কারা ছিলেন তুরস্কে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার নেপথ্যে?

বিদেশ ডেস্ক
১৭ জুলাই ২০১৬, ১৯:৫৩আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৬, ২০:০১
image

অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় চলছে প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ প্রত্যক্ষ করে আসছে তুরস্ক প্রজাতন্ত্র। এ পর্যন্ত চারটি সফল অভ্যুত্থান হয়েছে দেশটিতে। এর মধ্যে দুটি অভ্যুত্থানে সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ না করে সরকার পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়েছে। সবগুলো অভ্যুত্থানেই ব্যাপক প্রাণহানিসহ ভয়াবহ পরিণতি হয়েছে। তবে শুক্রবার (১৫ জুলাই) রাতে যা হয়েছে তা নানা কারণে নজিরবিহীন। তুরস্কে এ মুহূর্তে এ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা কি প্রত্যাশিত ছিল? নাকি একেবারেই তা অপ্রত্যাশিত ছিল? এ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার নেপথ্যেই বা কে? তুরস্কের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে সেইসব প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তায়িব এরদোয়ানের অনুদার নীতির কারণে সামরিক বাহিনীর মধ্যম-সারির কর্মকর্তাদের মাঝে অসন্তোষ ছিল। কিন্তু অনেকের মতেই সে অসন্তোষের পরও অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে।  তাহলে কারা অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল? বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়, অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা সম্পর্কে নানাজন নানা তত্ত্ব দিচ্ছেন। কেউ এরদোয়ানকে দায়ী করছেন, কেউ গুলেনবাদীদের দায়ী করছেন আবার কেউ কামালবাদীদের দায়ী করছেন।  কিন্তু সত্যিকার অর্থেই কারা দায়ী তা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।

একেপি ও সামরিক বাহিনীর বিরোধ শুরু যেভাবে

২০০৭ সালে আবদুল্লাহ গুলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার ক্ষেত্রে তুরস্কের তখনকার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল ইয়াসার বুয়ুকানিত বিরোধিতা করেছিলেন। আবদুল্লাহ গুল ছিলেন একেপি’র প্রতিষ্ঠাতা। তাছাড়া এরদোয়ানের দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা ছিলেন তিনি। সে সময় আবদুল্লাহ গুলকে প্রেসিডেন্ট করার ক্ষেত্রে বুয়ুকানিতের আপত্তি নাকচ করে দিয়েছিল একেপি এবং পার্লামেন্ট। তবে সরকারের কার্যাবলীতে জেনারেল বুয়ুকানিতের হস্তক্ষেপের চেষ্টার মধ্য দিয়ে একেপি ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিরোধ জোরালো হয়ে উঠে। আর তাতে একেপির সমর্থন বেড়ে যায়।

বুয়ুকানিতের হস্তক্ষেপের এক মাস পর এরজেনেকনের বিরুদ্ধে উচ্চ পর্যায়ের অপরাধের তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগপত্রে এরজেনেকনকে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের নিয়ে গঠিত সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। সংগঠনটির সদস্যদের বিরুদ্ধে সরকার উৎখাতের জন্য বোমা হামলা ও হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্তদের একজন হলেন সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল ইলকার বাসবাগ।

২০১০ সালে স্লেজহ্যামার নামে আরেকটি মামলায় বিচার শুরু হয় হয় যার আওতায় ৩০০ সেনা কর্মকর্তাকে কারাবন্দী করা হয়। ২০০৩ সালে একেপি সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে। তবে তাদের বিরুদ্ধে হাজির করা বেশিরভাগ প্রমাণই মিথ্যে বলে প্রতিপন্ন হয়েছিল। দুটো বিচারের ক্ষেত্রেই অভিযুক্তদের খালাস দেওয়া হয়েছিল। সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও বিচারবিভাগে থাকা ফেতুল্লাহ গুলেনের অনুসারীরা এ দুটি বিচারের ক্ষেত্রে সমন্বিতভাবে কাজ করেছেন। গুলেন হলেন প্রভাবশালী ইসলামী চিন্তাবিদ। ১৯৯৯ সাল থেকে তিনি পেনসিলভানিয়ায় নির্বাসনে আছেন তিনি।

একসময় রাষ্ট্রে সেক্যুলার কিংবা সামরিক আধিপত্যের সুযোগ দূর করার ক্ষেত্রে গুলেন মুভমেন্টের ওপর আস্থা ছিল একেপির। কিন্তু ওই দুই বিচারকার্যের পর একেপি ও গুলেন মুভমেন্ট রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে ক্ষমতার লড়াইয়ে নামে।

অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় অংশ নেওয়া এক তুর্কি সেনাকে পেটানো হচ্ছে
শীর্ষ কর্মকর্তাদের সমর্থন

