এক যাযাবরের ডায়েরি থেকে

ব্রিটিশ ভারতের চলচ্চিত্র অগ্রদূতের ভগ্নপ্রায় জন্মভিটায়

রিয়াজ আহমদ
০২ আগস্ট ২০২৬, ১২:২১আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ১২:২২

শেষ এক মাইল পথ আর গাড়িতে যাওয়ার উপযোগী ছিল না। তাই গাড়ি থেকে নেমে মেঘলা দুপুরে গ্রামের সরু পথ ধরে হাঁটতে শুরু করি। মাথার ওপর প্রায় খাড়া সূর্যের কারণে আমার ছায়া তখন সবচেয়ে ছোট—পায়ের চারপাশে গুটিয়ে থাকা এক টুকরো অন্ধকার। গত সোমবার মানিকগঞ্জের বকজুড়ি গ্রামের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম, আমার ক্ষীণ ছায়াটি যেন শরীরের প্রকৃত প্রস্থটুকুই অনুকরণ করছে, কোথাও দীর্ঘ হচ্ছে না। আমি যত এগোচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল নিজেরই অবয়বের ছোট্ট এক কালো জলকাদার ওপর পা ফেলছি।

আলো আর ছায়ার এই খেলা দেড়শো বছর আগে এই গ্রামেই এক কিশোরকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। সম্ভ্রান্ত এক জমিদার পরিবারে জন্ম নেওয়া সেই ছেলেটি হাতের তালু আর আঙুলের ভঙ্গিমায় দেয়ালে ছায়াপুতুলের খেলা দেখাতো। বিস্ময়ের কিছু নেই যে, সেই শিশুই একদিন হয়ে উঠেছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম দেশীয় চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি-র প্রতিষ্ঠাতা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার। তার নাম হীরালাল সেন।

২০২১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ভাষার জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘হীরালাল’-এর পোস্টার। সিনেমায় ব্রিটিশ ভারতের অগ্রণী চলচ্চিত্র নির্মাতা হীরালাল সেনের জীবন, সাফল্য ও মর্মান্তিক পরিণতির গল্প তুলে ধরেছে। ছবি: সংগৃহীত

মাটির পথটি যেন আমাকে নিয়ে যাচ্ছিল তার শেকড়ে। সবুজে ঘেরা গ্রামের সরু রাস্তার দুপাশে তখন সড়ক উন্নয়নের জন্য ফেলে রাখা ছিল বালু উত্তোলনের পাইপ, ফলে হাঁটাটা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটার পর পৌঁছাই বকজুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির ভবনের নামকরণ করা হয়েছে হীরালাল সেনের নামে।

বিদ্যালয়ের ভেতরে শিক্ষক তুলসী রানী সরকার, শারমিন আখতার এবং তাদের সহকর্মীরা আমাকে স্বাগত জানান। তারা জানান, বিদ্যালয়ের পুরো প্রাঙ্গণ, পাশের খেলার মাঠ এবং পুকুর; সবই একসময় হীরালাল সেনদের পৈতৃক সম্পত্তির অংশ ছিল।

দুপুরের বিরতির ঘণ্টা বাজার আগে কয়েকটি ছবি তুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিদায় জানাই। এরপর হীরালালের বাড়ির ধ্বংসাবশেষে যাওয়ার জন্য একজনকে সঙ্গে চাইলে তিনটি শিশু আমাকে পুকুরের অপর পারে নিয়ে যায়। সেখানে বিশাল এক বটগাছের লতায় প্রায় আচ্ছাদিত অবস্থায় পড়ে আছে একটি ভগ্নপ্রায় স্থাপনা। দীর্ঘদিনের অবহেলায় বটগাছটি পুরোনো ইটের দালানের বুক চিরে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার মোটা ঝুরি শিকড়গুলো ঔপনিবেশিক আমলের ইটের দেয়ালকে যেন খাঁচার মতো জড়িয়ে ধরে রেখেছে।

