‘মন খারাপ হবে, যদি মনমতো অভিনয় না করে মরি’

Send
সুধাময় সরকার
প্রকাশিত : ১২:২০, আগস্ট ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৪, আগস্ট ২২, ২০২০

আরজে সায়েম। ভিজে সায়েম। বডি বিল্ডার সায়েম। ভদ্রছেলে সায়েম। ন্যাড়া সায়েম−এসব বলেও বন্ধু সমাজের কেউ কেউ আজকাল সম্বোধন করতে চান তাকে! মূলত তার নাম সায়েম সালেক। তবে এসবের বাইরে সব ছাপিয়ে যার প্রধান পরিচয় গড়ে উঠেছে, ‘জেগে আছো কি−সায়েম’ নামে। আজ (২২ আগস্ট) থেকে ঠিক ১২ বছর আগে (২০০৮ সাল) আরটিভির এই অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে পর্দায় অভিষিক্ত হন আরজে সায়েম। সঙ্গে ছিলেন তারই রেডিও-বন্ধু নওশীন। বেসরকারি টিভি চ্যানেলের দেশীয় ইতিহাসে এই অনুষ্ঠানটির রেশ আজও অমলিন।
এরপর সায়েম সালেক দেশের বেশিরভাগ চ্যানেলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রায় ৯০০টি পর্ব সঞ্চালনা করেছেন। যারমধ্যে রয়েছে সব রকমের শো। দায়িত্ব পালন করেছেন তিনটি রেডিও স্টেশনে। অভিনয় করেছেন ৩২টি নাটকে। দুবছর ধরে করছেন সকাল-সন্ধ্যা ওয়ার্ক আউট। আমূল বদলে দিয়েছেন নিজের লিকলিকে শরীর। সায়েমের দাবি, বাইরে বদল হলেও ভেতরটা নাকি আজও একই!
টিভি ক্যারিয়ারের যুগ পেরিয়ে বাংলা ট্রিবিউন-এর মুখোমুখি সায়েম সালেক−১২ বছর আগে ও পরে সায়েম সালেক

