বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম থেকে প্রয়াণের প্রতিটি বাঁক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গান, কবিতা আর কথামালায়। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো জমিদার কবির জীবনের প্রেম-বিরহের পাশাপাশি দুঃখ-কষ্টের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে এই আয়োজনে।
বৃহস্পতিবার (১১ মে) সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর ঢাকা গ্যালারিতে রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমী এই আসরের। যার নাম দেওয়া হয় ‘নায়ক রবি’। ডেলভিস্তা ফাউন্ডেশনের সন্নত নিবেদন, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত এই গীতি আলেখ্য অনুষ্ঠানে মুগ্ধতা ছড়িয়েছে রবীন্দ্র অনুরাগীদের মনে।
অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী মুস্তাফা খালীদ পলাশ, শাহজিয়া ইসলাম অন্তন ও রেজাউর রহমান। পাঠে ছিলেন প্রথিতযশা আবৃত্তিকার শিমুল মুস্তাফা ও শারমিন মুস্তাফা।
কবির শৈশব, কৈশোরের পরে গোপন প্রেম, ভালোবাসার মেয়ের বর্ণনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা থেকেই দেওয়া হয়। সন্তানসহ নিকটাত্মীয়দের একের পর মৃত্যুর করুণ বিবরণ আর সকরুণ সুরে বেদনাবিধুর আবহ সৃষ্টি হয় আসরে।
বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে সুর আর কথামালা মিলেমিশে একাকার হয় অনুষ্ঠানে। প্রথিতযশা শিল্পী ও আবৃত্তিকারের কণ্ঠে দারুণ এই পরিবেশনায় মুগ্ধ হতে দেখা যায় দর্শক-শ্রোতাদের। একই সঙ্গে বিশ্বকবির যাপিত জীবনের বর্ণিল দুঃখ-কষ্টের প্রতিটি মুহূর্ত ছুঁয়ে যায় দর্শক-শ্রোতার হৃদয়।
এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় এর সঙ্গে যুক্ত সংগীতশিল্পী শাহজিয়া ইসলাম অন্তনের কাছে। তিনি বলেন, “জমিদার পরিবারে জন্ম নেওয়া কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের 'অসুখের' দিকটি সেভাবে সামনে আসছে না। এই আয়োজনে সেই বিষয়গুলো আমরা কবির অনুরাগীদের সামনে ফুটিয়ে তুলেছি।”
বিশ্বকবির ‘হে নূতন দেখা দিক’ গান দিয়ে শুরু হয় আসর। এরপর একে একে পরিবেশিত হয় ‘আমার সকল নিয়ে’, ‘শ্রাবণের ধারার মতো’, ‘বাজিল কাহারও বীণা’, ‘বড় বেদনার মতো বেজেছ তুমি’, ‘এই করেছ ভালো নিঠুর হে’, ‘সুখে আমায় রাখবে কেন’, ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’, ‘চির সখা হে’, ‘তোমারে জানিনে হে’, ‘জীবন মরণের সীমানা’, ‘খেলাঘর বাঁধতে’ ও ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে’।
প্রতিটি গানের ফাঁকে ফাঁকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের নানা বাঁকে বাঁকে থাকা অসুখ তুলে ধরা হয়। সঙ্গে পরতে পরতে কবির লেখা থেকে প্রাসঙ্গিক উক্তি উদ্ধৃতি ভিন্নমাত্রা যুক্ত করে আয়োজনে।
গান, কবিতা ও আবৃত্তিতে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বকবি হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সাধারণত আড়ালে থাকা বিষয়গুলো সামনে আনা হয়। এরমধ্যে কবির অর্থকষ্ট, ব্যক্তিগত জীবনের নিঃসঙ্গতা, সাহিত্য থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা এবং অসুস্থতাসহ বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
অনুষ্ঠান শেষে শিল্পী মুস্তাফা খালীদ পলাশ বলছিলেন, “বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুঃখ-কষ্টের আলেখ্য’ আজকের এই ‘নায়ক রবি’। আমরা রবীন্দ্র অনুরাগীদের ভিন্ন কিছু দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এই ইতিহাস সবার জানা উচিত।”
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬২তম জন্মবার্ষিকী ছিল গত সোমবার (৮ মে)। ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের ৮ মে এবং ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ কলকাতার জোড়াসাঁকোর এক ধনাঢ্য ও সংস্কৃতিবান পিরালি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কালজয়ী এই কবি। দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৪১ সালে নিজ বাসভবনেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। তাকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়।
ছবি: মাহফুজ সাদি