ইতিহাসকে কীভাবে প্রকৃতি ধীরে ধীরে নিজের করে নেয়, তার এক অনন্য সাক্ষী এই স্থাপনাটি। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার ফলে একটি বিশাল বটগাছ পুরোনো ইটের তৈরি এই বাড়িটির ওপর ও ভেতর দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে। এটিই ছিল হীরালাল সেনের জন্মস্থান ও শৈশবের বাড়ি। ছবি: লেখকের সৌজন্যে

বৃহত্তর ধ্বংসাবশেষের এই অংশটুকুকে গ্রামের অনেকেই একটি প্রাচীন মন্দির বলে মনে করেন। আবার অনেকের দাবি, এটাই হীরালাল সেনের পৈতৃক বাড়ির অবশিষ্টাংশ।

সাপের ভয় থাকায় ভেতরে প্রবেশে স্থানীয়রা সতর্ক করলেন। তবু বাইরে দাঁড়িয়ে এখনো নিচতলার দরজা-জানালার ওপরের অলংকৃত খিলানের আভাস চোখে পড়ে। যদিও দেয়ালগুলো ভয়াবহভাবে ফেটে গেছে এবং প্রায় পুরো কাঠামোই বটগাছের শিকড়ের ওপর ভর করে টিকে আছে। এখানেই ছিল হীরালাল সেনের শৈশবের ঠিকানা।

১৮৬৬ সালের ২ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী হীরালাল সেনকে ইতিহাসবিদেরা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আধুনিক স্টুডিও গড়ে ওঠার বহু আগেই তিনি নির্মাণ করছিলেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র এবং বিজ্ঞাপনচিত্র। তার বাবা চন্দ্রমোহন সেন ছিলেন খ্যাতিমান আইনজীবী। তিনি প্রথমে ঢাকা জেলা আদালতে এবং পরে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে পরিবার নিয়ে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন।

 বাকজুরিতে হীরালাল সেনের পৈতৃক ভিটায় যাওয়ার এই গ্রামীণ কাঁচা পথটি দুই পাশে সবুজ গাছপালায় ঘেরা। তবে দীর্ঘদিন ধরে ধীরগতির সড়ক উন্নয়নকাজের কারণে পথজুড়ে পড়ে আছে বালু উত্তোলনের পাইপ, যা চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। ছবি: লেখকের সৌজন্যে

মানিকগঞ্জে ছাত্রজীবন এবং পরে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে পড়াকালেই হীরালাল অমরাবতী ফাইন আর্টস অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে বকজুড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলার প্রথম আলোকচিত্র স্টুডিও—‘হীরালাল অ্যান্ড ব্রাদার্স’।

১৮৯৮ সালে প্যারিসগামী একটি চলচ্চিত্রদল কলকাতার স্টার থিয়েটারে দ্য ফ্লাওয়ার অব পার্সিয়া মঞ্চনাটকের সঙ্গে স্টিভেনসনের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে। স্টিভেনসনের ক্যামেরা ধার নিয়ে হীরালাল ওই নাটকের ‘এ ড্যান্সিং সিন’ ধারণ করেন। পরে বাবা-মায়ের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে লন্ডন থেকে নিজের সিনেমাটোগ্রাফ ক্যামেরা কেনেন এবং একই বছর প্রতিষ্ঠা করেন রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি।

১৮৯৮ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত সৃজনশীল জীবনে তিনি ৪০টিরও বেশি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এর অধিকাংশই ছিল কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারে অমরেন্দ্র দত্তের মঞ্চনাট্যের চিত্রায়ণ। তাঁর দীর্ঘতম চলচ্চিত্র আলিবাবা অ্যান্ড দ্য ফোর্টি থিভস (১৯০৩) ছিল ক্লাসিক থিয়েটারের একই নামের নাটকের চলচ্চিত্রায়ণ। বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণেও তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের পথিকৃৎ। জবাকুসুম হেয়ার অয়েল এবং এডওয়ার্ডস টনিক-এর জন্য তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করেছিলেন।