বাংলা ট্রিবিউন: ভেতরটা একই আছে! মানে আগে সিঙ্গেল ছিলেন, এখনও তাই?
সায়েম সালেক: তাই। কিন্তু আমার প্রসঙ্গ ঠিক তা নয়! মানে আমি আগের মতো এখনও সিঙ্গেল আছি, এটি সত্যি কথা। তবে আমি বলছিলাম, নিজের ভেতরের ইচ্ছা, আগ্রহ, সততা আর লক্ষ্যের কথা। এগুলো ক্যারিয়ারের শুরুতে যেমন ছিল, এখনও তাই।
১২ বছর আগের এই দিনে ‘জেগে আছো কি?’ শুরুর দিন থেকে যেভাবে প্রতিটা শো আর পর্বের প্রতি নিজের একাত্মতা-ডেডিকেশন ছিল, কালকে যে শো’টা করবো−সেখানেও ঠিক তাই। এসবের বিষয়ে আমি একচুলও নড়িনি।
বাংলা ট্রিবিউন: সম্ভবত যথার্থ বলেছেন। পর্দার ভেতরে ও বাইরে আপনাকে যারা জানেন-দেখেন, তারা নিশ্চয়ই সম্মত হয়েছেন। বিশেষ করে আপনি রোজ যেভাবে ঘাম ঝরান ব্যায়ামাগারে, ফেসবুকের দৌলতে সেখানেও স্পষ্ট আপনার ডেডিকেশন। চরিত্র কি চূড়ান্ত?
সায়েম সালেক: চরিত্র?
বাংলা ট্রিবিউন: যে সিনেমাটির জন্য এতো পরিশ্রম। তাছাড়া চরিত্রের প্রয়োজনেই তো পর্দার নামজাদারা আমূল বদলে ফেলেন নিজেকে। ঠিক, এইভাবে।
সায়েম সালেক: না না। এমন কিছু নয়। যা করছি, নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য। মানে নিজস্ব চরিত্রের জন্যই। এটা ঠিক, রেডিওতে তো আর চেহারা দেখা যায় না। তবে উচ্চারণের জন্য আবৃত্তির অভিজ্ঞতা ছিল। কিছু ট্রেনিং করেছি। প্রচুর পড়াশুনা করেছি। ভালোই চলছিল। কিন্তু রেডিওর দেড় বছরের মাথায় যখন টিভিতেও সুযোগ পেলাম, তখন থেকে এই শরীরটা নিয়ে চাপে ছিলাম।
লিকলিকে শরীর ছিল বলে অনেক জুনিয়র আমাকে ছোটভাই ভাবতো! অনেকে বলতো, তোমার এতো সুন্দর উপস্থাপনা, কণ্ঠ−কিন্তু শরীরের যত্ন নাও না কেন? এসব বিষয়ে শুরুর দিকে খুব মন খারাপ হতো। মূলত জিমের বিষয়টা তখন থেকেই মাথায় ঢোকে।
সাম্প্রতিক সময়ে সায়েম সালেকবাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু লিকলিকে থেকে সুঠাম শরীরের দেখা মিললো তো সম্প্রতি।
সায়েম সালেক: ঠিকই। কারণ, পুরোদমে শুরুটা করেছি ২০১৮ সাল থেকে। আসলে সব কিছুর পেছনে চরিত্র লাগে না, উৎসাহটাও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ২০১৮ সালে জিম শুরু করার পর, বেশ উৎসাহ পাচ্ছিলাম চারপাশ থেকে। সবাই বেশ পজেটিভ। হয় না, কোনও দিন ব্লু কালারের একটা জামা গায়ে দিলে কারণ ছাড়াই অনেকে প্রশংসা করে। জামাটা ধরে দেখে। দাম জিজ্ঞেস করে। বলে, খুব মানিয়েছে। এরপর সুযোগ পেলেই ঐ জামাটা পরে বের হতে ইচ্ছা করে। তো আমার জিম করার পেছনেও একই গল্প। উৎসাহ। আমি বিষয়টা এনজয় করি।
বাংলা ট্রিবিউন: ২০০৬-এর দিকে রেডিও টুডে-তে জয়েন করেছেন। ২০০৮ সালে ডাক পেলেন আরটিভি থেকে। ছোট্ট করে দুটো মাধ্যমের ট্র্যানজিশন পিরিয়ডের গল্পটা জানতে চাই।
