ইরাকে গত একমাসে নানা ধরনের সহিংসতায় অন্তত ৮৬৭ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন কমপক্ষে এক হাজার ৪৫৯ জন। নিহতদের মধ্যে ৪৬৮ জন বেসামরিক নাগরিক। বাকি ৩৯৯ জন ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। বুধবার ইরাকে জাতিসংঘের সহযোগী মিশন (ইউএনএএমআই) হতাহতের এ সংখ্যা জানিয়েছে।
বড় ধরনের সেনা অভিযানের মুখে সুন্নিপন্থী সশস্ত্র সংগঠন আইএস তাদের হামলা জোরদার করার কারণে এক মাসে এত বেশি সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নিহত বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে শুধু রাজধানী বাগদাদে প্রাণ গেছে ২৬৭ জনের। এছাড়া, উত্তরাঞ্চলীয় নেইনাভা প্রদশে ৫৬ জন এবং পূর্বাঞ্চলীয় দিয়ালা প্রদেশে ৪৯ জন নিহত হয়েছে।
ইরাক বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জন কুবিস মে মাসের সহিংসতায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, সহিংসতার হাত থেকে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করার জন্য ইরাক সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
গত মাসে আইএস বাগদাদে দু’টি ভয়াবহ বোমা হামলা চালায়। ১১ মে বাগদাদের শিয়া অধ্যুষিত একটি এলাকায় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন প্রায় ১০০ জন। আহত হন কমপক্ষে ১৭০ জন। এর এক সপ্তাহ পর ১৭ মে বাগদাদে একই ধরনের আরেকটি হামলায় ১৬২ ব্যক্তি হতাহত হন।
এদিকে সম্প্রতি আইএসের কাছ থেকে ইরাকের আনবার প্রদেশের ফালুজা শহরের পুনর্নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে অন্তত ১৩০ জন ইরাকি সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা খবরটি নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, ফালুজা পুনর্দখল অভিযানের ৭ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও শহরের কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে রয়েছে ইরাকি বাহিনী।
আল জাজিজার খবরে বলা হয়েছে, বুধবার আইএসের ১০ আত্মঘাতী জঙ্গি কুবাইশা শহরে প্রথম হামলাটি চালায়। শহরের কাছাকাছি আল সেজার নামের এক গ্রামে তাণ্ডব চালায় তারা। এরপর তারা দক্ষিণ ফালুজায় একটি সেনাবহরে হামলা করে। ইরাকের সামরিক সূত্র আল জাজিরাকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আল জাজিরা জানিয়েছে, এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই অভিযানে রয়েছেন ইরাকের সেনাবাহিনী ও শিয়া ইউনিট। এছাড়াও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা। তারপরও শহরের কেন্দ্রের কাছাকাছিও আসতে পারেনি তারা।
ফালুজা অভিযানের সার্বিক দায়িত্বে নিয়োজিত কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দেলওহাব আল সাদি। তিনি আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার গতি কমিয়েছে ইরাকি বাহিনী। তারা এখনও ফালুজার প্রত্যন্ত অঞ্চলেই আছেন। তারপরও ‘আমরা নাইমিহা জেলায় আছি এবং এখান থেকে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ফালুজার দিকে এগিয়ে যেতেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরা।’
এদিকে ইরাকি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, জীবন বাঁচাতে ফালুজার বাসিন্দাদের মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে আইএস। যা ইরাকি বাহিনীর অভিযানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবাদি মনে করেন, যদি বেমাসরিক মানুষের জীবন নিয়ে না ভাবা হতো, তাহলে এই অভিযান এতো কঠিন হতো না। এক টেলিভিশন ভাষণে তিনি জানিয়েছেন, বেসামরিক মানুষের জীবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তারা।
মে মাসের ২২-২৩ তারিখে শুরু হওয়া এই অভিযানে এ পর্যন্ত বহু আইএস সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করছেন ইরাকি কমান্ডাররা। তবে তাদের নিজেদের কতোজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন, তা নিয়ে মুখ খুলতে রাজি নন তারা। নিরাপত্তাসূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি কেবল শিয়া-অধ্যূষিত নাফাজ শহরেই ৭০ জনের প্রাণহানির খবর দিয়েছে। এদিকে বার্সা অঞ্চলের কর্মকর্তারা ২৬ শিয়া যোদ্ধার প্রাণহানির খবর জানিয়েছেন। সবমিলে বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৩০ ইরাকি সেনার প্রাণাহানির খবর দিয়েছে আল জাজিরা। এদিকে নিজস্ব সূত্রের বরাতে প্রায় একশ জনের আহত হওয়ারও খবর দিয়েছে এপি।
ফালুজা পুনর্নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ের বিপরীতেই বেসামরিক মানুষের জীবনে নেমে আসা মানবিক বিপর্যয়। মৃত্যু কিংবা ঘরহারা জীবনের বাস্তবতা। আইএস তাদের কাউকে কাউকে মানববর্ম বানাচ্ছে। খাবার আর পানির অভাবে রয়েছেন শহরের ৫০ হাজার মানুষ।
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ফালুজায় কোনও ত্রাণ পৌঁছায়নি। অপরিচ্ছন্ন পানি, লতাপাতা এসব খেয়ে বাঁচার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সেখানকার মানুষেরা। সূত্র: আল জাজিরা, সিনহুয়া, প্রেস টিভি।
/এমপি/








