মধ্যপ্রাচ্যের সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার কঠোর সমালোচনা করেছেন এসব দেশের নাগরিকরা। বিশেষ করে চলতি সপ্তাহে ইরাক ও ইয়েমেনের কয়েকজন নাগরিককে কায়রো থেকে নিউ ইয়র্কের ফ্লাইটে উঠতে না দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন তারা। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দেশগুলোর যেসব মানুষ যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরিকল্পনা করছিলেন ক্ষোভে ফুঁসছেন তারা।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি ছিল ইজিপ্টএয়ার-এর একটি ফ্লাইটে। ওই ফ্লাইটটিতে করে কায়রো থেকে নিউ ইয়র্ক বিমানবন্দরে আসছিলেন এসব যাত্রী। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও এসব যাত্রীকে কায়রো বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয়। আটকে দেওয়া যাত্রীদের মধ্যে পাঁচজন ইরাকি এবং একজন ইয়েমেনি ছিলেন। পরে তাদের নিজ নিজ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনার পর বিপাকে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরিকল্পনা ছিল এমন আরবরা। তারা বলছেন, এটা অপমানজনক এবং বৈষম্যমূলক।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই নিষেধাজ্ঞার কারণে পারিবারিক সফর কিংবা দাফতরিক কাজে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে আগ্রহীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
এদিকে মুসলিম দেশগুলো থেকে শরণার্থী প্রবেশের মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এবার ইরানও তাদের দেশে সব মার্কিন নাগরিকের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে দেবে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাত দিয়ে সে দেশের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এই খবর জানিয়েছে।
ইয়েমেনি-আমেরিকান একজন নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক নাজিব হায়দারি। মুসলিম দেশগুলোতে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার পরদিন এ বিষয়ে মুখ খোলেন তিনি। নাজিব হায়দারি বলেন, “আরব ও মুসলমানদের একটি বিশাল গ্রুপকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করা ঠিক নয়। এটা একটা নির্বোধ, ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত। এর ফলে আমাদের কিংবা অন্য যে কারও চাইতে আমেরিকানরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ এটা দেখিয়েছে যে, এই প্রেসিডেন্ট মানুষ, রাজনীতি কিংবা বৈশ্বিক সম্পর্ক পরিচালনা করতে পারেন না।’
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে নিতান্তই দুঃখজনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সুদান।
এক সপ্তাহ আগে হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রেসিডেন্টের ব্যাপক ক্ষমতার ব্যবহার করে যাচ্ছেন ট্রাম্প। শুক্রবার তিনি নির্বাহী আদেশে মধ্যপ্রাচ্যের সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে অন্তত ৯০ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এ দেশগুলো হচ্ছে ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া এবং ইয়েমেন। এরইমধ্যে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। অবশ্য সিরিয়ার যুদ্ধাবস্থা থেকে বাঁচতে দেশটির খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে স্থান দিতে চান ট্রাম্প।
অন্যায্য সিদ্ধান্ত
কায়রো বিমানবন্দরের সূত্রগুলো বলছে, ইজিপ্টএয়ার-এর একটি ফ্লাইটে করে কায়রো থেকে নিউ ইয়র্ক বিমানবন্দরে আসছিলেন ছয় যাত্রী। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও অন্য ফ্লাইটে তাদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ।
লেবানিজ বিমানবন্দর সূত্র বলছে, বৈরুত থেকে প্যারিসে প্যারিসে এসেছিল একটি সিরীয় পরিবার। যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ ভিসা থাকার পরও তাদের যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টাগামী একটি বিমানে উঠতে নিবৃত্ত করা হয়। পরে শনিবার তারা পুনরায় বৈরুতে ফিরে আসেন।
এ নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে যাত্রীদের সতর্ক করে আসছে কাতার এয়ারওয়েজ। নিষেধাজ্ঞাভুক্ত সাত মুসলিম দেশের যাত্রীদের যুক্তরাষ্ট্র সফরে মার্কিন গ্রিন কার্ড অথবা কূটনীতিক ভিসা থাকতে হবে বলে জানিয়ে দিচ্ছে বিমান সংস্থাটি।
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশুনা করেছেন ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফারিয়া আল-মুসলিমি। সানা’র সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ-এর সঙ্গেও যুক্ত আছেন তিনি। ফারিয়া-র ভাষায়, “এটা কাণ্ডজ্ঞানহীন – কিন্তু এটা ট্রাম্পের সুস্থ মস্তিষ্কের অংশ?”
