এ আই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মুহূর্তেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে গান। বিষয়টি কি চিন্তার ভাঁজ ফেলছে মিউজিশানদের মনে? তবে কি বেকার হতে বসেছেন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির সংশ্লিষ্টরা। গান তৈরিতে এ আই কি সত্যিই মানুষের বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে? এমন সব প্রশ্ন যখন উঠছে, তখন বিশ্বজুড়ে কথাও বলছেন মিউজিশিয়ানরা। আজ হলিউড বলিউডের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে বাংলাট্রিবিউনের অনুসন্ধানে ধরা পড়লো মিশ্র প্রতিক্রিয়া। দেখা যাক কি বলছেন হলিউড বলিউডের শিল্পীরা।
বলিউডের সংগীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং জেন-জি প্রজন্মের গানের ধারা নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে আবারও উঠে এসেছেন গীতিকার সমীর আনজান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আইএএনএস (আইএএনএস)-এর এক প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বক্তব্যে তিনি বলেন, “এআই মিউজিক তৈরি করতে পারে, কিন্তু ইমোশন তৈরি করতে পারে না।”
তার মতে, বর্তমান বলিউড সংগীতে বিট-নির্ভর প্রোডাকশন ও সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ডের কারণে অনেক গান দ্রুত জনপ্রিয় হলেও মেলোডি ও আবেগের গভীরতা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে জেন-জি শ্রোতাদের জন্য তৈরি গান এখন অনেক বেশি “রিল-ফ্রেন্ডলি” হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সংগীত অভিজ্ঞতা দুর্বল হচ্ছে—এই অভিযোগই এখন ইন্ডাস্ট্রির আলোচনার অংশ।
এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন বিশ্বজুড়েই গান তৈরি করা হচ্ছে। ওপেন-টেক্সট প্রম্পট থেকে পূর্ণ গান বানানোর মতো প্ল্যাটফর্ম যেমন সুনো এআই বা ইউডিও ব্যবহার করে সম্পূর্ণ ভোকালসহ গান তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে—যা আগে শুধু মানুষের স্টুডিও প্রোডাকশনে সীমাবদ্ধ ছিল।
এই প্রযুক্তির কারণে ইতিমধ্যেই কিছু এআই-জেনারেটেড গান বিশ্বমঞ্চে আলোচনায় এসেছে। ২০২৩ সালে ভাইরাল হওয়া “হার্ট অন মাই স্লিভ” নামের গানটি এআই ভোকাল ব্যবহার করে তৈরি হয় এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে লক্ষাধিক শ্রোতা পায়, যদিও পরে কপিরাইট বিতর্কে তা সরিয়ে নেওয়া হয়।
এরপর ২০২৫ সালে কিছু এআই-ভিত্তিক ট্র্যাক ও সামাজিক মাধ্যমের অডিও কনটেন্টও ভাইরাল হয়, যা সংগীতের মালিকানা ও সৃজনশীলতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করে।
হলিউড ও পশ্চিমা সংগীতাঙ্গনে এআই নিয়ে মতভেদও স্পষ্ট। বাংলাট্রিবিউনের অনুসন্ধানে দেখা যায় বিশ্বসংগীতকর্তারাও এ বিষয়ে মন্তব্য রাখছেন হরহামেশাই।
চলচ্চিত্র সংগীতের কিংবদন্তি সুরকার হ্যান্স জিমার বলেছেন, “এআই আইডিয়া তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু সংগীতের মূল আবেগ ও গল্প মানুষের অভিজ্ঞতা ছাড়া তৈরি হয় না। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সংগীতের ‘আত্মা’ মানবিক।”
কানাডিয়ান সংগীতশিল্পী গ্রাইমস এআই ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক অবস্থান নিয়ে বলেছেন, এটি ‘সহকারি টুলস’ হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে শিল্পীর নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি।
ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী স্টিং সতর্ক করে বলেছেন, “এআই দিয়ে তৈরি গান টেকনিক্যালি নিখুঁত হলেও অনেক সময় তা আবেগহীন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে আমেরিকান প্রযোজক টিম্বাল্যান্ড এআইকে ভবিষ্যতের শক্তিশালী প্রোডাকশন টুল হিসেবে দেখছেন, যা বিট, ডেমো ও প্রাথমিক কম্পোজিশন তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এই বিতর্কে বলিউড থেকেও গুরুত্বপূর্ণ মত এসেছে।
সংগীত পরিচালক এ আর রহমান বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “এআই প্রযুক্তি সংগীত প্রোডাকশনে সহায়ক হতে পারে এবং সাউন্ড ডিজাইনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তবে সংগীতের আসল প্রাণ হলো মানুষের অনুভূতি, যা কোনো মেশিন পুরোপুরি তৈরি করতে পারে না।”
একই প্রসঙ্গে গায়ক ও সংগীত পরিচালক বিশাল দাদলানি বলেছেন, “প্রযুক্তি কাজকে সহজ করলেও গানকে সত্যিকারের অনুভবযোগ্য করে তোলার ক্ষমতা এখনো মানুষের সৃজনশীলতার মধ্যেই আছে।”
সব মিলিয়ে বলিউড থেকে হলিউড—দুই জায়গাতেই একই প্রশ্ন ঘুরছে: এআই কি গান বানাতে পারে, কিন্তু গানকে সত্যিই অনুভব করাতে পারে?
বর্তমান প্রবণতা বলছে, এআই ইতিমধ্যেই সংগীত প্রোডাকশনের গতি ও ধরণ বদলে দিয়েছে, কিন্তু সংগীতের “আবেগ” এখনও মানবিক সৃষ্টিশীলতার সবচেয়ে বড় সীমারেখা হয়ে আছে।





