ক্যাসিয়াস ক্লে থেকে হয়ে উঠেছিলেন মোহাম্মদ আলী। অনেকের কাছে সর্বকালের সেরা হিসেবে বিবেচিত এই মুষ্টিযোদ্ধা তিন বারের ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন এবং অলিম্পিক লাইট-হেভিওয়েট স্বর্ণপদক বিজয়ী ছিলেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে বক্সি-এর জগতে পা রাখা এ মুষ্টিযোদ্ধা জিতে নেন কোটি ভক্তের মন। আর এবার সে কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। ক্যামেরার সীমাবদ্ধ ফ্রেমে বিভিন্ন সময় ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে কিংবদন্তী এই মুষ্টিযোদ্ধার জীবনের মুহূর্তগুলো। কে না জানে, ক্যামেরার ফ্রেমে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবতা ধরা পড়ে না। সীমাবদ্ধ ফ্রেম খণ্ডিত বাস্তবতা নির্মাণ করে। তারপরও মোহাম্মদ আলীর বেশকিছু ছবি বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো। খণ্ডিত মুহূর্তগুলোকে কল্পনায় একত্রিত করে যদি তার পূর্ণাঙ্গ জীবনের কোনও দিশা পান পাঠক, সেই আশায়।
১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির লুইসভিলায় জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ আলী। বাবা ক্যাসিয়াস মারকেলাস ক্লে সিনিয়র এর নাম অনুসারে একই নাম রাখা হয়েছিল তার। মাত্র ১২ বছর বয়সে বক্সিং খেলায় নাম লেখান তিনি। ১৯৬০ সালে রোমে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে লাইট-হেভিওয়েট স্বর্ণপদক জিতে নেন আলী।
১৯৬০ সালের অক্টোবরে ১৮ বছর বয়সে পেশাদার বক্সার হয়ে ওঠেন মোহাম্মদ আলী। ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ঘরোয়া বক্সিংয়ে ১৮টি লড়াইয়ে অংশ নেন তিনি। বিদেশের মাটিতে প্রথম পারিশ্রমিক নিয়ে খেলতে যান ১৯৬৩ সালে লন্ডনে। সেখানে ব্রিটিশ চ্যাম্পিয়ন হেনরি কুপারকে পরাজিত করেন আলী।
১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রথমবারের মতো মোহাম্মদ আলীর ছবি প্রকাশিত হয়। সাড়া জাগানো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এবং মার্কিন বক্সার সনি লিস্টনের সঙ্গে আলীর মুষ্টিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার খবর বেশ আলোচিত হয়। লিস্টন ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন, ‘আমি মনে করছি, ছেলেটিকে আমি খুব খারাপভাবে আঘাত করতে পারব।’
অনেক বক্সিং বিশেষজ্ঞেরই ধারণা ছিল মোহাম্মদ আলী লিস্টনের সামনে দাঁড়াতেই পারবেন না। কিন্তু তাদের সে ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে চমক তৈরি করেন আলী। তার পারদর্শীতা আর শক্তিমত্তার কাছে হার মেনে ষষ্ঠ রাউন্ডের আগেই বিদায় নেন লিস্টন। আর ২২ বছর বয়সী আলী জিতে নেন ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট টাইটেল।
আলী ১৯৬৪ সালে ইসলামী সংগঠন নেশন অব ইসলাম এ যুক্ত হন। পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তিনি এবং ক্যাসিয়াস ক্লে নাম পরিবর্তন করে হয়ে ওঠেন মোহাম্মদ আলী।
লিস্টনের সঙ্গে আরও একটি ম্যাচে জয় পান মোহাম্মদ আলী। এবার আর ষষ্ঠ রাউন্ড পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। প্রথম রাউন্ডের প্রথম ম্যাচেই কুপোকাত হন লিস্টন। অনেকেই ভাবতেন ম্যাচটি পাতানো ছিল। তবে সে আশঙ্কা নাকচ করে দেন আলী।
