সংগীত সংশ্লিষ্টদের অধিকার সংরক্ষণ করতে গিয়ে উল্টো বিপদে কপিরাইট রেজিস্ট্রার!

Send
সুধাময় সরকার
প্রকাশিত : ১৬:১৩, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৮, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

জাফর রাজা চৌধুরীসংগীতাঙ্গনের অচলাবস্থা আর অনিয়মের বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস। বিশেষ করে কপিরাইট রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বেগবান হয়েছে সংগীতাঙ্গনের মেধাস্বত্ব ও রয়্যালটি আইনের গতি। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরের সংগীত ইতিহাসে এবারই প্রথম কাছাকাছি সময়ে সংগঠিত হয়েছে সংগীতের প্রধান তিন পক্ষ। গড়ে উঠেছে গীতিকবি, সুরস্রষ্টা ও কণ্ঠশিল্পীদের আলাদা সংগঠন।
উদ্দেশ্য একটাই, কপিরাইট অফিসের সমর্থন নিয়ে সংগীতাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো। এবং বাংলাদেশে বিদ্যমান ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির স্বত্বের বিষয়ে শিল্পীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। প্রচলিত রয়েছে, এসব বিষয়ে এর আগে দেশের কোনও কপিরাইট রেজিস্ট্রার এভাবে ডোর টু ডোর কাজ করেনি। একইভাবে নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সংগীতশিল্পীদের এমন উদ্যমী হতেও দেখা যায়নি।
সংগীতের সিংহভাগ শিল্পী যখন বিষয়টিকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন, হচ্ছেন সংগঠিত, কপিরাইট অফিস থেকে নিচ্ছেন নিজ নিজ সৃষ্টির সার্টিফিকেট, দাবি তুলছেন অধিকার আদায়ের—তখনই বিপত্তির আভাস মিলছে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে।
অভিযোগ রয়েছে, যে কয়েকটি পক্ষ সংগীত স্রষ্টাদের ঠকিয়ে ‘লাভের গুড়’ ঘরে তুলেছে, তারাই এখন নানা মাধ্যমে প্রচার-প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে, জটিলতা সৃষ্টি করছে। শিল্পীদের মধ্যে তৈরি করতে চাইছে বিভেদ, বিতর্কিত করতে চাইছে কপিরাইট রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরীকে।
অনেকেই মনে করছেন, কপিরাইট অফিস তথা রেজিস্ট্রারের চলমান কার্যক্রম বিতর্কিত করে তাকে যদি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়, তবেই সফল হবে গুটিকয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। যারা গেলো ৩০ বছর ধরে নানাভাবে সংগীত স্রষ্টাদের ঠকিয়ে কোটি কোটি টাকা লোপাট করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা নানা বাহানায় আন্তর্জাতিক কপিরাইট আইন বাতিল করে শিল্পীদের ঠকানোর প্রক্রিয়া অব্যহত রাখতে চায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জাফর রাজা চৌধুরী বাংলাদেশ কপিরাইট রেজিস্ট্রার অফিসের দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৭ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা ছিল মাত্র সাড়ে পাঁচশ। এরমধ্যে সংগীতের কপিরাইট রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা কয়েকটি। এরপর জাফর রাজা চৌধুরীর একক প্রচেষ্টায় ২০১৮ সালে সে সংখ্যা বেড়ে হয় ১৮শ। গত বছর সেটি বেড়ে হয় তিন হাজার দুইশ’র বেশি, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ধারণা করা হচ্ছে, এবার (২০২০) সেটি বেড়ে দাঁড়াবে দ্বিগুণ।   
রাজার ভাষ্যে, ‘‘আমি এখানে দায়িত্ব পাওয়ার পর গ্রাফিক্স, পেইন্টিং, প্রকাশক, লেখক, চলচ্চিত্র, সংগীতের সঙ্গে যারা আছে, সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেছি। পাশাপাশি রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি অনলাইনে নিয়ে এসেছি। তবে এরমধ্যে সবচেয়ে অবাক লেগেছে গানের বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে। দেখলাম এখানে কপিরাইট করা ও  রয়্যালটি আদায়ের বিষয়ে প্রচণ্ড সমস্যা রয়েছে। গীতিকার-সুরকাররা অবাক হয়ে বললেন, ‘আমরা তো গানের জন্য কখনও রয়্যালটি পাই না।’ শুধু তা-ই না, আপনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন, একটা গানের স্রষ্টা তার ইউটিউবে গান ওঠালে স্ট্রাইক খাচ্ছেন! বলা হচ্ছে, এই গান আপনার না! এসব দেখে আমি সত্যিই অবাক হয়েছি। কারণ, এগুলো আমি জানতাম না। তো এই বিষয়টি আমাকে তাড়িত করে। কারণ, সরকারের একজন কর্মচারী হিসেবে এই বিষয়গুলো দেখার ও সমাধানের নৈতিক দায়িত্ব আমার। তাই আমি সংগীত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন বিষয়টি নিয়ে আলাপ করতে থাকলাম। বিষয়গুলো সমাধান করার পথ দেখালাম। সবাইকে কপিরাইট বিষয়ে সচেতন করলাম। এভাবে তিনটা বছর পেরিয়ে গেলো। এরমধ্যে বিস্ময় নিয়ে লক্ষ করলাম, আমার এসব উদ্যোগের কারণে অনেকের গাত্রদাহ হলো! বুঝলাম, শিল্পীদের অধিকার আদায় হোক, সেটা বুঝি অনেকে চাইছেন না। কিন্তু রাষ্ট্র আমাকে যে কাজটি দিয়েছেন, সেটি পালন না করাটাও তো আমার জন্য অপরাধ। এখানে আমি তো গীতিকার, সুরকার বা শিল্পী নই। আমার কোনও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও নেই। ফলে আমার স্বার্থটার পুরোটাই রাষ্ট্রীয়। আমি রাষ্ট্রের একজন কর্মচারী মাত্র।’’
জানা গেছে, কপিরাইট অফিসের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সাম্প্রতিক সময়ে সংগীত সংশ্লিষ্টদের একতাবদ্ধ হওয়া এবং নিজ নিজ মেধাস্বত্ব অধিকারে সোচ্চার হওয়ার ঘটনায় নাখোশ বিশেষ কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে রয়েছেন আইনজীবীও। অভিযোগ রয়েছে, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি বা মেধাস্বত্ব আইন বিষয়ে সচেতনতা ও রয়্যালটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গেলো কয়েক বছর ধরেই বড় অঙ্কের বাজেট নিয়ে গিলে ফেলেছেন কেউ কেউ। এমনকি শিল্পীদের রয়্যালটি বাস্তবায়নের জন্য সরকার অনুমোদিত সিএমও বিএলসিপিএস ২০১৪ সালে গঠিত হলেও সেখানে নেই সংগীতের সব বিভাগের যোগ্য প্রতিনিধি। এবং গেল ছয় বছরে এই প্রতিষ্ঠানটির প্রাতিষ্ঠানিক কোনও কার্যক্রমও চোখে পড়েনি। কাগজে কলমে যেটির সভাপতিত্ব করছেন নন্দিত কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। যদিও সামনে থেকে সেটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাইলস ব্যান্ডের হামিন আহমেদ।
অভিযোগ রয়েছে, কপিরাইট অফিসের সঙ্গে মূল বিপত্তিটা বাধে এই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের জবাবদিহি চাইতে গেলে। ফলে কপিরাইট রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরীকে বিতর্কিত করার লক্ষ্যে নানাভাবে ছড়ানো হচ্ছে মিথ্যা তথ্য। যারা প্রতিনিয়ত কপিরাইট অফিস ও মেধাস্বত্ব আইনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে।
জানা গেছে, রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী দায়িত্ব পাওয়ার পর দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে চিঠি দিয়েছেন। কারণ, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কপিরাইট অফিসে শিল্পীদের পক্ষ থেকে নানা কনটেন্ট ইস্যুতে অভিযোগ এসেছে। দেশের একমাত্র অনুমোদিত সিএমও বিএলসিপিএস-এর বিরুদ্ধেও রয়েছে শিল্পীদের নানা অভিযোগ।
শিল্পীদের দেওয়া এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গিয়ে বর্তমান কপিরাইট অফিস ‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ’ পেয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। মূল বিভেদের সূত্রপাত এখান থেকেই।  
প্রীতম আহমেদবাংলাদেশে কপিরাইট আন্দোলনকে বেগবান করার অন্যতম ব্যক্তিত্ব শিল্পী প্রীতম আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ভুয়া রয়্যালটি চুক্তির মাধ্যমে যারা ১০ বছর আমার ও শতাধিক শিল্পীর গানের টাকা মেরে দিয়েছে; তারাই এখন কপিরাইট রেজিস্ট্রারের বা আইনের বিরুদ্ধে নানাভাবে অভিযোগ করছে! ঠিক ১১ বছর আগের মতো তারা আবারও পুরো মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির বিপরীতে গিয়ে কপিরাইট অফিসের ঐতিহাসিক উদ্যোগগুলোকে নানাভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। আমি ওপেন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি, কাইনেটিক যে চোর না তারা সেটার প্রমাণ দিক। আর সেটার প্রমাণ না দিতে পারলে বাংলাদেশের সংগীত ও এর আইন নিয়ে কথা বলার অধিকার কোনও চোর কোম্পানির নেই।’’
এদিকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকবি ও সাংবাদিক কবির বকুল বলেন, ‘গীতিকার-সুরকারদের দীর্ঘদিনের যে চাওয়া-পাওয়া সেটা যখন আলোর মুখ দেখা শুরু করলো তখনই কিছু বাধা আমাদের চোখে পড়ছে। এটা পৃথিবীর নিয়ম, কেউ ভালো কাজ করতে গেলে খারাপ ছায়া এসে পড়ে। কপিরাইট রেজিস্ট্রার এমনই একজন মানুষ, যিনি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে আমাদের বঞ্চিত শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। এটা তো দিবালোকের মতো সত্যি, বর্তমান কপিরাইট অফিসের উদ্যোগ ও আগ্রহের কারণেই আমরা সংগীত সংশ্লিষ্টরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হচ্ছি। যারা আমাদের সৃষ্টি নিয়ে হরিলুট করেছে এতকাল, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস পেয়েছি। আমার ধারণা, সততার জয় নিশ্চিত, ষড়যন্ত্র সাময়িক।’
কবির বকুলকিন্তু সংগীতাঙ্গনের এই বিভেদ বা ষড়যন্ত্র সমাধানের উপায় কী! অসাধুদের দৌরাত্ম্যে ফের থমকে যাবে না তো সংগীতাঙ্গনের চলমান বিপ্লব।
কপিরাইট রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরীর মতে, ‘উত্তরণের উপায় হচ্ছে মিউজিক্যাল বোর্ড গঠন করা। সেটি হলে এই জটিলতা কমবে। কপিরাইট ক্লেম বোর্ড নামে ভারতেও একটা প্রতিষ্ঠান আছে। আমেরিকাতেও একটা আছে। এতদিন মাঠটা খালি ছিল। গীতিকার, সুরকার, শিল্পীদের রিপ্রেজেন্টেশন ছিল না। ফলে রয়্যালটি নিয়ে সরকারের কাছে সঠিকভাবে তথ্য পৌঁছেনি। এখন সেই সুযোগটা তৈরি হলো। মিউজিক বোর্ড গঠন করে সেখানে সব সংগঠনের প্রতিনিধিরা থাকবেন। তবে এরজন্য অবশ্যই সংগঠনগুলোকে আগ্রহী ও একমত হতে হবে। আমি সরকারের একজন ক্ষুদ্র কর্মচারী হিসেবে দাফতরিক সহযোগিতা করতে পারি ফর আ বেটার মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি।’
কিন্তু সেই সহযোগিতা দেওয়া কতটা সম্ভব? কারণ, আপনার ভাষায় অনেকেরই ‘গাত্রদাহ’ হয়েছে কপিরাইট অফিসের নানাবিধ সাম্প্রতিক উদ্যোগে। জবাবে এই কপিরাইট রেজিস্ট্রার বলেন, ‘আমি তো সরকারের একজন কর্মচারী। সংগীতের যে বিশৃঙ্খলা সেটা থেকে উত্তরণের জন্য আমাকে সরকার যদি সহায়ক মনে করে, তাহলে থাকবো। সরিয়ে দিলে চলে যাবো। আমি এখন যা করছি, সেটা সরকারের আদেশ মেনেই করছি। হ্যাঁ এটা ঠিক, এই কাজটি বুঝতে আমাকে তিনটা বছর গবেষণা করতে হয়েছে। এখন আমি বুঝি কোনটা সাদা কোনটা কালো। এখন আমার স্থানে নতুন কেউ এলে উনাকেও তিন বছর গবেষণা করতে হবে। এভাবেই তো বিষয়গুলো চাপা পড়ে যায়।’
প্রিন্স মাহমুদ। ছবি: সাজ্জাদ হোসেনএদিকে সাম্প্রতিক সময়ে সংগীতের মানুষগুলো সংঘবদ্ধ হওয়ার বিষয়টিকে ‘অসাধু হটাও’ আন্দোলন হিসেবে দেখছেন দেশের অন্যতম গীতিকবি ও সুরস্রষ্টা প্রিন্স মাহমুদ। তিনি চান কপিরাইট অফিসের সহযোগিতা নিয়ে এই সংগঠনগুলো সংগীতের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু করে যাক। তার ভাষ্যে, ‘বিশ্বাস করি একজন শিল্পী হিসাবে আমি যে সংগঠনে থাকি, সেটিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করবো না। সেটা যদি করি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রতারক হিসাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবো। আমি আগামীকাল থাকবো না, তবে আমার বাচ্চারা থাকবে। তাদের সম্পর্কেও আমার চিন্তা করা দরকার। যদি আমি অন্যায় করি, অবশ্যই আমার বাচ্চারা সেই পরিণতি ভোগ করবে। টাকাই সবকিছু না। আমাদের সময় এসেছে ইন্ডাস্ট্রি তথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু করার।’
জানা গেছে, গীতিকবি, সুরস্রষ্টা ও কণ্ঠশিল্পীদের তিন সংগঠন এক হয়ে শিগগিরই যৌথ বিবৃতি ও দাবিনামা পেশ করবে কপিরাইট অফিসসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সুরাহা হবে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির অনিয়ম আর বৈরী পরিবেশের।

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ
X