জিকার প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই ব্রাজিলে অলিম্পিক গেমস আয়োজনে অনড় ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা- ডব্লিউএইচও। এমনকি জিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন ১৫১ জন বিজ্ঞানী ব্রাজিলে অলিম্পিক স্থগিত অথবা তা অন্যকোথাও সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও এতোদিন তা আমলে নেয়নি তারা। তবে এবার অবস্থান বদলে ফেলেছে সংস্থাটি। জিকার প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ব্রাজিলে অলিম্পিক গেমসের আয়োজন করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে কিনা, অবশেষে তা খতিয়ে দেখার ঘোষণা দিয়েছে তারা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, প্রতি তিন মাস পর পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি কমিটি বৈঠক করে থাকে। সে অনুযায়ী জুনে আরেকটি বৈঠক হওয়ার কথা হয়েছে। এই মাসের সেই বৈঠকেই ব্রাজিলে অলিম্পিক আয়োজনের ক্ষেত্রে জিকা ভাইরাসের সম্ভাব্য ঝুঁকি পর্যালোচনা করবে ডব্লিউএইচও। পর্যালোচনার পর এ সংক্রান্ত তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণাও দিয়েছে তারা। তবে জুনের ওই বৈঠকে ব্রাজিল অলিম্পিক যদি সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে প্রমাণিত হয়, তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা জানা যায়নি।
ব্রাজিলে আয়োজিত হতে যাওয়া অলিম্পিকের কারণে মশাবাহিত ভাইরাসটি আরও ছড়িয়ে পড়বে কিনা, সম্প্রতি তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান মার্কিন সিনেটর জিন শাহিন। এর পরপরই জিকার ঝুঁকি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘গত ৮ মার্চ জরুরি কমিটির শেষ বৈঠকটি হয়েছিল। জুনে আরেকটি বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বৈঠকে জিকা আক্রান্ত দেশগুলোর বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হবে। ভাইরাসের ধরন কেমন, ভাইরাসটির উপস্থিতির হার, সংশ্লিষ্ট দেশের ভাইরাস মোকাবিলার সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশে মানুষের ভ্রমণের ধরনসহ বিভিন্ন তথ্য নিয়ে আলোচনা করা হবে। অলিম্পিক গেমসসহ ব্রাজিলের পরিস্থিতিও বিবেচনা করবে কমিটি।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও জানিয়েছে, পর্যালোচনার পর তৈরি করা প্রতিবেদনটি সবার জন্য প্রকাশ করা হবে।
এর আগে মার্কিন সিনেটর শাহিন বলেন, ‘বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ অলিম্পিক গেমসে অংশ নেন। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত কোনও প্রভাব রয়েছে কিনা তা জানাটা আমাদের জন্য জরুরি।’
অবশ্য অলিম্পিক গেমসে জিকার ঝুঁকি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যালোচনার আগেই বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় এবারের অলিম্পিক বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন-সাবেক গলফ মাস্টার এবং ইউএস পিজিএ চ্যাম্পিয়ন বিজয় সিং ও অস্ট্রেলিয়ার গলফার মার্ক লিশম্যান। আমেরিকান সাইক্লিস্ট তেজায় ভান গার্ডেরেনও জানিয়েছেন তার স্ত্রী সন্তান সম্ভববা হওয়ায় তিনি অলিম্পিকে অংশ নেবেন না। কেননা, জিকা ভাইরাসের কারণে যে অস্বাভাবিক আকৃতির মাথা নিয়ে শিশুর জন্ম হতে পারে তা এরইমধ্যে প্রমাণিত।
গত মাসের শেষের দিকে জিকা সংক্রমণের আশঙ্কায় ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো অলিম্পিক স্থগিত অথবা অন্যস্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ১৫০ জন বিজ্ঞানীর দাবি প্রত্যাখ্যান করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। বিজ্ঞানীরা এক খোলা চিঠিতে সংস্থাটিকে তাদের আশঙ্কার কথা জানালেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। ডব্লিউএইচও-কে লেখা খোলা চিঠিতে বিজ্ঞানীরা বলেন, জিকা সংক্রমণ রোধে তেমন কোনও অগ্রগতি দেখা যায়নি। এই অবস্থায় অলিম্পিক আয়োজন করাকে তারা ‘অনৈতিক’ বলে উল্লেখ করেন। বিজ্ঞানীরা জিকা সংক্রমণ রোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে কার্যকর ভূমিকা রাখারও অনুরোধ জানান। জিকা থেকে রক্ষায় করণীয় হিসেবে ডব্লিউএইচও-এর নির্দেশিকায় পরিবর্তন আনতে হবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
সে সময় ওই চিঠি প্রত্যাখ্যান করে ডব্লিউএইচও-এর পক্ষ থেকে বলা হয়, অলিম্পিক বন্ধ করে দিলে বা তা অন্যত্র সরিয়ে নিলেও জিকা প্রতিরোধে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ রাখা হবে না। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির পক্ষ থেকেও বলা হয়, মশাজনিত একটি রোগের জন্য অলিম্পিক আয়োজন স্থগিত করার কোনও যৌক্তিকতা নেই। চলতি বছরের ৫ আগস্ট থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। উল্লেখ্য, এডিস প্রজাতির মশা থেকে জিকা ভাইরাস মানুষের দেহে ছড়িয়ে থাকে। জ্বর, জয়েন্ট পেইনসহ ছোটখাটো কিছু শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয় এ ভাইরাসের কারণে। আবার তা এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে সেরেও যায়। তবে বিপত্তি তৈরি হয় গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে। গর্ভাবস্থায় জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মাইক্রোসেফালি তথা বিকৃত ও ছোট মাথা নিয়ে জন্ম নিতে পারে শিশু। এসব শিশুর বুদ্ধিমত্তার ঘাটতি থাকে, শারীরিক বৃদ্ধি কম হয় এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।সূত্র: বিবিসি
/এফইউ/বিএ/








