ফজলুল কবির তুহিন, নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের অত্যন্ত স্নেহভাজন একজন বহুমুখী প্রতিভাবান শিল্পী। হুমায়ূন আহমেদের পরিচালিত জনপ্রিয় নাটক ‘আজ রবিবার’-এ ‘হিমু’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান। একই সঙ্গে তিনি একজন গীতিকার, সুরকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক। চলতি বছরই মুক্তি পেতে যাচ্ছে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘বিলডাকিনি’। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে লিখেছেন এই গুণী শিল্পী।
১৯৯৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বৃহৎ পরিসরে সুনামগঞ্জে আয়োজন করা হয় হাছন রাজা লোক-উৎসব। এ উৎসবের অন্যতম প্রস্তাবক হিসেবে আমার ইচ্ছা ছিল, প্রধান অতিথিদের একজন হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর সাহিত্য, নাটক ও ব্যক্তিত্ব আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাই আয়োজনের শুরু থেকেই তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিই।
তখন অনেকেই চেয়েছিলেন আমলা বা শীর্ষ রাজনীতিবিদদের অতিথি করতে। কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিল, এই লোক-উৎসবের প্রাণ হয়ে উঠবেন হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আমি আশ্রয় নিই তাঁর ঘনিষ্ঠজন, দেশবরেণ্য সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরীর। সালেহ চৌধুরী ছিলেন হুমায়ূন আহমেদের অত্যন্ত প্রিয় মানুষ; তাঁকে স্যার স্নেহভরে “নানা” বলে ডাকতেন। তাঁর সহযোগিতায় অবশেষে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়।
স্যারের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় গিয়ে আমরা তাঁকে উৎসবে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানাই। তিনি আন্তরিকভাবে সম্মতি দেন। ট্রেনের টিকিটের কথা বলতেই হেসে বলেছিলেন, “আমি তো কখনো একা কোথাও যাই না। আরও অনেকে থাকবে। টিকিট নিয়ে চিন্তা কোরো না, আমি উৎসবের দিনই চলে আসব।”
উৎসবের আগে আমরা ট্রেনে করে সিলেটের পথে রওনা হই। পুরো পথজুড়ে স্যার নানা বিষয়ে গল্প করলেন। খুব কম কথা বললেও প্রতিটি কথায় ছিল গভীরতা। একসময় তিনি বললেন, “হাছন রাজাকে নিয়ে তেমন কিছু জানি না।” তখন আমরা তাঁকে একটি স্মারকগ্রন্থ তুলে দিই, যেখানে হাছন রাজার জীবন ও সংগীত সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ছিল। তিনি মুহূর্তেই সেটি পড়ে ফেলেন এবং বিস্ময়করভাবে প্রায় সবকিছুই মনে রাখেন।
অনুষ্ঠানে একটি ছোট্ট ঘটনা আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। প্রথমে হুমায়ূন আহমেদকে প্রধান অতিথি করার সিদ্ধান্ত থাকলেও পরে নানা কারণে তাঁকে বিশেষ অতিথি করা হয়। অথচ স্যার এ নিয়ে বিন্দুমাত্র বিরক্ত হননি। তাঁর বিনয়, উদারতা ও ব্যক্তিত্বের মহত্ত্ব তখন আমাদের আরও গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।
মঞ্চে উঠে মাত্র পাঁচ মিনিটের বক্তব্যেই তিনি পুরো অনুষ্ঠানকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তিনি বলেছিলেন, আমেরিকায় থাকাকালে একটি জনপ্রিয় ইংরেজি লোকগান শুনে তাঁর মনে হয়েছে—এমন অনুভূতি তো বহু আগেই হাছন রাজা তাঁর গানে প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, পাশ্চাত্যের শিল্পীদের বহু আগে হাছন রাজা মানুষের হৃদয়ের ভাষা, প্রেম ও আত্মিক অনুভূতির যে প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তা অনন্য। ইংরেজি গান “Close Your Eyes and Try to See” গানটি উল্লেখ করে হাছন রাজার “আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপরে” গানটি উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর সেই সংক্ষিপ্ত অথচ হৃদয়স্পর্শী বক্তৃতা আজও সুনামগঞ্জের মানুষের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।
উৎসব শেষে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা চলেছিল। সেই আড্ডায় আমি গেয়েছিলাম শাহ আবদুল করিমের ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’। গান শুনে স্যার এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে পরদিনই করিমকে তাঁর সঙ্গে দেখা করানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরে করিমের গান শুনে তিনি আরও আবেগাপ্লুত হন এবং তাঁর গানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এবং নুহাশ চলচ্চিত্রের ব্যানারে একটি টিভি প্যাকেজ নির্মাণ করেছিলেন।
হুমায়ূন আহমেদের আরেকটি বড় গুণ ছিল তাঁর সহজ-সরল জীবনযাপন। খ্যাতির শীর্ষে থেকেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ। কোথাও গেলে সবার সঙ্গে একসঙ্গেই যেতেন, আলাদা কোনো আয়োজন চাইতেন না। মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। গ্রামের মানুষের সঙ্গে বসে গল্প করা, তাদের সঙ্গে খাওয়া কিংবা আড্ডা দেওয়া—এসবেই তিনি খুঁজে পেতেন প্রকৃত আনন্দ।
পরবর্তীকালে স্যারের আমন্ত্রণে আমরা তাঁর গ্রামের বাড়িতেও গিয়েছিলাম। সেখানে তিনি নিজ হাতে গ্রামের মানুষকে নিয়ে আয়োজন করেছিলেন গান, গল্প আর মিলনমেলার। শিল্পী, সাংবাদিক, লেখক—সবাই ছিলেন একই আসরে। সেই রাতের আড্ডা, গান আর স্যারের আন্তরিকতা আজও স্মৃতির ভাঁজে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
হুমায়ূন আহমেদ শুধু একজন জনপ্রিয় লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানুষের হৃদয় জয় করার এক বিরল শিল্পী। তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, অমায়িক ব্যবহার, গ্রামবাংলার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং মানুষের প্রতি সীমাহীন আন্তরিকতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
আজও মনে হয়, তিনি যেন কোথাও হারিয়ে যাননি। তাঁর লেখা, তাঁর কথা, তাঁর হাসি এবং মানুষের প্রতি তাঁর অফুরন্ত ভালোবাসা—সবকিছু মিলিয়ে তিনি আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন।





