যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে স্থানীয় সময় সকাল ৬টা থেকে এবং পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে সকাল ৭টা থেকে শুরু হয়েছে ঐতিহাসিক মার্কিন নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ভোটগ্রহণ। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং ওভারসিজ ভোটারদের আগাম ভোট এবং ১শ ভোটারের কম জনসংখ্যার ৩টি কেন্দ্রে ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এবার মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে সব অঙ্গরাজ্যে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সকাল ৬টা থেকে নিউ ইয়র্ক, কানেকটিকাট, ইন্ডিয়ানা ও কেন্টাকির কিছু অংশ, মেইন, নিউ জার্সি ও ভার্জিনিয়া-এ সাতটি অঙ্গরাজ্যে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ভারমন্টে ভোটগ্রহণ শুরুহয়েছে ভোর ৫টা থেকে। নর্থ ক্যারেলিনা, ওহাইও এবং ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় ভোট সকাল সাড়ে ৬টা থেকে। আর ফ্লোরিডা, ডেলাওয়ার, জর্জিয়া, ম্যাসাচুসেটস, ম্যারিল্যান্ড, মিশিগান, নিউ হ্যাম্পশায়ার, পেনসিলভানিয়া, রোড আইল্যান্ড, সাউথ ক্যারোলিনা, টেনেসির কিছু অংশের ভোট সকাল সাতটা থেকে। এছাড়া সোমবার মধ্যরাতে ঐতিহ্য মেনে নিউ হ্যাম্পশায়ারের তিনটি টাউনে ভোটগ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। অন্য অঙ্গরাজ্যগুলোতে নির্বাচনের দিন সকাল ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে ভোটগ্রহণ শুরু হলেও এ তিনটি এলাকায় মধ্যরাতে ভোট হয়। ভোটাভুটিতে ৩২-২৫ ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যে তিনটি এলাকায় ভোটগ্রহণ হয়েছে সেগুলো হলো-ডিক্সভিল নচ, হার্ট’স লোকেশন ও মিলসফিল্ড। এ টাউনগুলোর জনসংখ্যা ১০০রও কম। এরমধ্যে দুটিতে হিলারি জয় পেলেও একটিতে ট্রাম্প তাকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। আর তাই ভোটাভুটির দিক থেকে হিলারির থেকে এগিয়ে যান ট্রাম্প।
নির্বাচনি জরিপে এগিয়ে হিলারি
সর্বশেষ নির্বাচনি জরিপে জয়ের সম্ভাবনার দিক থেকে বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন। রয়টার্স-ইপসোস এর জরিপে হিলারির ক্ষেত্রে ৯০ ভাগ জয়ের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। প্রজেক্ট ফাইভ থার্টি এইটের জরিপে হিলারির জয়ের সম্ভাবনা বলা হয়েছে ৭১ ভাগ। সেইসঙ্গে হিলারি ৩০৩টি এবং ট্রাম্প ২৩৫টি ইলেক্টোরাল ভোট পাবেন বলে আভাস দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে হলে ২৭০টি ইলেক্টোরাল ভোট পেতে হয়। সিএনএন-এর নির্বাচনি জরিপে হিলারি চার পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের জরিপের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় পর্যায়ের ওই জরিপটি প্রস্তুত করে হয়েছে।এতে দেখা যায়,হিলারি পেয়েছেন ৪৬ শতাংশ ভোটারের সমর্থন, অপরদিকে ট্রাম্পের পক্ষে সমর্থন রয়েছে ৪২ শতাংশের। অপরদিকে লিবারটেরিয়ান পার্টির গ্যারি জনসনের প্রতি সমর্থন রয়েছে ৩ শতাংশ ভোটারের আর গ্রিন পার্টির জিল স্টেইনকে সমর্থন জানাচ্ছেন ২ শতাংশ।
সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে যেসব অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন, তাতেও হিলারির অবস্থান ভালো। সেই সঙ্গে নির্ধারক অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে কয়েকটিতেও হিলারিজয়ী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে মিশিগানের মতো অঙ্গরাজ্য, যেখানে ১৯৮৮ সাল থেকে কোনও রিপাবলিকান প্রার্থী জয়ী হননি, সেখানে ট্রাম্পের অবস্থান অনেক পোক্ত। আর তা ডেমোক্র্যাটদের জন্য চিন্তার কারণ। ট্রাম্প ক্রমাগত হিলারির সঙ্গে ব্যবধান আরও কমিয়ে আনছেন। ট্রাম্প শিবির শেষ মুহূর্তে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
মিশিগানে হিলারি শিবিরের তৎপরতা তুলনামূলক কম ছিল। তাদের তৎপরতা বেশি ছিল ফ্লোরিডা, নেভাদা এবং নর্থ ক্যারোলিনায়।
ওহাইও, নর্থ ক্যারোলিনা এবং ফ্লোরিডায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গেছে। ট্রাম্পকে নির্বাচনে জিততে হলে এই অঙ্গরাজ্যগুলোতে জয়ী হতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ফ্লোরিডা এবং নেভাদায় আগাম ভোটে হিস্পানিকদের সমর্থন পেয়েছেন হিলারি। তবে কৃষ্ণাঙ্গদের নিরঙ্কুশ সমর্থন তিনি পাননি, যেমনটা ২০০৮ এবং ২০১২ সালের নির্বাচনে বারাক ওবামা পেয়েছিলেন।
সিএনএন-এর জরিপ অনুসারে হিলারির পক্ষে রয়েছে ২৬৮টি ইলেক্টোরাল ভোট আর ট্রাম্পের পক্ষে ২০৪টি ইলেক্টোরাল ভোট। হোয়াইট হাউসের টিকেট পেতে একজন প্রার্থীকে অন্তত২৭০টি ইলেক্টোরাল ভোট পেতে হবে।
যেসব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্য বিজয়ী নির্ধারণ করবে, তার মধ্যে নর্থ ক্যারোলিনায় ট্রাম্পের ৪৩ শতাংশের বিপরীতে হিলারির রয়েছে ৪৫ শতাংশের সমর্থন। ফ্লোরিডায় উভয় প্রার্থীরসমর্থন ৪৫ শতাংশ। পেনসিলভ্যানিয়ায় হিলারি পাঁচ পয়েন্টে এগিয়ে থাকলেও সেখানে ট্রাম্পের সমর্থন বাড়ছে।
কয়েক সপ্তাহ আগে নিউ হ্যাম্পশায়ারে ট্রাম্প অনেক পিছিয়ে থাকলেও, গত সপ্তাহে ট্রাম্প-হিলারির সমর্থন যথাক্রমে ৪১ এবং ৪৪ শতাংশ।
শেষ দিনের প্রচারণা
নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে পেনসিলভানিয়া, নর্থ ক্যারোলিনা ও মিশিগানে প্রচারণা চালিয়েছেন ট্রাম্প ও হিলারি। একটি 'আশাপূর্ণ, সর্বব্যাপী ও উদার আমেরিকা' গঠনে সমর্থন দেওয়ার জন্য ভোটারদের আহ্বান জানিয়েছেন হিলারি। আর ট্রাম্প তার সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন, 'দুর্নীতি রোধে তাদের সামনে একটি বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে'।
বিচারবিভাগের নজর
মঙ্গলবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ। ২৮টি অঙ্গরাজ্যে ৭০০ কর্মী প্রেরণ করছে তারা। এই কর্মীরা পর্যবেক্ষণ করবেন কোনও ভোটার, বিশেষত প্রান্তিক ভোটাররা যেন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে কোনও বৈষম্যের শিকার না হন। সম্প্রতি মুসলিম ও অভিবাসী বিদ্বেষী রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সমর্থকদের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকার আহ্বান জানান। সেই ট্রাম্পসমর্থকরা যেন ভোটারদের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে না পারেন, সে কারণেই মার্কিন বিচারবিভাগ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বৈশ্বিক উদ্বেগ লাঘবের চেষ্টা ট্রাম্প শিবিরের
মুসলিম ও অভিবাসীবিরোধী আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে বারবার সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না কিংবা মেক্সিকো 'ধর্ষক আর ক্রিমিনালদের' যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করছে। ট্রাম্পের এমন বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে তাকে নিয়ে তৈরি হয় বৈশ্বিক উদ্বেগ। তবে শেষ সময়ে সে উদ্বেগকে লাঘবের চেষ্টা করেছে ট্রাম্প শিবির। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্যাম্পেইন ম্যানেজার কেলিঅ্যান কনওয়ে বিবিসিকে বলেন, "ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে বিদেশে যে ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তা বিব্রতকর, বিরক্তিকর। তবে তাকে নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। তার কাছে ‘আমেরিকাই প্রথম’। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্রের ব্যাপারেও বিশ্বস্ত হবেন।"
সূত্র: বিবিসি, গার্ডিয়ান, সিএনএন
/এফইউ/বিএ/








