ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো শহরে সমকামীদের নাইট ক্লাবে হামলা চালানো ওমর মতিন ছিলেন পশ্চিমা কলুষতার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত। হামলার আগে নিজের ফেসবুকে দেওয়া একাধিক পোস্ট থেকে তার এ মানসিকতার প্রমাণ মেলে। এসব পোস্টে নিরপরাধ নারী ও শিশুদের খুনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন ওমর মতিন। বুধবার ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের কাছে লেখা মার্কিন সিনেটের হোমল্যান্ড কমিটির এক চিঠিতে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ওমর মতিন তার এক ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ওপর হামলা বন্ধ কর।’
সিনেট কমিটির প্রতিবেদনে অনলাইনে ওমর মতিনের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ফেসবুকের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে। এতে ২৯ বছরের ওমর মতিনের সহযোগী আরও পাঁচটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে এফবিআই-এর এজেন্ট রন হোপার বলেছেন, ওমর মতিন কি করেছে এবং কেন করেছে তার একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে আমাদের ওমর মতিনের স্ত্রীর সহায়তা প্রয়োজন।
সর্বশেষ পোস্টে ওমর মতিন লিখেছেন, ‘তোমরা দেখতে পাবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে কিভাবে আঘাত হানবে ইসলামিক স্টেট।’
গত ১২ জুনের বর্বরোচিত ওই হামলায় নিহত হন ৫০ জন। রাত দুইটার দিকে ক্লাব যখন জমজমাট তখন ওমর মতিন ‘পালস’ নামের ক্লাবটিতে ঢুকে পড়েন। তার কাছে ছিল একটি রাইফেলসহ তিনটি অস্ত্র। অস্ত্রের মুখে তিনি সবাইকে জিম্মি করে ফেলেন। ঘণ্টা তিনেক পরে সেখানে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় গুলিতে হামলাকারী নিহত হন।
কর্মকর্তারা জানান, হামলাকারী ওমর মতিন আফগান বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। ২০১৩ সাল থেকে তার ওপর নজর রাখছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বন্দুকধারীর হামলায় এত বেশি মানুষ হতাহতের ঘটনা এর আগে ঘটেনি। এ ঘটনার পর অরল্যান্ডো শহরে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
মার্কিন পুলিশ বলছে, কি কারণে হামলা তা জানা যায়নি। ওমরের বাবা বলেছেন, এ হামলার সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। নৈশ ক্লাবের এ হামলাকে ‘স্পষ্টতই সন্ত্রাসী হামলা’ বলে অভিহিত করেছেন ফ্লোরিডার গভর্নর রিক স্কট। এক সংবাদ সম্মেলনে রিক বলেন, এ হামলা ‘স্পষ্টতই সন্ত্রাসী হামলা।’
অরল্যান্ডো পুলিশ জানিয়েছে, হামলার তিন ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলাকারী ওমর মাতিনকে হত্যা করেন। তার জন্ম ১৯৮৬ সালে। আফগান বংশোদ্ভূত ২৯ বছর বয়সী ওমরের বাড়ি ফ্লোরিডায় পোর্ট সেন্ট লুইসে। কোনো কোনো গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, ওই নৈশ ক্লাবে তাণ্ডব চালানোর একপর্যায়ে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন ওমর।
ওমর মাতিনের বাবা মীর সিদ্দিক রোববার মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসিকে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন সমকামীদের প্রতি ঘৃণা থেকেই তার ছেলে এ কাজ করেছে। ধর্মের কারণে ওমর এ কাজ করেননি। মীর সিদ্দিক বলেন, ‘এ হামলার সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই।’ তিনি বলেন, তার ছেলে ওমর সম্প্রতি পরিবার নিয়ে মিয়ামি গিয়েছিল। সেখানে সমকামীদের আলিঙ্গন ও চুমু খাওয়া দেখে মানসিকভাবে বেশ আহত হন ওমর। স্ত্রী ও ছোট সন্তানের সামনে এ ঘটনায় ওমর ক্ষুব্ধ হন।
এদিকে এ ঘটনা নিয়ে মার্কিন রাজনীতিকদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিবৃতিকে লজ্জাজনক অভিহিত করে তার পদত্যাগ দাবি করেছেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রেসিডেন্ট ওবামা হোয়াইট হাউস থেকে সরাসরি প্রচারিত এক বিবৃতিতে অরল্যান্ডোর বন্দুক হামলাকে ‘একটি সন্ত্রাসী ও ঘৃণ্য ঘটনা’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনা শুধু অরল্যান্ডোতে নয়, আমেরিকার যেকোনো শহরে ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘটতে পারত। অরল্যান্ডোর নাগরিকদের সঙ্গে আমরা আছি। সব সময়ে তাদের পাশে থাকব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমেরিকান হিসেবে আমাদের পরিচয় ও মূল্যবোধ এ ধরনের কোনো সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় পরিবর্তিত হবে না।’
বন্দুকধারী ওমর মতিনের সহজে আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়ার কথা উল্লেখ করে ওবামা বলেন, ‘যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো সময়ে মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে আমাদের স্কুল, উপাসনালয়, সিনেমা হল বা নাইট ক্লাবে হামলা করতে পারে।’ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘কী ধরনের দেশ আমরা চাই, সে সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে।’ সূত্র: বিবিসি, টাইমস অব ইন্ডিয়া।
/এমপি/








