মুনাফাবাজ উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ জলবায়ুর যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে, বিশ্বজুড়ে কফি উৎপাদনের ক্ষেত্রে তার ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। ফেয়ারট্রেড অস্ট্রেলিয়া অ্যান্ড নিউজিল্যান্ডের পৃষ্ঠপোষকতায় চালিত সংস্থা ক্লাইমেট ইন্সটিটিউটের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কফি উৎপাদনের জন্য উপযোগী ভূমি অর্ধেকে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান ওই প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে বলছে, কফি-অর্থনীতির এই আসন্ন বিপর্যয় ১২০ মিলিয়ন বা ১২ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলতে যাচ্ছে। আর বিশ্বের কোটি কোটি কফি ভোক্তার কাছেও এটি ভয়াবহ দুঃসংবাদ আকারেই হাজির হতে যাচ্ছে।
পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রেক্ষাপট এবং কফি অর্থনীতি
সেই শিল্পায়নের যুগ থেকে মুনাফার স্বার্থে মানুষ প্রকৃতির দিতে খেয়াল না করেই পুড়িয়ে যাচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানি, বায়ুমণ্ডলে জমা করেছে কার্বনের অভিশাপ। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত প্রমাণ হাজির করেছেন, শিল্পোন্নত দেশগুলোর এই মুনাফার উন্মাদনার কারণেই বৈশ্বিক তাপমাত্রা মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে গেছে। হারিয়ে গেছে ঋতু বৈচিত্র্য। ওজনস্তরে দেখা দিয়োছে ভয়াবহ ফুটো। গলতে শুরু করেছে দুই মেরুতে জমে থাকা বরফ। জলবায়ুর প্রভাবজনিত কারণে বেড়ে গেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা, কৃষিতে নেমে এসেছে বিপর্যয়। ক্রমাগত জলবায়ু-উদ্বাস্তুতে রূপান্তরিত হচ্ছে মানুষ। এই প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতারা এক সমঝোতায় পৌঁছান। প্যারিস সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এক চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম রাখতে একমত হন শীর্ষ কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা। তবে চুক্তি নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী নন বিশেষজ্ঞরা। সে সময় গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই চুক্তিকে নিছক আশাবাদ বলে রায় দেন বিশেষজ্ঞরা। এই ভয়াবহ হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্যেই কফি অর্থনীতিতে জলবায়ুর প্রভাবজনিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হল।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে কফি উৎপাদন শিল্প প্রভাবিত হয়েছে। তানজানিয়ার ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন মানুষ জীবিকার জন্য কফি উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে কফি উৎপাদনের হার ১৯৬০ সালের পর থেকে অর্ধেকে নেমে এসেছে। প্রতি একরে উৎপাদন কমেছে ১৩৭ কেজি। ক্লাইমেট ইন্সটিটিউটের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন স্টারবাকস ও লুভাজ্জাসহ বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় কফি উৎপাদন শিল্পগুলো ঝুঁকির মুখে ফেলতে যাচ্ছে।
কফিতে জলবায়ুর প্রাকৃতিক প্রভাব
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে উষ্ণতা এবং অকস্মাৎ বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে গেছে। কফি-উৎপাদনের জন্য বৃবহৃত জমির বিপর্যয়ে ওই উষ্ণতা আর বৃষ্টি ভূমিকা রেখেছে। তীব্র উষ্ণতা আর ও অসময়ের বৃষ্টিতে কফি খামার গুলোতে পোকা ও অসুখ সৃষ্টি হয়। সেন্ট্রাল আমেরিকায় ২০১২ সালে কফি পাতায় রোগ লেগে প্রায় অর্ধেক ফলন নষ্ট হয়। এমনকি গুয়াতেমালায় ৮৫ ভাগ ফসল নষ্ট হয়ে যায়। সেন্ট্রাল আমেরিকায় ২০১২-১৩ সালে কফি ব্যবসায় প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়, কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে যান এই শিল্পে কর্মরত সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন যেভাবে কফি উৎপাদনের ক্ষতি করে তার ধরন অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ২০৫০ নাগাদ নিকারাগুয়ার কফি উৎপন্নকারী ভূমি অর্ধেকে নেমে আসবে, ২০৬০ সাল নাগাদ তানজানিয়ায় কফি উৎপাদন ‘আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাবে।’ এ ছাড়াও বিজ্ঞানীরা মনে করছেন ২০৮০ সাল নাগাদ বুনো কফি বিলুপ্ত হয়ে যাবে, খামারে উৎপন্ন কফির জিনগত বৈচিত্র তৈরিতে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কফির ভোক্তাদের জন্য দুঃসংবাদ হচ্ছে, কফির স্বাদ, গন্ধ ও মূল্যের ওপরও এর প্রবল প্রভাব পড়বে।
উৎপাদক আর চাষীদের আর্তি
কফি উৎপাদনকারী বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। লুভাজ্জার মারিও কেরুটি ২০১৫ সালের এক সম্মেলনে বলেন, ‘আমাদের মাথার ওপর একটা মেঘ ঘনিয়ে উঠেছে, এটি নাটকীয় রকমের গুরুতর বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তন অল্প সময়ের মধ্যেই কফির ওপর প্রভাব ফেলছে। বিষয়টি এখন আর ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করে নেই, এটি ইতোমধ্যে বর্তমান।’ স্টারবাকসের পরিবেশবিষয়ক পরিচালক জিম হানা ২০১১ সালে সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের পণ্য সরবরাহকে ঝুঁকিতে ফেলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি এখনও বসে বসে দেখতে থাকি তাহলে এই হুমকি আরও অনেক বেড়ে যাবে।’
কফি উৎপাদনকারী খামারগুলো ছোট ও দরিদ্র অবস্থায় থাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সংগ্রাম করার ক্ষেত্রে তাদের নানা রকম সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই অবস্থার সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে কফি চাষিদের পক্ষে নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে উঁচু ভূমিতে চলে যাওয়া সম্ভব নয়। কফি গাছের প্রজননক্ষম হয়ে উঠতে বেশ সময় লাগে, যা যথাযথ যত্ন ছাড়া সম্ভব নয়। বিকল্প পদ্ধতিতে আরও স্থিতিস্থাপক উৎপাদন ব্যবস্থা দাঁড় করাতে হলেও সেজন্যে ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
ক্লাইমেট ইন্সটিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জন কনন বলেন, ‘আমরা কফিপায়ীরা এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারি।’ তিনি বলেন, কফির ভোক্তারা যদি এমন ব্র্যান্ড দেখে কফি কেনেন, যারা কিনা চাষিদের ন্যয্য পাওনা মিটিয়ে দেয়, তাহলে চাষিদের পক্ষে তা উপকারী হতে পারে। ফেয়ারট্রেড জানায়, তাদের ক্লাইমেট নিউট্রাল কফি এই কাজটি করছে। কফি চাষিদের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করার জন্য সহায়তা দিচ্ছে সংস্থাটি।
তবে এইসব উদ্যোগ যে বিশাল এই অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পারবে, এমন আশার কথা কেউই বলতে পারছে না। সূত্র: গার্ডিয়ান, উইকিপিডিয়া, ইউএনএফসিসিসি-র ওয়েবসাইট
/বিএ/







