চিরবিদায়ে কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন বিশ্বখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। যুদ্ধ ও আগ্রাসনবিরোধী, মানবতাবাদী এ বক্সিং কিংবদন্তিকে শেষ বিদায় জানাতে মানুষের ঢল নামে তার জানাজায়। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের শহর লুইসভিলেতে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখো মানুষ। দুনিয়াজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনাম হয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখা গেছে মানবতাবাদী এ মানুষটির জন্য ভক্তদের সমবেদনা। সশরীরের জানাজায় অংশ নিতে না পারলেও অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে গভীর শ্রদ্ধায় কিংবদন্তি এ মানুষটিকে চিরবিদায় জানিয়েছেন দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মোহাম্মদ আলীর কোটি কোটি ভক্ত।
মোহাম্মদ আলীকে বিদায় জানাতে জড়ো হওয়া বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, বক্সার মাইক টাইসন, অভিনেতা উইল স্মিথ, কমেডিয়ান বিলি ক্রিস্টাল, সাংবাদিক ব্রায়ান্ট গামবেল প্রমুখ। এছাড়া তাকে শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে জড়ো হন মুসলিম নেতৃবৃন্দ। তাদের মধ্যে ছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান, জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ, সঙ্গীতশিল্পী ইউসুফ ইসলাম, বার্কলি মুসলিম লিবারেল আর্টস স্কুল ও জয়তুনা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা জায়েদ শাকির, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার মুসলিম স্কলার শারমেন জ্যাকসন প্রমুখ।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (১০ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৮টায়) তার মরদেহ বহন করে মোটর শোভাযাত্রা শুরু হয়। এই মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে মুহাম্মদ আলীর মরদেহ তার শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য এবং শেষ জীবনের স্মৃতিমাখা বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। শোভাযাত্রা শেষে সমাহিত করার উদ্দেশে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে কেভ হিল সমাধিস্থলে।
তার মরদেহবাহী মোটর শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার পর রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে ফুল বর্ষণ করতে থাকেন আগত তার ভক্ত-শুভানুধ্যায়ীরা। ৯০ মিনিট দূরত্বের সড়কের দু’পাশে দেখা মেলে জনতার ভিড়ের। এসময় তাদের মুখে ছিল ‘আলী, আলী’ স্লোগান।
১৯৬১ সালে লুইসভিলের যে জায়গায় আলী লড়াই করেছিলেন সে একই জায়গায় শুক্রবার তার স্মরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে মোহাম্মদ আলীর জানাজায় অংশ নেন ১৪ হাজারের বেশি মানুষ। জানাজা পরিচালনা করেন ঈমাম জাইদ শাকির। তিনি বলেন, ‘আলী চাইতেন তার জানাজা যেন একটি শিক্ষণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকে।’
কিংবদন্তী এ বক্সারের একজন পারিবারিক মুখপাত্র জানান, মৃত্যুর কয়েক বছর আগে নিজের জানাজা ও দাফনের পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন মোহাম্মদ আলী নিজেই। দুইদিনব্যাপী শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের প্রথম দিনটিতে অর্থাৎ বৃহস্পতিবার মুসলিম রীতিতে জানাজা পড়ানো হয়। আর দ্বিতীয় দিনের দাফন অনুষ্ঠানটি বিশ্বজনীন।
মোহাম্মদ আলীর দাফনে সব ধর্মের মানুষের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। কেননা মুসলমান আত্মপরিচয়ের প্রতি আলীর যে অঙ্গীকার ছিল, একই সেই অঙ্গীকার ছিল বিশ্বজনীন পরিচয়ের প্রতিও। নিজেকে বিশ্ব-নাগরিক ভাবতেন তিনি। দাফনেও তাই আলীর বৈশ্বিক পরিচয় এবং মুসলিম আত্মপরিচয়ের সম্মিলন ঘটছে। ইসলামের বিধান অনুযায়ীই সমাহিত হলেও তাতে দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে আসা ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়।
মোহাম্মদ আলীর জানাজার পর তার সম্পর্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। তিনি বলেন, ২২ বছর বয়সে মোহাম্মদ আলী ইসলামে দীক্ষিত হন। তখন থেকেই তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধায় পরিণত হন। একজন মুসলিম ভাই হিসেবে তার জানাজায় অংশ নেওয়া আমার নিজের এবং আমার জাতির পক্ষ থেকে আমার দায়িত্ব ছিল।
শারমেন জ্যাকসন বলেন, “আলী চলে যাওয়ায় আমরা সকলেই বিশ্বস্ত একজন সঙ্গী হারালাম। বিশ্ব হারালো সুন্দর মনের এক মানুষ।”
উল্লেখ্য, ১৯৬৪ সালে আলী ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। এরপরই ক্যাসিয়াস ক্লে নামটি পরিবর্তন করে হয়ে ওঠেন মোহাম্মদ আলী। শুরুতে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলন নেশন অব ইমলাম-এ যোগ দেন এবং পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। একইসঙ্গে একজন বক্সার ও বক্তা হিসেবে বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলিমকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
৩ জুন ২০১৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফিনিক্সের একটি হাসপাতালে ৭৪ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মদ আলী। সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা।
/এমপি/








