স্বর্ণ পাম নিয়ে কানাকানি

Send
জনি হক, কান (ফ্রান্স) থেকে
প্রকাশিত : ১৪:২৬, মে ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৯, মে ২৫, ২০১৯

স্বর্ণ পামের প্রতীকি ছবিকানসৈকতে বিলাসবহুল হোটেল মার্টিনেজের সপ্তম তলায় সুইস অলঙ্কার প্রতিষ্ঠান চপার্ডের রুফটপ। ৫০০ বর্গমিটারের এই ছাদ থেকে ভূমধ্যসাগরের মনোরম সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭২তম আসরে আমন্ত্রিত তারকাদের অনেকের পা পড়েছে এখানে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই জায়গায়  আছে বিখ্যাত পাম দ’র!
আজ শনিবার (২৫ মে) সমাপনী অনুষ্ঠানের ঘণ্টাখানেক আগে এটি পালে দে ফেস্তিভাল ভবনে নিয়ে আয়োজকদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।  
কার হাতে উঠবে স্বর্ণ পাম? দক্ষিণ ফরাসি উপকূলে এখন চলছে সেই কানাকানি। পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হলে কুশল বিনিময়ের পরই প্রশ্ন আসছে, হোয়াট ইজ ইউর প্রেডিকশন অ্যাবাউট পাম দ’র? যদিও স্বর্ণ পাম নিয়ে যতই পূর্বাভাস করা হোক, শেষ পর্যন্ত সব ভেসে যায় চমকের জোয়ারে। তবুও চলছে কানাকানি। সবার মধ্যে এ নিয়ে দারুণ কৌতূহল।
সাল দুবুসির সামনে ফ্রান্সটু টিভি চ্যানেলের নারী সংবাদকর্মী পাসকেল দেশমের সঙ্গে কথা হলো। তার ধারণা, স্প্যানিশ নির্মাতা পেদ্রো আলমোদোভারের ‘পেইন অ্যান্ড গ্লোরি’ এবার পাম দ’র জিতে যেতে পারে। এতে পেদ্রো নিজের জীবনের গল্পই বলেছেন। এতে একজন চলচ্চিত্র পরিচালক শৈশব, অতীতের প্রেম ও নিজের পুরনো ছবিগুলোর দিকে ফিরে তাকান।
পাসকেলের আরেক পছন্দ দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাতা বন জুন হো’র ‘প্যারাসাইট’। সাল দুবুসির ভেতরে মঞ্চের একেবারে সামনে ঝাঁকড়া চুলের একজন সাংবাদিক তো বলে বসলেন, বন জুন হো পাম দ’র জিতলে উদোম গায়ে নাচবেন! সমালোচকদের বেশিরভাগই এই ছবি দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। এর গল্প চার সদস্যের একটি পরিবারকে ঘিরে। তাদের সবাই বেকার। গোপনে পাশের বাড়ির ওয়াইফাই ব্যবহার করে তারা। ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে একটি বৈশ্বিক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মালিকের বাড়িতে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ঢোকে তারা।
যদিও ঝাঁকড়া চুলের ওই সাংবাদিক মনেপ্রাণে চান, কোয়েন্টিন টারান্টিনোর ‘ওয়ান্স আপন অ্যা টাইম ইন হলিউড’ পাম দ’র জিতুক। এর প্রেক্ষাপট ১৯৬৯ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস। ঝলমলে পার্টি, তারকাদের উত্থান-পতনসহ হলিউডের স্বর্ণযুগের ঊষালগ্নের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তিনি।
১৯৯৪ সালের ১২ মে কান চলচ্চিত্র উৎসবে কোয়েন্টিন টারান্টিনোর ‘পাল্প ফিকশন’ ছবির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়েছিল। সেটি ছিল ৪৭তম আসর। ওইবার এটাই জেতে স্বর্ণ পাম। এর ২৫ বছর পূর্তিতে কানের ৭২তম আসরে টারান্টিনোর ‘ওয়ান্স আপন অ্যা টাইম ইন...হলিউড’ পাম দ’রের দৌড়ে শামিল।
ব্রাজিলের সাংবাদিক রড্রিগোর একই চাওয়া, টারান্টিনো ২৫ বছর পর আবারও স্বর্ণ পাম জিতুন। যদিও তার ধারণা, ফরাসি নারী নির্মাতা সেলিন সিয়ামার ‘পোর্ট্রেট অব অ্যা লেডি অন ফায়ার’ ছবিটির ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। এর বিষয়বস্তু নারী সমকামিতা।