সম্প্রতি আমি অরুণ রায় পরিচালিত জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র হীরালাল দেখেছি। চলচ্চিত্রটি শিল্পীর নিষ্ঠা, তাঁর সৃষ্টিকর্ম এবং ব্যক্তিগত বেদনার কাহিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে। একটি হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যে দেখা যায়, কলকাতা পুলিশ তাঁর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি চলচ্চিত্রের রিল জব্দ করে, যাতে সেটির জনসমক্ষে প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনাটি হীরালাল সেনকে রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণেরও পথিকৃৎ হিসেবে তুলে ধরে। কারণ, ১৯০৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর কলকাতা টাউন হলে অনুষ্ঠিত বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন ও ঔপনিবেশিকবিরোধী সমাবেশ তিনি ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন।

বাকজুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লেখক। হীরালাল সেনের নামে বিদ্যালয় ভবনটির নামকরণ করা হয়েছে। ছবি: লেখকের সৌজন্যে

১৯১৩ সালে রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি তাদের শেষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। ব্যবসায়িক দক্ষতার অভাবে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে এক রহস্যজনক গুদামঘরের অগ্নিকাণ্ডে হীরালালের আজীবনের সব চলচ্চিত্র ধ্বংস হয়ে যায়। এর কিছুদিন পর ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ১৯১৭ সালে অকালেই তার জীবনাবসান ঘটে।

তার মৃত্যুর বহু বছর পর ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়—ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকারের স্বীকৃতি কার প্রাপ্য? বাংলাদেশের হীরালাল সেন, নাকি ভারতের মহারাষ্ট্রের দাদাসাহেব ফালকে? তথ্য-প্রমাণের আলোকে এই বিতর্কের খুব বেশি প্রয়োজন নেই। ১৯০৩ সালে আলিবাবা অ্যান্ড দ্য ফোর্টি থিভস-এর মঞ্চাভিনয় চিত্রায়ণের মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারতে প্রথম চলমান চিত্র ধারণ করেছিলেন হীরালাল সেন। অন্যদিকে, দাদাসাহেব ফালকে ১৯১৩ সালে রাজা হরিশচন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে উপমহাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃতি পান। ঔপনিবেশিক ভারতের চলচ্চিত্র ইতিহাসে দুজনই তাই চিরস্মরণীয় অগ্রদূত।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে বানানো দেয়াল আজ মানুষের মিলনস্থল
গ্রেট হল থেকে গ্রেট ওয়ালশত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে বানানো দেয়াল আজ মানুষের মিলনস্থল
ফিলিপাইনের বুকে ছোট্ট এক টুকরো ভেনিস 
ফিলিপাইনের বুকে ছোট্ট এক টুকরো ভেনিস 
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
‘আগুনে ঘি ঢালবেন না’: হৃতিককে কঙ্গনার বার্তা
‘আগুনে ঘি ঢালবেন না’: হৃতিককে কঙ্গনার বার্তা
হলিউড ছবিতে বাবা বিজয় ও জেসন স্ট্যাথামকে চান জেসন সঞ্জয় 
হলিউড ছবিতে বাবা বিজয় ও জেসন স্ট্যাথামকে চান জেসন সঞ্জয় 
গোপনে বিয়ে করেছিলেন রাম গোপাল ও উর্মিলা?
গোপনে বিয়ে করেছিলেন রাম গোপাল ও উর্মিলা?
জুমানজি-ওপেন ওয়ার্ল্ড: বাস্তব দুনিয়ায় ভিডিও গেমের চরিত্ররা
জুমানজি-ওপেন ওয়ার্ল্ড: বাস্তব দুনিয়ায় ভিডিও গেমের চরিত্ররা
পরিচালকের বুকে কাজলের ট্যাটু, বিপর্যস্ত নায়িকা
পরিচালকের বুকে কাজলের ট্যাটু, বিপর্যস্ত নায়িকা