অধিকৃত ফিলিস্তিতি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন বন্ধের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া প্রস্তাব নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার শপথের দিনেই জাতিসংঘ ভিন্ন পথ নেবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তবে ঠিক কীভাবে এই প্রস্তাব বদলে যাবে, তা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি ট্রাম্প।
জাতিসংঘের ভোটাভুটিতে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন বন্ধের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাস হওয়ার পর এক টুইটার বার্তায় এই প্রতিক্রিয়া জানান ট্রাম্প। এর আগে ওই প্রস্তাব পাস হওয়া ঠেকাতে তিনি নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত বিদায়ী মার্কিন প্রশাসনের নীরব ভূমিকার কারণে তিনি ব্যর্থ হন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার খবর অনুযায়ী, শুক্রবার ১৫ সদস্যবিশিষ্ট জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর কাছে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি তুলে ধরা হয়। ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধের ওই প্রস্তাবে বলা হয়, ‘১৯৬৭ সাল থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েল যে বসতি স্থাপন করে যাচ্ছে, তার কোনও আইনি ভিত্তি নাই।’ ভোট দান থেকে বিরত থাকে যুক্তরাষ্ট্র। বাকি ১৪ টি দেশ এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলে তা পাস হয়। প্রস্তাবকে আন্তর্জাতিক আইনের বিজয় এবং ইসরায়েলি চরমপন্থার প্রত্যাখান বলছে ফিলিস্তিন। আর ইসরায়েল বলছে, তারা এর তোয়াক্কা করে না। প্রস্তাবের কোনও শর্তই মানবেন না তারা।
প্রস্তাব পাসের প্রতিক্রিয়ায় এক টুইটার বার্তায় ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ’২০ জানুয়ারির পর জাতিসংঘের অবস্থান বদলে যেতে পারে।’ উল্লেখ্য, ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের শপথের দিন। তবে তার ক্ষমতায় যাওয়ার পর এই প্রস্তাব বাতিল হবে কী করে, জাতিসংঘ কী করে নতুন সিদ্ধান্তের দিকে যাবে; তা স্পষ্ট নয়।
এর আগে বুধবার বসতি স্থাপন বন্ধে এক প্রস্তাব হাজির করেছিল মিসর। ইসরায়েলের চাপে তারা সেই প্রস্তাব প্রত্যাহার করায় জাতিসংঘে এ সংক্রান্ত ভোটাভুটি স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। নেপথ্যে ভূমিকা রাখেন ট্রাম্প। টেলিফোনে মিসরকে চাপ দেন তিনি। ট্রাম্পের অন্তর্বর্তী দলের সঙ্গেও যোগাযোগ করে ইসরায়েল সরকারের যোগাযোগের মধ্য দিয়ে এ ব্যাপারে ঐকমত্য হয় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে খবর প্রকাশিত হয়। বৃহস্পতিবার সকালেই নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি প্রস্তাব পাস না করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আর সিসিকে ফোন করেন ট্রাম্প। একপর্যায়ে মিসর প্রস্তাব প্রত্যাহার করে।
২০১১ সালে একইরকমের একটি প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে এবার শুরু থেকেই গুঞ্জন ছিল, বর্তমান ওবামা প্রশাসন এই প্রস্তাবে ভেটো দেওয়ার ব্যাপারে রাজি না। সে কারণেই ট্রাম্প এ ব্যাপারে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হন। ট্রাম্পের ব্যর্থতার নেপথ্যে ছিল বসতি নির্মাণ বন্ধের প্রস্তাবে ভেটো না দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের কঠোর সিদ্ধান্ত। মিসরের প্রস্তাব প্রত্যাহার হওয়ার পর ভোটাভুটি স্থগিতের সময়কার এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছিল, জাতিসংঘে প্রস্তাবটি পাস হওয়ার সুযোগ করে দিতে ভোটদান থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী সরকার।
পরে নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভেনেজুয়েলা, সেনেগালের পক্ষ থেকে একই প্রস্তাব তুলে ধরা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক নীরবতায় তা পাস হয়। প্রতিক্রিয়ায় ফিলিস্তিন পক্ষের প্রধান প্রতিনিধি ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আজ আন্তর্জাতিক আইনের বিজয়ী হওয়ার দিন। সুসভ্য ভাষা এবং সংকট নিরসন প্রক্রিয়ার জয়। এটি ইসরায়েলি চরমপস্থার সুস্পষ্ট প্রত্যাখ্যান।’ তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েলকে বার্তা দিয়েছে, দখল কায়েমের মধ্য দিয়ে শান্তি আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। বরং শান্তি আনতে দরকার দখল বন্ধ করা, এবং ১৯৬৭’র সীমানা অনুযায়ী ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের পাশাপাশি শান্তিতে থাকতে দেওয়া।’
৮ বছর পরে এমন একটি প্রস্তাব পাশ হলো নিরাপত্তা পরিষদে। প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেহানইয়াহুর দফতর থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইসরায়েল এই লজ্জাকর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছে। এর কোনও শর্ত মানতে আমরা বাধ্য নই।’ জাতিসংঘে ইসরায়েলি দূত ড্যানি ড্যানন আলজাজিরাকে বলেন, তাদের সরকার আশা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবে ভেটো দেবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন মার্কিন প্রশাসন এবং জাতিসংঘের নতুর মহাসচিব এসে নতুন কিছু করবেন। ট্রাম্পের টুইটেও এর সমর্থন মিলেছে। টুইটারে তিনি লিখেছেন, ‘২০ জানুয়ারির পর ভিন্ন কিছু ঘটতে পারে।’
দেশটির এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিদায়ী মার্কিন প্রশাসন যে ভোটাভুটি থেকে বিরত থাকতে পারে; তা জানতে পেরে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্তর্বর্তী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইসরায়েল। এ ব্যাপারে ট্রাম্পের অন্তর্বর্তী দলের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। মিসরের প্রস্তাবের পরই যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারস্থ হন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান। তা সত্ত্বেও প্রস্তাবটি পাস হোয় যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ভূমিকায়।
১৯৯০ এর দশকের শুরু থেকে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে বেশ কয়েক দফায় শান্তি আলোচনা হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা চায় পশ্চিম তীরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে এবং পূর্ব জেরুজালেমকে এর রাজধানী বানাতে। ১৯৬৭ সালের আরব যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল করে রেখেছে। পূর্ব জেরুজালেমকে নিজেদের অবিভাজ্য রাজধানী বলে দাবি করে থাকে ইসরায়েল। অবশ্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পূর্ব জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ১৯৬৭ সালের পর পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ১শরও বেশি বসতি স্থাপন করেছে ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এ বসতি স্থাপনকে অবৈধ বলে বিবেচনা করা হলেও ইসরায়েল তা মানতে চায় না।
সূত্র: আল-জাজিরা
/বিএ/