চীনের সাংবাদিক শুশাঙ ‘পোর্ট্রেট অব অ্যা লেডি অন ফায়ার’-এর পক্ষে। এছাড়া তার মনে হচ্ছে ‘পেইন অ্যান্ড গ্লোরি’ পাম দ’র পেয়ে যেতে পারে। ভারতীয় সাংবাদিক ফায়জাল খান একটু আলাদা ছবির কথা বললেন। তার পূর্বাভাস, ‘লে মিজারেবলস’ স্বর্ণ পাম পেতে পারে। অবশ্য তিনিও ‘পেইন অ্যান্ড গ্লোরি’র পক্ষে।
স্বর্ণ পামের প্রতিযোগিতায় থাকা ছবিগুলোর স্টিলতবে বর্ষীয়ান ব্রিটিশ চলচ্চিত্রকার কেন লোচকে ফেলে দেওয়া ঠিক হবে না! ২০১৬ সালে ‘আই, ড্যানিয়েল ব্লেক’ ছবির মাধ্যমে স্বর্ণ পাম জেতেন তিনি। ৮২ বছর বয়সী এই নির্মাতা তিন বছর পর ফিরেছেন কানসৈকতে। তার নতুন ছবি ‘সরি উই মিসড ইউ’ আছে পাম দ’রের দৌড়ে। আধুনিক ইংল্যান্ডে অসচ্ছল একজন ডেলিভারি ড্রাইভার ও তার স্ত্রীর প্রতিকূল জীবন তুলে ধরা হয়েছে এতে।
কেন লোচের মতো দু’বার স্বর্ণপাম জয়ী বেলজিয়ামের জ্যঁ-পিয়ের দারদেন ও লুক দারদেনও তিন বছর পর ফিরছেন কানে। তাদের এবারের ছবি ‘ইয়াং আহমেদ’ পাম দ’র জিতে চমকে দিতে পারে। এর বিষয়বস্তু জঙ্গিবাদ। ১৯৯৯ সালে ‘রোসেট্টা’ ও ২০০৬ সালে ‘দ্য চাইল্ড’-এর মাধ্যমে পাম দ’র জেতেন দারদেন ভ্রাতৃদ্বয়।
প্রতিযোগিতা বিভাগে আছেন আরেক স্বর্ণ পাম জয়ী পরিচালক টেরেন্স মালিক। আট বছর পর কান দেখিয়েছে তার নতুন কাজ। এবারের ছবি ‘অ্যা হিডেন লাইফ’ তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। ২০১১ সালে ‘দ্য ট্রি অব লাইফ’ বানিয়ে পাম দ’র ঘরে তোলেন তিনি।
২০১২ সালে ‘ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার’ ছবির জন্য স্বর্ণ পাম জেতার ছয় বছর পর কানসৈকতে ফিরেছেন তিউনিসিয়ান বংশোদ্ভূত ফরাসি নির্মাতা আবদেললতিফ কেশিশ। তার নতুন ছবি ‘মেকতুব, মাই লাভ: ইন্টারমেজো’ বদলে দিতে পারে সব হিসাব-নিকাশ।
কানাডিয়ান তরুণ হাভিয়ার দোলান তিন বছর পর স্বর্ণ পামের লড়াইয়ে এসেছেন। তার ‘ম্যাথিয়াস অ্যান্ড ম্যাক্সিম’ প্রশংসিত হয়েছে। এই তরুণের হাতেও উঠতে পারে পুরস্কারটি।  
এবারের আসরে প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত ২১টি ছবির মধ্যে চারটির পরিচালক নারী। এগুলো হলো সেনেগালিজ বংশোদ্ভুত মাতি দিওপের ‘আটলান্টিক’, অস্ট্রিয়ার জেসিকা হজনারের ‘লিটল জো’, ফ্রান্সের সেলিন সিয়ামার ‘পোট্রেট অব দ্য ইয়াং গার্ল ইন ফায়ার’ ও জাস্টিন ত্রিয়েতের ‘সিবল’। তাদের মধ্যে মাতি দিওপ প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী নির্মাতা হিসেবে কম্পিটিশন বিভাগে জায়গা করে ইতিহাস গড়েছেন।
কানের ৭১ বছরের ইতিহাসে একমাত্র নারী নির্মাতা হিসেবে নিউজিল্যান্ডের জেন ক্যাম্পিয়ন ‘দ্য পিয়ানো’ ছবির জন্য পাম দ’র জয়ের গৌরব ধরে রেখেছেন। এবার সেই তালিকায় নতুন কেউ ঢুকতে পারেন কিনা দেখা যাক। ২০১১ সালের পর পাম দ’রের লড়াইয়ে ফের চার নারীর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে ৭২তম কানে।
ফিলিস্তিনের ইলিয়া সুলেমানের ‘ইট মাস্ট বি হ্যাভেন’, ব্রাজিলের ক্লেবার মেনদোসা ফিলো ও জুলিয়ানো দোরনেলিসের ‘বাকুরাউ’ ও কর্নেলিউ পরমবয়ুর ‘দ্য হুইজলার্স’-এর মধ্য থেকেও সেরা হয়ে যেতে পারে।
এবার প্রতিযোগিতা বিভাগে বিচারকদের প্রধান  মেক্সিকান নির্মাতা আলেহান্দ্রো গঞ্জালেজ ইনারিতু। তার রায়ে বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কারটি কার ঘরে যায়, কে সেই ভাগ্যবান নির্মাতা সেদিকে তাকিয়ে আছে তামাম দুনিয়া। প্রতি বছরের মতো এবারও হয়তো মানুষ যা ভাবছে, তিনি হয়তো রায় দেবেন উল্টোটা! কারণ কান মানেই চমকের পসরা!

/এমএম/

লাইভ

টপ