ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো শহরে সমকামীদের নাইট ক্লাবে চালানো হামলার ঘটনা কাছে টেনেছে চার্চ আর সমকামীদের। রক্ষণশীল খ্রিস্টান বা চার্চের সঙ্গে সমকামীদের সম্পর্কের জটিল সমীকরণ বেশ পুরনো। কিন্তু ১২ জুনের হামলা যেন সেই পুরনো ক্ষতকে কাটিয়ে উঠার পথে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে।
বর্বরোচিত ওই হামলায় নিহত হন ৫০ জন। হামলার পর অরল্যান্ডোর চার্চের প্রার্থনায় আমন্ত্রণ জানানো হয় এলজিবিটি জনগোষ্ঠীর (লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডার) সদস্যদের। চার্চের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই সেখানে উপস্থিত হন। অংশ নেন প্রার্থনায়।
অরল্যান্ডোর ব্যাপিস্ট চার্চ থেকে বলা হয়, সমকামীদের নাইট ক্লাবে এ হামলা সমাজে একটা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
অন্য অনেক সমকামীদের মতো ওই প্রার্থনায় অংশ নিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এলজিবিটি টাস্ক ফোর্স-এর ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন্স ডিরেক্টর ভিক্টোরিয়া কিরবি ইয়র্ক। তিনি বলেন, আমাদের সম্প্রদায়ের সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে কখনও এ ধরনের ঘটনা (চার্চের প্রার্থনায় অংশগ্রহণ) প্রত্যক্ষ করেননি। একটা চার্চে তারা আসতে পেরেছেন। প্রার্থনায় অংশ নিয়েছেন এবং তাদেরকে তাদের অবস্থান বদলের জন্য বলপ্রয়োগ করা হয়নি। এমন একটা চিত্র তাদের জন্য স্বপ্নের মতো।
ভিক্টোরিয়া কিরবি ইয়র্ক এই অরল্যান্ডো শহরেরই বাসিন্দা। এখানেই তার বেড়ে উঠা। তিনি মনে করেন, স্রষ্টার প্রতি মানুষের বিশ্বাসই হচ্ছে বড় কথা। এখানে কেউ সাদা-কালো, ল্যাটিন, এশিয়ান বা আদিবাসী হওয়া বড় বিষয় নয়। কেউ লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল বা ট্রান্সজেন্ডার কিনা সেটার কথা এখানে (বাইবেল) বলা হয়নি। বলা হয়েছে, যেই হোক; এরপর ফুল স্টপ।
শহরের মেয়র বাডি ডায়ার বলেন, আমাদের সবার একটাই প্রশ্ন। কেন এটা ঘটলো? কেন এটা আমাদের শহরেই ঘটলো? কিভাবে এখানে এটা হতে পারে? এ সময়ে এগুলোই কঠিন প্রশ্ন। সুনির্দিষ্টভাবে এসব প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। কিন্তু আমি একটা বিষয় জানি। সেটা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে এর মধ্যে দিয়ে আমরা আরও শক্তিশালী হবো। ধর্ম আমাদের দেখিয়েছে অন্ধকারের মধ্যেও আলো রয়েছে।
৬৬ বছরের চার্চ মিনিস্টার টেরি রাবার্ন বলেন, এলজিবিটি সম্প্রদায়ের সঙ্গে চার্চের সম্পর্কের একটা উন্নতি হয়েছে। আমি এটা বলছি না যে, সবাই এর সঙ্গে যুক্ত। তবে আমি এটা বলতে পারি, প্রতিটি সম্প্রদায়ের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেকেই এখানে আছেন।
১২ জুন রাত দুইটার দিকে ওমর মতিন নামের এক হামলাকারী ‘পালস’ নামের ক্লাবটিতে ঢুকে পড়েন। তার কাছে ছিল একটি রাইফেলসহ তিনটি অস্ত্র। অস্ত্রের মুখে তিনি সবাইকে জিম্মি করে ফেলেন। ঘণ্টা তিনেক পরে সেখানে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় গুলিতে হামলাকারী নিহত হন।
কর্মকর্তারা জানান, হামলাকারী ওমর মতিন আফগান বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। ২০১৩ সাল থেকে তার ওপর নজর রাখছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বন্দুকধারীর হামলায় এত বেশি মানুষ হতাহতের ঘটনা এর আগে ঘটেনি। এ ঘটনার পর অরল্যান্ডো শহরে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
