আশি ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার পর্দায় তার উপস্থিতি ছিল প্রায় অনিবার্য। নামটাই যথেষ্ট ছিল একটি সিনেমার ভাগ্য নির্ধারণ করে দেওয়ার জন্য। যার এক নজর নাচ দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহে ভিড় জমাতেন দর্শক, আর শিডিউলের জন্য প্রযোজকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেও রাজি ছিলেন-তিনি সিল্ক স্মিতা।
দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এক অবহেলিত গ্রাম্য মেয়ে থেকে ভারতের অন্যতম বড় সেক্স সিম্বল হয়ে ওঠার এই যাত্রাপথ যতটা চমকপ্রদ, তেমনই করুণ তার করুণ পরিণতি। বহু বছর পরও তার রহস্যময় জীবন মানুষকে আকর্ষণ করে, যা অনুপ্রাণিত করেছে বিদ্যা বালানের প্রশংসিত চলচ্চিত্র 'দ্য ডার্টি পিকচার'-কেও।
১০ বছর বয়সে পড়াশোনা ত্যাগ, ১৪ বছরে বিয়ে
অন্ধ্রপ্রদেশের কোভভালি গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সিল্ক স্মিতা। তার আসল নাম ছিল ভাদ্লাপাতি বিজয়লক্ষ্মী। চরম আর্থিক অনটনের কারণে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই, মাত্র ১০ বছর বয়সে পড়াশোনা ছাড়তে হয়।
শৈশব পার হতেই নেমে আসে বাল্যবিবাহের অভিশাপ। খবর অনুযায়ী, ১৪ বছর বয়সে পরিবারের পছন্দে না জানিয়েই তার চেয়ে বয়সে অনেক বড় এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের চরম নির্যাতনের শিকার হন তিনি। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে দুই বছর পর সেই সংসার ছেড়ে একা বাঁচার লড়াই শুরু করেন স্মিতা।
উপায় না পেয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে প্রথমে বাসাবাড়িতে কাজের লোকের (গৃহপরিচারিকা) কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সিনেমার সেটে মেকআপ সহকারী হিসেবে কাজ পান।
মিলের আটা থেকে রূপালী পর্দা : জীবনের মোড়
চেন্নাইয়ের এভিএম স্টুডিওর কাছে এক ময়দার মিলের সামনে স্মিতাকে দেখতে পান পরিচালক ভিনু চক্রবর্তী ও তার স্ত্রী কর্ণ পু। স্মিতার চেহারা ও সম্ভাবনা দেখে মুগ্ধ হন ভিনু চক্রবর্তী। তিনি স্মিতাকে চলচ্চিত্র শিল্পে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন এবং অভিনয়, নাচ ও চালচলনের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি না পেরোনো স্মিতার জন্য এটি ছিল এক অলৌকিক পরিবর্তন।
পরবর্তীতে মালয়ালম পরিচালক অ্যান্টনি ইস্টম্যানের 'ইনায় প্লাই থ্যাডি' সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান স্মিতা। যদিও ছবিটি অনেক পরে মুক্তি পায়। ততদিনে তিনি 'পুষ্যরাগম', 'সরস্বতীযামম' ও 'করিম্বনা'-র মতো বেশ কিছু মালায়ালম চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ফেলেন।
একটি চরিত্র যা বদলে দিল নাম
১৯৮০ সালের তামিল চলচ্চিত্র 'ভান্দিচক্করম'-এর মাধ্যমে স্মিতার জীবনে বিরাট মোড় আসে। শিবকুমার ও সরিতা অভিনীত এই ছবিতে 'সিল্ক' নামের এক গ্ল্যামারাস চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। পর্দায় তার উপস্থিতি এতটাই প্রভাব ফেলে যে, চরিত্রটির 'সিল্ক' নামটি তার নিজস্ব পরিচয়ের সঙ্গে চিরতরে জড়িয়ে যায়। ছবিতে তাঁর কণ্ঠের ডাবিং করেছিলেন হেমা মালিনী।
তবে যে চরিত্রটি তাকে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল, সেটিই তার অভিনয় জীবনের গতিপথ নির্দিষ্ট করে দেয়। এক সাক্ষাৎকারে স্মিতা স্বীকার করেছিলেন যে তিনি সাবিত্রী, সুজাতা বা সরিতার মতো চরিত্রাভিনেত্রী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু 'সিল্ক' চরিত্রের বিশাল সাফল্যের কারণে তাকে একের পর এক গ্ল্যামারাস ও আবেদনময়ী চরিত্রে কাস্ট করা শুরু হয়।
তারকাখ্যাতি ও আধিপত্য
চলচ্চিত্র শিল্প দ্রুতই বুঝতে পারে সিল্ক স্মিতা কেবল একজন গ্ল্যামারাস অভিনেত্রী নন, তিনি নিজেই এক বিশাল আকর্ষণ। তার নাচের দৃশ্যগুলো রাতারাতি জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এমনকি একটি সিনেমা তৈরি হবে নাকি মুক্তি পাবে, তাও অনেকাংশে নির্ভর করত তার উপস্থিতির ওপর। প্রায় ১৮ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৪৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
সেই সময়ে নিজের চাহিদার কারণে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পেতেন তিনি। জানা যায়, প্রতিটি নাচের দৃশ্যের জন্য তিনি পেতেন প্রায় ৫০ হাজার রুপি, যা সেই সময়ের তুলনায় ছিল বিশাল অঙ্ক। দিনে দুই থেকে তিনটি নাচের শুটিংও করতেন তিনি। ১৯৮২ সালের 'মুন্ড্রু মুগম' সিনেমায় রজনীকান্তের বিপরীতে অভিনয় করে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার গ্ল্যামার কুইন হিসেবে নিজের অবস্থান আরও মজবুত করেন।
রহস্যেময় প্রস্থান
১৯৯৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নিজের বাসা থেকে সিল্ক স্মিতার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। বলা হয়ে থাকে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন, তবে তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে নানা প্রশ্ন থেকে গেছে।
তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৫ বছর। দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ আর নির্যাতনের অন্ধকার পেরিয়ে যে জীবনের উত্থান ঘটেছিল অভাবনীয় খ্যাতি ও সাফল্যের চূড়ায়, তার সমাপ্তি ঘটল এক ট্র্যাজিক ও উত্তরহীন রহস্যের মাধ্যমে।
সূত্র : এনডিটিভি

শিশু কোলে ছবি দিয়ে পরীমণি বললেন ‘তিন নম্বর জন ডান’
হার্দিক পান্ডিয়ার সঙ্গে প্রেমের গুঞ্জনে নেটিজেনের ওপর চটলেন আমিশা