রাজনীতি থেকে সামরিক বাহিনীকে দূরে রাখাটা ছিল দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা এরদোয়ান সরকারের দল একেপির অন্যতম অঙ্গীকার। তাছাড়া দেশকে ‘সন্ত্রাসমুক্ত’ করারও অঙ্গীকার ছিল। আর তা বাস্তবায়নে ধরপাকড়ের অভিযান শুরু হয়। তবে এখন পর্যন্ত দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরকে এরদোয়ান তার পাশেই পেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। সামরিক বাহিনীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ১৫ জুলাইয়ের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছে। সেনাবাহিনীর প্রধান এবং নৌবাহিনীর দুই জেনারেলকে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকারীরা জিম্মি করে ফেলে। সেনাবাহিনীর প্রধান ছাড়া পেলেও নৌবাহিনীর দুই জেনারেলের পরিণতি জানা যায়নি।

অভ্যুত্থান চেষ্টার নেপথ্যের লোকদের নিয়ে নানা তত্ত্ব

‘ব্যর্থ অভ্যুত্থানের’ নেপথ্যে ঠিক কারা রয়েছেন তা নিয়ে নানা তত্ত্ব রয়েছে। একটি তত্ত্ব বলছে, আরও ক্ষমতা পেতে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান গোপন অভিযান চালিয়েছেন। তবে আপাতদৃষ্টিতে এ ঘটনাকে আরও বেশি কিছু মনে হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিবিসির বিশ্লেষণে।

কামালবাদী অর্থাৎ আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা কামাল আতাতুর্কের সেক্যুলার অনুসারীদের সমর্থিত একটি তত্ত্বে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীই কৌশলে গুলেনবাদীদেরকে দিয়ে এ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার ঘটনা সাজিয়েছে। তারা জানতো এ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। মূলত সেনাবাহিনী থেকে গুলেনবাদীদের নির্মূল করাই ছিল এ প্রচেষ্টার লক্ষ্য।

একটি পুলিশ সূত্রের কাছ থেকে পাওয়া তত্ত্বে দাবি করা হয়েছে, একেপি সরকার গুলেনপন্থী সেনা কর্মকর্তাদের ১৬ জুলাই গ্রেফতার করার পরিকল্পনা করছিল। আর অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকারীদের কাছে সেই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিকল্পিত সময়ের আগেই তারা অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা শুরু করে দেন।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আর তার মন্ত্রীরাও গুলেনবাদীদের দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন।

তারপরও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়, প্রথমত সহিংসতাকে ব্যবহার করে একাকী অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করাটা গুলেনবাদীদের ধরন নয়। এরজেনেকন ও স্লেজহ্যামার মামলার সময় এবং কুর্দিদের সঙ্গে প্রথম শান্তি প্রক্রিয়া ভেস্তে যাওয়ার দিনগুলোতে গুলেনবাদী আন্দোলনকারীরা ওয়্যারটেপিং কিংবা প্রমাণ জাল করার মতো পদক্ষেপগুলো নিয়েছিল।  

দ্বিতীয়ত, সরকারি টিভিতে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকারীরা যে বিবৃতিটি পড়ে শোনাতে বাধ্য করেছিল তার সঙ্গে টার্কিশ ইয়থে কামাল আতাতুর্কের দেওয়া বিখ্যাত ভাষণের প্রতিচ্ছায়া রয়েছে। অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকারীরা নিজেদের ‘পিস অ্যাট হোম কাউন্সিল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যা আতাতুর্কের বিখ্যাত উক্তি পিচ অ্যাট হোম কিংবা পিস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড-এর মতো।

আবকার এমনও হতে পারে যে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকারীরা ইচ্ছে করেই নিজেদের গুলেনবাদী পরিচয় না দিয়ে কামালবাদী পরিচয় দেওয়ার কৌশল নিয়েছিল।

যাই হোক না কেন, এখন পর্যন্ত কোনও কিছুই নিশ্চিত নয়। যখন তুরস্ক সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিজনিত সংকট মোকাবেলায় লড়াই করছে, যখন এটি আইএসের হুমকিতে রয়েছে এবং কুর্দিদের বিদ্রোহ ঠেকাচ্ছে তখন একটি সামরিক অভ্যুত্থানই হয়তো দেশটির শেষ পরিণতি হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: বিবিসি

/এফইউ/

সম্পর্কিত
কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বললেন আরাঘচি
ইরাকে অস্ত্র জমা দেওয়ার ঘোষণা ইরানপন্থি দুই মিলিশিয়া গোষ্ঠীর
বোফোর্ট দুর্গে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে হিজবুল্লাহর হামলা
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম