা অ্যানিমেটেড ছবি হয়েছে ওয়াল্ট ডিজনি স্টুডিওস মোশন পিকচার্সের ‘জুটোপিয়া টু’। সম্প্রতি হলিউডে সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা অ্যানিমেটেড ছবির তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে এটি। বিশ্বব্যাপী বক্স অফিসে এর আয়ের পরিমাণ ১৭০ কোটি ডলার।
কারিগরি বিভাগগুলোর মধ্যে সেরা শব্দ পুরস্কার পেয়েছে ফর্মুলা ওয়ান নিয়ে ব্র্যাড পিট অভিনীত ‘এফওয়ান’। সেরা স্পেশাল ইফেক্টস জিতেছে জেমস ক্যামেরনের ব্লকবাস্টার ছবি ‘অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ’। ২০১০ সালে এই ফ্র্যাঞ্চাইজের প্রথম ছবি বাফটায় একই বিভাগে পুরস্কৃত হয়।
সেরা পোশাক পরিকল্পনা, সেরা শিল্প নির্দেশনা এবং সেরা রূপসজ্জা ও চুলসজ্জা বিভাগে পুরস্কার জিতেছে নেটফ্লিক্সের ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’। এতে কৃত্রিম মানবের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য প্রতিদিন ১০ ঘন্টা পর্যন্ত মেক-আপ চেয়ারে কাটিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান তারকা জ্যাকব এলোর্ডি।
সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার পেয়েছে ‘মিস্টার নোবডি অ্যাগেইনস্ট পুতিন’। রুশ স্কুলগুলোতে ঘটে যাওয়া দিনলিপি তুলে ধরা হয়েছে। সেসব চিত্র গোপনে ধারণ করা হয়েছিল।
২০২৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বিভিন্ন দেশের সিনেমার মধ্য থেকে সেরা কাজগুলো স্বীকৃতি পেয়েছে এবারের আসরে। টেবিল টেনিস ভিত্তিক সিনেমা ‘মার্টি সুপ্রিম’ ১১টি মনোনয়ন পেলেও ফিরেছে শূন্য হাতে। এমন ঘটনা আরও দু’বার ঘটেছে। কেন রাসেলের ‘উইমেন ইন লাভ’ (১৯৬৯) এবং ‘ফাইন্ডিং নেভারল্যান্ড’ (২০০৪) বাফটায় একাধিক বিভাগে মনোনীত হলেও কোনও পুরস্কার জেতেনি।
যুক্তরাজ্যের চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি বাফটার ৭৯তম আসর বসেছিল রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাতে। লন্ডনের সাউথব্যাংক সেন্টারের রয়েল ফেস্টিভ্যাল মিলনায়তনে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা ও পুরস্কার প্রদান করা হয়। ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন আর্টস (বাফটা) আয়োজিত অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ব্রিটিশ অভিনেতা অ্যালান কামিং। আসরে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্সেস অব ওয়েলস ক্যাথেরিন। এনবিসি ইউনিভার্সেলের স্টুডিও প্রধান ডোনা ল্যাংলিকে বাফটা ফেলোশিপ সম্মাননা তুলে দেন বাফটা সভাপতি উইলিয়াম।
৭৯তম বাফটা অ্যাওয়ার্ডসের বিজয়ী তালিকা
সেরা চলচ্চিত্র: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার (প্রযোজক অ্যাডাম সোমনার, সারা মারফি, পল টমাস অ্যান্ডারসন)
অসাধারণ ব্রিটিশ চলচ্চিত্র: হ্যামনেট (প্রযোজক লিজা মার্শাল, পিপ্পা হ্যারিস, নিকোলাস গন্ডা, স্টিভেন স্পিলবার্গ, স্যাম মেন্ডেস ও ম্যাগি ও’ফ্যারেল)
সেরা অভিনেতা: রবার্ট আরামেয়ো (আই সোয়্যার)
সেরা অভিনেত্রী: জেসি বাকলি (হ্যামনেট)
সেরা পার্শ্ব অভিনেতা: শন পেন (ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার)
সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী: উনমি মোসাকু (সিনার্স)
সেরা পরিচালক: পল টমাস অ্যান্ডারসন (ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার)
অসাধারণ নতুন ব্রিটিশ গল্পকার, পরিচালক অথবা প্রযোজক: মাই ফাদার’স শ্যাডো (আকিনোলা ডেভিস জুনিয়র ও ওয়েল ডেভিস)
সেরা অ-ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র: সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু (নরওয়ে)
ইই বাফটা রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড (দর্শক ভোট): রবার্ট আরামেয়ো
সেরা প্রামাণ্যচিত্র: মিস্টার নোবডি অ্যাগেনস্ট পুতিন
সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র: জুটোপিয়া টু (ওয়াল্ট ডিজনি স্টুডিওস মোশন পিকচার্স)
সেরা শিশুতোষ ও পারিবারিক চলচ্চিত্র: বুং
সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য: সিনার্স (রায়ান কুগলার)
সেরা রূপান্তরিত চিত্রনাট্য: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার (পল টমাস অ্যান্ডারসন)
সেরা মৌলিক আবহ সংগীত: সিনার্স (লুদভিগ ইয়োরানসন)
সেরা চিত্রগ্রহণ: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার (মাইকেল বাউম্যান)
সেরা কাস্টিং: আই সোয়্যার (লরেন এভান্স)
সেরা পোশাক পরিকল্পনা: ফ্রাঙ্কেনস্টাইন (কেট হোলি)
সেরা চলচ্চিত্র সম্পাদনা: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার (অ্যান্ডি জার্গেনসেন)
সেরা শিল্প নির্দেশনা: ফ্রাঙ্কেনস্টাইন (টামারা ডেভারেল ও শেন ভিউ)
সেরা রূপসজ্জা ও চুলসজ্জা: ফ্রাঙ্কেনস্টাইন (জর্ডান স্যামুয়েল, ক্লায়োনা ফিউরি, মাইক হিল ও মেগান ম্যানি)
সেরা শব্দ: এফওয়ান (আল নেলসন, গোয়েন্ডোলিন ইয়েটস হুইটল, গ্যারি অ্যা. রিজো, হুয়ান পেরালতা, গ্যারেথ জন)
সেরা স্পেশাল ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস: অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ (জো লেটেরি, রিচার্ড বেইনাম, এরিক সেইন্ডন, ড্যানিয়েল ব্যারেট)
চলচ্চিত্রে অসাধারণ ব্রিটিশ অবদান: ক্লেয়ার বিনস (ক্রিয়েটিভ পরিচালক, পিকচার হাউস সিনেমাস ও পিকচার হাউস এন্টারটেইনমেন্ট)
সেরা ব্রিটিশ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র: দিস ইজ এন্ডোমিট্রিওসিস
সেরা ব্রিটিশ অ্যানিমেটেড স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র: টু ব্ল্যাক বয়েজ ইন প্যারাডাইস






