বিশ্বসেরা মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর নামে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ওয়েস্ট থার্টি থার্ড স্ট্রিটকে অস্থায়ীভাবে 'মোহাম্মদ আলী ওয়ে' হিসেবে ঘোষণা দেন নিউ ইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাসিও। তার ভাষায়, এটি মোহাম্মদ আলীর জন্য নিউ ইয়র্কের জনগণের শ্রদ্ধার নিদর্শন।
১৯৮১ সালে পেশাদার বক্সিং থেকে অবসর নেওয়ার আগে ৬১টি লড়াইয়ের মধ্যে ৫৬টিতে জেতেন আলী। এর মধ্যে ৩৭টি লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে নকআউট করেছেন তিনি। নিজে একবারও নক আউট হননি। মেডিসন স্কয়ারে মোট আটটি লড়াইয়ে অংশ নেন মোহাম্মদ আলী। এর কোনোটিতেই হারেননি তিনি। নিউ ইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাসিও বলেন, আলী এখানে কখনও পরাজিত হননি।
নিউ ইয়র্কের মেয়র বলেন,‘শহরের বাসিন্দাদের হৃদয় থেকে আমরা আজ এই বিশাল মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। ইতিহাসে তার যে অবদান তাতে এই নামকরণ কিছুই না। আমাদের কাছে তার আরো বেশি কিছু প্রাপ্য।’
নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিল মেয়রের এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে সর্বসম্মতভাবে সমর্থন দিলে এবং মেয়র এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে স্বাক্ষর করার পরই এই নামকরণ দাফতরিক স্বীকৃতি লাভ করবে।
৩ জুন ২০১৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার ফিনিক্সের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৭৪ বছর।
মোহাম্মদ আলী চলে যাবার পর পুরো দুনিয়া যেন নতুন করে বুঝতে পেরেছে যে, তিনি ছিলেন ‘দ্য গ্রেটেস্ট'। তবে তার অভাব যারা সবচেয়ে বেশি করে অনুভব করছেন ও করবেন তারা হলেন যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমরা।
দুনিয়ার সেরা বক্সার! নিঃসন্দেহে। কিনশাসার ‘রাম্বল ইন দ্য জাঙ্গল'-এ আলীর প্রতিদ্বন্দ্বী জর্জ ফোরম্যান বলেছেন, তার নিজের একটা অংশ যেন চলে গেছে। পরবর্তী যুগের সবচেয়ে ভীতিকর হেভিওয়েট বক্সার মাইক টাইসন বলেছেন, ঈশ্বর তার চ্যাম্পিয়নকে নিজের কাছে নিয়ে গেছেন।
বক্সিং সম্পর্কে যাদের সামান্যতম ধারণা আছে, তারা জানেন, আলীর মতো ফুটওয়ার্ক ও যুগপৎ পাঞ্চ খুব কম বক্সারেরই থাকে। তার বক্সিং স্টাইলের সেরা বর্ণনা পাওয়া যাবে তারই ভাষায়: ‘ফ্লোট লাইক এ বাটারফ্লাই, স্টিং লাইক এ বি', প্রজাপতির মতো ওড়ো, ভীমরুলের মতো কামড়াও।
সারা দুনিয়া থেকে আসছে যতোটা ভালোবাসা, ঠিক ততোটাই শ্রদ্ধা ও সম্মানের অর্ঘ। তবে বাস্তবিকভাবে শোকগ্রস্ত এবং উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমরা। কেননা মোহাম্মদ আলী ছিলেন তাদের গ্রেটেস্ট হিরো। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে ইসলাম সম্পর্কে ধারণা ও সহানুভূতি; উভয়ই সীমিত, সেখানে মোহাম্মদ আলী ছিলেন ইসলামের গুডউইল অ্যাম্বাসেডর। কাজেই তার মৃত্যুর পরদিন লুইভিলের ইসলামিক সেন্টারে একজন বক্তা প্রশ্ন তোলেন, কে এখন ইসলামবিদ্বেষের দানবদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে? মুসলিমদের অন্যায় অপবাদ ও সন্দেহের হাত থেকে বাঁচাবে? শুধু মার্কিনি নয়, বিশ্বের বহু মানুষের কাছে আলী ছিলেন ‘বাস্তবিক ইসলামের' প্রতিভূ ও প্রতিনিধি।
মার্কিন মুলুকে সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, যে নির্বাচনে সম্ভাব্য রিপাবলিকান প্রার্থী হবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি গত ডিসেম্বরে প্রস্তাব দেন যে, মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে আগমন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হোক; যিনি গত রবিবারও ইঙ্গিত করেছেন যে, তার প্রতি এক মুসলিম বিচারকের মনোভাব বিদ্বেষপূর্ণ হতে পারে।
সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন অবশ্য মোহাম্মদ আলীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। হিলারির ভাষায়, ‘এমন একটি দিনে যখন আমরা মোহাম্মদ আলীর জন্য শোক করছি, সেদিন এ কথা মনে রাখা যেতে পারে যে, আমরা এমন একটি দেশে বাস করি, যেখানে মানুষ প্রতিবন্ধক দূর করতে পারে, নিজেদের ঈশ্বরের আরাধনা করতে পারে, নিজের নাম বেছে নিতে পারে; যেখানে তারা নেতৃত্ব দিতে পারে; স্বকীয় পরিশ্রম ও প্রতিভা যতদূর নিয়ে যায়, ততদূর অবধি নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করতে পারে।’ আগামী শুক্রবার ইসলামি রীতিতে মোহাম্মদ আলীকে সমাহিত করা হবে। মোহাম্মদ আলীর জীবন ও কর্মের ওপর আলোকপাত করবেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনসহ মুসলিম নেতারা। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান, জর্ডানের রাজা আবদুল্লাহসহ মুসলিম নেতারা তার জানাজায় অংশ নেবেন।
মোহাম্মদ আলী পরিবারের মুখপাত্র বব গানেল জানিয়েছেন, ওবামা এবং মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী লোনি টেলিফোনে কথা বলেছেন। মোহাম্মদ আলীর মৃত্যুর পর বারাক ওবামা বলেছেন, "আলীকে মানুষ শুধু তার বাকপটুতা বা বক্সিংয়ের জন্যই মনে রাখবে না, তাকে মানুষ মনে রাখবে; কারণ তিনি সবসময় ন্যায়ের জন্য লড়াই করেছেন। তিনি আমাদের জন্য লড়াই করেছেন।" সূত্র: ডি ডব্লিউ, বিবিসি।
/এমপি/