সায়েম সালেক: এফএম রেডিওতে এই দেশে ওটাই প্রথম ব্যাচ। জগন্নাথে প্রথম বর্ষে পড়ি। সত্যি বলতে চাকরির জন্যই সেখানে যোগ দেওয়া। কোনও পরিকল্পনা ছিলো না। তাছাড়া, তখন তো এফএম সম্পর্কে আমরা কেউই আসলে কিছু জানি না। ছোটবেলা থেকে মঞ্চাভিনয়, আবৃত্তি এগুলো করেছি। উপস্থাপনা বা আরজেয়িং-তো করিনি। ক্রমশ শিখলাম, প্রচুর পড়াশোনা করলাম। তিল তিল করে তৈরি হতে থাকলাম।
আমাদের পরের ব্যাচে জয়েন করে নওশীন। দেখতে-শুনতে ব্রিলিয়ান্ট। ও দ্রুত সময়ে বন্ধুর মতো মিশে গেল আমাদের সঙ্গে।
২০০৮ সালের শুরুর দিকে আরটিভি থেকে একটা প্রস্তাব আসে। রেডিও জকিদের মতো করে একটা রাতজাগা শো করতে চায়। স্বাভাবিক, পর্দার ডাক। ছুটে গেলাম। শ্রদ্ধেয় ম. হামিদ স্যারের কাছে ইন্টারভিউ দিলাম। তিনি পছন্দ করলেন, তবে সঙ্গে একজন নারী আরজেও চাইলেন। যাতে আমরা দুজনে শোটা জমাতে পারি। সঙ্গে সঙ্গে নওশীনের নাম মাথায় এলো। হামিদ স্যার সম্মতি দিলেন। আমরা দুই বন্ধু আর প্রযোজক তানিফ মাহমুদ মিলে মাঠে নেমে পড়লাম। তার পরের অংশ তো ইতিহাস। টানা তিন বছর ৮ মাসে ১৮৭টি পর্ব করি।
আমি জানি না, এরপর এমন কোনও জনপ্রিয় শো হয়েছে কি না।
টিম ‘জেগে আছো কি?’বাংলা ট্রিবিউন: নওশীন নাহরীন মৌ। যুগপূর্তিতে আপনাকেও শুভেচ্ছা।
[পাঠকদের জন্য বলে রাখা দরকার, আপনাদের প্রিয় এই উপস্থাপক-অভিনেত্রী এখন বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সঙ্গে আছেন অভিনেতা স্বামী হিল্লোল। দুজনে ব্যস্ত হয়েছেন ইউটিউবের ফুড ভ্লগ নিয়ে।]
সায়েম, আপনি তো আছেনই। তো লকডাউনে পড়ে আপনারা দুজন ফের মিলিত হলেন। নিউইয়র্ক টু ঢাকা। অন্তর্জালে। ভালোই সাড়া মিলছে নিশ্চয়ই। কিন্তু ১২ বছরের পুরনো স্মৃতি আবার কেন খুঁড়তে গেলেন!
সায়েম সালেক: একদম সত্যি কথা। এটা আসলে সুখস্মৃতি খোঁড়ার মতোই। অথচ দুজনে যখন ঢাকায় ছিলাম, কত শত প্রস্তাব পেয়েছি আবার একসঙ্গে বসার- কিন্তু নানা কারণে হয়ে ওঠেনি। আবার একই রকম অনুষ্ঠান টিভিতে রিপিটও করতে চাইনি আমরা। মনে আছে, ‘জেগে আছো কি?’ যখন হিট হয়ে গেলো, তখন প্রায় একই সময়ে একই রকমের আরও ৮টি অনুষ্ঠান চলেছে বিভিন্ন চ্যানেলে!
বাংলা ট্রিবিউন: প্রসঙ্গ আবার এক হলেন কেমন করে কী ভেবে, ১২ বছর পরে।
সায়েম সালেক: তো লকডাউনে পড়ে যাওয়ার পর একদিন আমাদের শোয়ের পুরনো ছবিগুলো শেয়ার করলাম। দেখলাম, অসংখ্য কমেন্ট এলো। দেখলাম, মানুষ এখনও সেই শো আর আমাদের খুনসুটি মনে রেখেছেন। দেখলাম, এখনও সবাই আমাদের একসঙ্গে চাইছেন।
মহামারি, তাই আমাদেরও মন উচাটন ছিল। আমরাও স্মৃতিকাতর হলাম। পৃথিবীর দুই প্রান্তে বসে দুজনে সিদ্ধান্ত নিলাম- চল দোস্ত ফের আড্ডা মারি। এরমধ্যে ১০ পর্ব হয়ে গেলো। অদ্ভুত সাড়া পাচ্ছি। আমরাও রিচার্জ হচ্ছি।

