২০১৬ অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণকারী প্রায় প্রত্যেক ক্রীড়াবিদেরই হয়তো বিশেষ বিশেষ অতীত-গল্প আছে। তবে কৌতুহল-উদ্দীপক সেইসব গল্পের মধ্যে শরণার্থী দলের ব্যানারে অলিম্পিকে অংশ নেওয়া সাঁতারু ইয়ুসরা মারদিনির গল্পটা বোধহয় সবথেকে অনন্য। গত বছর এজিয়ান সাগরে ডুবন্ত মানুষদের রক্ষা করতে গিয়ে নিজেই ডুবতে বসেছিলেন ইয়ুসা। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি জয়ী হন জীবনের যুদ্ধে। সেইসঙ্গে বাঁচাতে সক্ষম হন বেশ কয়েকজনের প্রাণ। কীভাবে অতগুলো মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন ইয়ুসরা? গল্পটি খুবই শিহরণ জাগানোর মতো।
জীবন বাঁচানোর যুদ্ধ জয়ের পর, জার্মানিতে বসবাসরত এ শরণার্থী এবারের অলিম্পিকেও নারীদের ১০০ মিটার বাটারফ্লাই সাঁতারে তার নৈপুণ্য দেখিয়েছেন।
সিরিয়ায় আতঙ্কের জীবন
সমবয়সী অন্যদের ক্ষেত্রে যখন পরীক্ষার ফলাফলকে সবচেয়ে বড় অর্জন বলে বিবেচনা করা হয়, তখনই যুদ্ধের বিভীষিকায় স্কুল ছেড়েছিলেন ১৮ বছর বয়সী ইয়ুসরা মারদিনি। তবে স্বপ্ন পূরণের লড়াইটা থামিয়ে দেননি তিনি। আর সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে নেমে জীবন বাস্তবতার এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে। গৃহযুদ্ধকবলিত সিরিয়ার দামেস্কের তুখোড় সাঁতারু ছিলেন ইয়ুসরা মারদিনি। পেশাগতভাবে সিরিয়ান অলিম্পিক কমিটির সমর্থন ছিল তার প্রতি।
যে সুইমিংপুলে ইয়ুসরা সাঁতার শিখতেন তা ছাদটি তছনছ হয়ে যায় বোমার আঘাতে। মাঝে মাঝে বোমার গর্জনে সাঁতার শেখাও বন্ধ হয়ে যেত। একদিকে বোমাতঙ্ক, অন্যদিকে সাঁতার শেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এ নিয়েই চলছিল ইয়ুসরা মারদিনির দিনকাল। কিন্তু ক্রমাগত যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকায় ইয়ুসরা আর তার বোন সিদ্ধান্ত নিলেন দেশ ছেড়ে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার।
জীবনযুদ্ধ
সিরিয়া থেকে প্রথমে তারা লেবানন গেলেন। এরপর তুরস্ক। সেখান থেকে নৌকায় করে গ্রিসের পথে রওনা করার পরই ঘটলো বিপত্তি। যে নৌকায় ছয়জন ওঠার কথা সেখানে গাঁদাগাঁদি করে ২০ জন উঠে পড়লো। এজিয়ান সাগরে ৩০ মিনিট চলার পর নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেল। মাঝ সাগরে তাদের উদ্ধার করার মতো কোনও নৌকাও নেই। বিকল ওই নৌকার যাত্রীদের বেশিরভাগই সাঁতার জানেন না। বিকল্প উপায় না দেখে ইয়ুসরা মারদিনি, তার বোন সারাহ ও আরও দুই সাঁতারু শীতল পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, নৌকাটিকে তারা সাঁতরাতে সাঁতরাতে টেনে নিয়ে যাবেন। শীতল পানিতে শরীর জমে যাওয়ার মতো অবস্থা। তারপরও অদম্য ইয়ুসরা ও তার বন্ধুরা। এভাবে সাড়ে তিন ঘণ্টা সাঁতরানোর পর লেসবসে পৌঁছান তারা।
সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইয়ুসরা বলেন, ‘আমরা চারজন মাত্র সাঁতার কাটতে পারতাম। এক হাতে নৌকার সঙ্গে বাঁধা দড়ি ধরে রেখেছিলাম আর দুই পা ও এক হাত দিয়ে সাঁতার কাটছিলাম। এভাবে ঠাণ্ডা পানিতে সাড়ে তিন ঘণ্টা সাঁতার কাটতে হলো। শরীর প্রায় নিথর হয়ে যাওয়ার অবস্থা। আমি জানি না, বলে বোঝাতে পেরেছি কিনা।’
আজকাল উন্মুক্ত সাগরকে ঘৃণা করেন ইয়ুসরা মারদিনি। তবে পার করে আসা সে ভয়াল অভিজ্ঞতাকে দুঃস্বপ্ন বলে মনে করেন না তিনি। ‘আমি মনে করি সাঁতার কাটতে না পারলে আমি বেঁচে থাকতে পারতাম না। হয়তো নৌকার সে অভিজ্ঞা হওয়ার কারণেই আমি তা উপলব্ধি করতে পারছি। সেটা আমার কাছে এক ইতিবাচক স্মৃতি।’
লেসবসের পর ইয়ুসরা আর সারাহ মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া, হাঙ্গেরি এবং অস্ট্রিয়া হয়ে চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল জার্মানিতে পৌঁছালেন।
আবারও নতুন করে পথ চলা শুরু
বর্তমানে জার্মানির বার্লিনে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করেনেইয়ুসরা মারদিনি। সেখানকার একটি সুইমিং ক্লাব ইয়ুসরাকে তাদের সদস্য বানিয়ে নিয়েছে। খুব দ্রুত ইয়ুসরার দক্ষতা মুগ্ধ করলো তার কোচকে। ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিকে ইয়ুসরাকে পাঠানোর কথা ভাবলেন কোচ স্ভেন স্পানেকরেভস। তবে তার আগেই শরণার্থীদের ব্যানারে অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেলেন ইয়ুসরা।
উল্লেখ্য, ১০ শরণার্থীর একটি দল এবারের অলিম্পিকে অংশ নিচ্ছে। তাদের দেশ নেই, জাতীয়তা নেই, নেই জাতীয় সঙ্গীত। পরিচয়ের রাজনৈতিক পাটাতনে তারা তাই অলিম্পিক পতাকাকেই নিজেদের পরিচয়ের সূত্র করে নিয়েছে। ১০ অ্যাথলেটের মধ্যে দক্ষিণ সুদানের পাঁচজন এবং দু’জন করে সিরিয়া ও ডিআর কঙ্গোর ও একজন ইথিওপিয়ার।
শরণার্থীদের দলের হয়ে নিজের অংশগ্রহণের ঘোষণা দিতে গিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ইয়ুসরা বলেন, ‘আমি চাই শরণার্থীদেরকে সবাই স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বিবেচনা করবে। মনে রাখবে যে শরণার্থীদেরও দেশ ছিল, তা তারা হারিয়েছে। পালানোর জন্য কিংবা শরণার্থী হওয়ার জন্য তারা দেশ ছাড়েনি, পরিস্থিতিই তাদেরকে বাধ্য করেছে। কারণ তাদের জীবনেও স্বপ্ন আছে আর সেগুলো তারা পূরণ করতে চায়।’
একদিন সিরিয়ায় ফিরে যাবেন বলেও আশা করেন ইয়ুসরা। তিনি বলেন, ‘হয়তো জার্মানিতে আমি আমার জীবন গড়ে তুলব। তবে আমি যখন বৃদ্ধ হব তখন সিরিয়ায় ফিরে যাব এবং সেখানকার লোকজনকে আমার অভিজ্ঞতার গল্প শোনাবো।’
/বিএ/