১৯৬৫ সালের নভেম্বরে সাবেক চ্যাম্পিয়ন ফ্লয়েড প্যাটারসনকে পরাজিত করেন মোহাম্মদ আলী।
১৯৬৬ সালের মে মাসে হেনরি কুপারের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো মুষ্টিযুদ্ধে অংশ নিতে লন্ডন যান আলী। আগেরবার ব্রিটিশ বক্সিংয়ের ভক্তরা আলীকে পাত্তা না দিলেও এবার তার প্রতিটি পদক্ষেপের দিকেই দৃষ্টি ছিল তাদের।
বাম চোখে আঘাতের পর ষষ্ঠ রাউন্ডে কুপারকে থামিয়ে দেন আলী। ২০১১ সালে কুপারের মৃত্যুর পর আলী বলেছিলেন, ‘আমি আমার পুরনো বন্ধুর শূন্যতা অনুভব করব। তিনি একজন বড় লড়াকু এবং ভদ্র মানুষ ছিলেন।’
মোহাম্মদ আলী প্রথমবারের মতো পরাজিত হন ১৯৭১ সালে। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জো ফ্রেজিয়ারের কাছে পরাজিত হন তিনি।
পরবর্তী ম্যাচে অবশ্য ফ্রেজিয়ারের বিরুদ্ধে জয় পান মোহাম্মদ আলী। তবে অনেকের মতে সত্যিকার অর্থে মোহাম্মদ আলীর সুদিন ফিরেছিল ১৯৭৪ সালে। ‘রাম্বল ইন দ্য জঙ্গল’-এ জর্জ ফোরম্যানের সঙ্গে আট রাউন্ড পর্যন্ত দড়িতেই ঘেঁষে থেকে লড়াই চালিয়েছেন তিনি। এ কৌশলকে আলী ‘রোপ-অ্যা-ডোপ’ নামে ডাকতেন।
তবে অষ্টম রাউন্ড পার হওয়ার পর দড়ি থেকে সরে এসে ফোরম্যানকে মেঝেতে ফেলে দেন আলী। আর এর মধ্য দিয়ে ৩২ বছর বয়সে দ্বিতীয়বারের মতো জিতে নেন ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট টাইটেল।
১৯৭৮ সালে স্পিনকের সঙ্গে লড়াইয়ে টাইটেল হারান আলী। অবশ্য একই বছর আবারও স্পিনকের কাছ থেকে টাইটেল ফিরিয়ে আনেন। ৯ মাস পর অবসরের ঘোষণা দেন আলী। কিন্তু ১৯৮০ সালে নতুন চ্যাম্পিয়ন ল্যারি হোমসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আবারও ফেরত আসেন আলী। হোমসের কাছে হেরে যাওয়ার পর ট্রেভর বেরবিকের কাছেও হারেন তিনি। তবে তার বিদায়ে হেভিওয়েট বক্সিং-এ যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল তা পরবর্তীতে ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি মাইক টাইসন পূরণ করেন।
১৯৮৪ সালে আলী পারকিনসন্সে আক্রান্ত হন। তবে সাহসিকতার সঙ্গেই রোগটিকে মোকাবিলা করতে থাকেন এ মুষ্টিযোদ্ধা। ১৯৯৬ সালে আটলান্টায় অলিম্পিকের শিখা প্রজ্বলন করতে দেখা যায়।
আটলান্টায় আলীকে ১৯৬০ সালে পাওয়া অলিম্পিক মেডেল আবারও প্রদান করা হয়। আলীর দাবি, একটি শ্বেতাঙ্গ নিয়ন্ত্রিত রেস্টুরেন্টে তাকে সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর মূল মেডেলটি তিনি ওহিও’র নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন। তবে তার এ দাবি নিয়ে নানা মত রয়েছে।
১৯৯৯ সালে বিবিসির ভিউয়াররা আলীকে শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ভোট দেন
আলীর মেয়ে লায়লাও ১৫ বছর বয়সে বক্সিং-এ নাম লেখান এবং ১৯৯ সালে পেশাদার বক্সার হিসেবে আবির্ভূত হন। ২০০১ সালে জো ফ্রেজিয়ারের মেয়ে জ্যাকি ফ্রেজিয়ারকে হারান লায়লা।
২০০১ সালে আলীর জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। হলিউড অভিনেতা উইল স্মিথ সেখানে অভিনয় করেন।
২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আবারও দেখা মেলে আলীর।
সূত্র: বিবিসি, উইকিপিডিয়া
/এফইউ/বিএ/