মার্কিন পুলিশ বলছে, কি কারণে হামলা তা জানা যায়নি। ওমরের বাবা বলেছেন, এ হামলার সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। নৈশ ক্লাবের এ হামলাকে ‘স্পষ্টতই সন্ত্রাসী হামলা’ বলে অভিহিত করেছেন ফ্লোরিডার গভর্নর রিক স্কট। এক সংবাদ সম্মেলনে রিক বলেন, এ হামলা ‘স্পষ্টতই সন্ত্রাসী হামলা।’
শনিবার দিবাগত রাতে অরল্যান্ডোর ওই ক্লাব যখন জমজমাট, তখন ক্লাবে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করেন ওমর। তার হাতে ছিল একটি রাইফেল আর একটি হ্যান্ডগান। আচমকা গুলির শব্দে অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে নৈশ ক্লাব থেকে বেরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালান।
অরল্যান্ডো পুলিশ জানিয়েছে, হামলার তিন ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলাকারী ওমর মাতিনকে হত্যা করেন। তার জন্ম ১৯৮৬ সালে। আফগান বংশোদ্ভূত ২৯ বছর বয়সী ওমরের বাড়ি ফ্লোরিডায় পোর্ট সেন্ট লুইসে। কোনো কোনো গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, ওই নৈশ ক্লাবে তাণ্ডব চালানোর একপর্যায়ে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন ওমর।
ওমর মাতিনের বাবা মীর সিদ্দিক রোববার মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসিকে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন সমকামীদের প্রতি ঘৃণা থেকেই তার ছেলে এ কাজ করেছে। ধর্মের কারণে ওমর এ কাজ করেননি। মীর সিদ্দিক বলেন, ‘এ হামলার সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই।’ তিনি বলেন, তার ছেলে ওমর সম্প্রতি পরিবার নিয়ে মিয়ামি গিয়েছিল। সেখানে সমকামীদের আলিঙ্গন ও চুমু খাওয়া দেখে মানসিকভাবে বেশ আহত হন ওমর। স্ত্রী ও ছোট সন্তানের সামনে এ ঘটনায় ওমর ক্ষুব্ধ হন।
এদিকে এ ঘটনা নিয়ে মার্কিন রাজনীতিকদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিবৃতিকে লজ্জাজনক অভিহিত করে তার পদত্যাগ দাবি করেছেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রেসিডেন্ট ওবামা হোয়াইট হাউস থেকে সরাসরি প্রচারিত এক বিবৃতিতে অরল্যান্ডোর বন্দুক হামলাকে ‘একটি সন্ত্রাসী ও ঘৃণ্য ঘটনা’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনা শুধু অরল্যান্ডোতে নয়, আমেরিকার যেকোনো শহরে ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘটতে পারত। অরল্যান্ডোর নাগরিকদের সঙ্গে আমরা আছি। সব সময়ে তাদের পাশে থাকব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমেরিকান হিসেবে আমাদের পরিচয় ও মূল্যবোধ এ ধরনের কোনো সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় পরিবর্তিত হবে না।’
বন্দুকধারী ওমর মতিনের সহজে আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়ার কথা উল্লেখ করে ওবামা বলেন, ‘যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো সময়ে মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে আমাদের স্কুল, উপাসনালয়, সিনেমা হল বা নাইট ক্লাবে হামলা করতে পারে।’ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘কী ধরনের দেশ আমরা চাই, সে সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে।’
/এমপি/