বাংলা ট্রিবিউন: আজও (২২ আগস্ট) আপনারা শো করবেন। সম্ভবত।
সায়েম সালেক: জি, আজও করছি। আমাদের শোটি সাধারণত করি রবিবার রাত ১১টায়। তবে আজ (২২ আগস্ট) যেহেতু আমাদের যুগপূর্তি, তাই একদিন এগিয়ে নিলাম। আজকের সময় রাত ১০টা। একই টাইমে হবে আমাদের দুজনার ফেসবুক পেজ থেকে। পুরোটা সময় গল্প করবো ‘জেগে আছো কি?’ নিয়ে।




বাংলা ট্রিবিউন: আপনি বলছিলেন, এই শোটি জনপ্রিয় হওয়ার পর একই আদলে আরও আটটি শো হয়েছে বিভিন্ন চ্যানেলে। এই যে বছরের পর বছর চলে যায়, টিভি চ্যানেলগুলোতে দেখার কোনও অনুষ্ঠান হয় না। উপস্থাপকদের বলা হয় টেলিফোন অপারেটর! চলতে থাকে একই ফরমেটের অসংখ্য শো। কেন এমন হয়?
সায়েম সালেক: উত্তরে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কীইবা বলার আছে। আমি ছোট মানুষ। তাছাড়া আপনার প্রশ্নের মধ্যেই উত্তর রয়েছে। শুধু এটুকু বলি, আজ পর্যন্ত কোনও শোয়ের আগের রাত আমি ঘুমাতে পারিনি। প্রতিটা শোয়ের আগে আমার রাত পার হয় স্টাডি আর প্রস্তুতি নিয়ে। এবং ১২ বছরে এই আস্থাটা অর্জন করেছি- প্রযোজক ও শিল্পীদের কাছে। যারা শোয়ের আগে আমার নাম শুনলে বলেন, ‘ও সায়েম করছে? তাহলে টেনশন নেই।’
বাংলা ট্রিবিউন: এই যে স্টাডি বা ডেডিকেশন। উপস্থাপনা করে সারভাইব করা সম্ভব? সিঙ্গেল বলেই প্রশ্নটা করা।
সায়েম সালেক: হা হা হা। সিঙ্গেল হলেও বাসায় থাকি, কাপড় পরি, খাই। জিম করতেও বাড়তি খরচ! টু বি অনেস্ট, শুধু উপস্থাপনা দিয়ে সারভাইব করা সম্ভব না। কথাটি শুধুমাত্র ছেলেদের জন্য প্রযোজ্য।
যে শহরে এখনও বলতে শুনি, ‘ভাই উপস্থাপনার জন্য একটা মেয়ে লাগবে’- সেখানে ছেলেদের কোনও ভবিষ্যৎ থাকার কথা নয়।
বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে ১২ বছর ধরে এই অন্ধকারে পড়ে আছেন কী ভেবে!
সায়েম সালেক: দেখুন আমি যা পেয়েছি, সেটার জন্য হ্যাপি। রেডিও টুডে, ফুর্তিতে সফল ক্যারিয়ার ছিল। ক্যাপিটাল রেডিও গুছিয়েছি নিজ হাতে। এখন অবশ্য নেই আমি। ইনফ্যাক্ট এখনও আমি রেডিওর প্রতি আগ্রহী। কেউ একটু স্বপ্ন দেখালেই ছুটে যাবো। কারণ, ওটাই আমার প্রথম প্রেম। এরপর টিভিতে ‘জেগে আছো কি?’ করলাম। ‘তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ’ করলাম। দুটো অনুষ্ঠানই সুপারহিট। এরপর এখনও করছি অসংখ্য অনুষ্ঠান। সব মিলিয়ে আমি হয়তো সারভাইব করছি, কিন্তু নতুন ছেলেদের জন্য এটা আত্মাহুতি ছাড়া বিশেষ কিছু নয়।
তবে নারীদের বিষয়ে আমি স্পষ্ট নই।
সায়েম সালেকের শরীরচর্চাবাংলা ট্রিবিউন: এরমধ্যে আপনি অনেক নাটকও করেছেন। মানে অভিনয়। কিন্তু সেদিকটা তেমন জ্বললো না!
সায়েম সালেক: সম্ভবত ৩২টি নাটক করে ফেলেছি। আসলে ব্যাটে-বলে লাগেনি। কখনও আমার ভুল ছিল, কখনও নির্মাতার। ১২ বছরের জীবনে এটা একটা আক্ষেপ বটে। তবে এটাও সত্যি, আমি স্থির ও দীর্ঘ একটা ক্যারিয়ারের প্রার্থনা করেছি প্রথম দিন থেকে। তাই অস্থিরতা বা হতাশা নেই।
বাংলা ট্রিবিউন: সেটা আপনার শরীরচর্চা দেখলেই অনুমেয়! চরিত্রটা কি চূড়ান্ত?
সায়েম সালেক: হয়তো চূড়ান্ত। তবে অফিসিয়ালি এখনও আমি জানি না। যারা ভাবছেন, তারা আজও প্রস্তাবটি দেননি। তবে তার আগেই আমি নিজেকে গড়ে তুলছি।
একটা সিরিয়াস কথা বলি, অভিনয়টা আমি করতে চাই। নাটক, সিনেমা সবখানে।
আমার তো কেবলই মনে হয়, মনের মতো অভিনয় না করে মরলেও মন খারাপ হবে আমার। একটা গভীর স্বচ্ছ অভিনয়জীবন চাই। একজন রাইসুল ইসলাম আসাদ বা হুমায়ুন ফরীদির মতো অভিনেতার দিকে তাকিয়ে থাকি ফ্যাল ফ্যাল চোখে। কত সুন্দর ও গভীর অভিনয়জীবন তাদের।
এমন একটা জীবন নিয়ে আমি মৃত্যুর ওপারে যেতে চাই, হাসিমুখে।
বাংলা ট্রিবিউন: ওপারে যাওয়ার আগে আরও কিছু ফরমালিটিজ আছে। পাত্রীটা কি চূড়ান্ত?
সায়েম সালেক: হা হা হা। প্রথমে ভাবলাম একই প্রশ্ন! চরিত্র!
না, সেটাও চরিত্রটির মতোই। তৈরি আছে নিশ্চয়ই। তবে প্রস্তাব পাইনি। মানে পাত্রী ঠিক হয়নি। নিপাট সিঙ্গেল লাইফ এখনও। ভণিতা করবো না, সামনেই ৩৫-এ পা ফেলবো। প্ল্যান আছে ৩৬-এর মধ্যে বিয়ে করার। অবশ্য আব্বু-আম্মু বেঁচে থাকলে, এরমধ্যে হয়ে যেতো! তবে এখন ফেসবুক থেকে প্রচুর চাপ পাচ্ছি, বিয়ে কেন করছি না!
বাংলা ট্রিবিউন: আপনাকে অভিনন্দন। টিভি সঞ্চালনায় স্থির থেকে একযুগ পার করবার জন্য।
সায়েম সালেক: ধন্যবাদ। কৃতজ্ঞতা। এভাবেই স্থির থাকতে চাই।অবসরে সায়েম

/এমএম/এমএমজে/

লাইভ

টপ