ফারিয়া আল-মুসলিমি বলেন, “হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে যাদের আদতে পরিস্থিতির ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। যেখানে আমেরিকায় সম্প্রতি কিছু হামলার ঘটনা ঘটেছে উগ্রবাদী মার্কিন নাগরিকদের দ্বারা, বিদেশিদের দ্বারা নয়।”
লটারিতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ড পেয়েছিলেন ৩৪ বছরের এক সুদানি নাগরিক। তবে এ মুহূর্তে তিনি গ্রিন কার্ড নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের বিষয়ে উদ্বিগ্ন। ওই ব্যক্তির ভাষায়, “যদি আমি প্রত্যাখ্যাত হই...এটা আমার জীবনকে ধ্বংস করে দেবে। কারণ সুদানে আমি নিজের চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছি। আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রস্তুতি নিয়েছি।”
ইরানি-আমেরিকান একজন নারী ফারিবা (ছদ্মনাম)। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে বসবাসরত এ নারী নিজের নাম জানাতে চাননি। তিনি জানান, ইরানি বর্ষবরণ উদযাপনের পরিকল্পনা ছিল তার মা-বাবা-র। কিন্তু এখন এটা সম্ভব নয়।
ফারিবা বলেন, “এই ধরনের একটি নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ার মতো আমরা কি করেছি? ... এই নিষেধাজ্ঞা আমাদের জীবনকে ধ্বংস করে দেবে। আপনাকে ধন্যবাদ মিস্টার প্রেসিডেন্ট। আপনি কি নিরপরাধ মানুষদের আঘাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও মহৎ করে তুলতে চাইছেন?”
যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরিকল্পনা ছিল এমন কিছু ব্যক্তির সঙ্গে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এ নিষেধাজ্ঞা তাদের ক্যারিয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
অবমাননাকর, অপমানজনক
ইরাকের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত একজন চিকিৎসক বায়ান আদিল। একটি মেডিকেল সেমিনারে অংশ নিতে মার্কিন ভিসার জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। তবে কর্তৃপক্ষের তরফে তাকে বলে দেওয়া হয়েছে, ইরাকি একাডেমিকদের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ইউরোপ সফর করা। মার্কিন মুলুকে তারা প্রত্যাশিত নয়।
বায়ান আদিল বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত শুধু আমাদের মতো একাডেমিকদের জন্যই নয়; বরং এটা সব ইরাকির জন্যই অবমাননাকর, অপমানক।”
ইরাকি চিকিৎসক বায়ান আদিল-এর কথাই যেন প্রতিধ্বনিত হলো ৪৩ বছরের আবদ আল-জাফর-এর কণ্ঠে। সুদানের রাজধানী খার্তুমের এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক জানান, চিকিৎসা বিষয়ে পড়াশুনার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র যেতে চেয়েছিলেন।
আবদ আল-জাফর-এর ভাষায়, “এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সেটা হবে একটা বিপর্যয়। আমি সুদানে কাজ করি। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী হওয়ার কোনও ইচ্ছা আমার নেই। শুধু পড়াশুনার জন্য সেখানে যেতে ইচ্ছুক। এই সিদ্ধান্ত অবৈধ।”
সিরিয়ার ইয়ারমুক থেকে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের বুর্জ আল বারাজনেহ ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন ৩৪ বছরের জৌমানা গাজী শিহাদি। তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্ত বহু মানুষকে ধ্বংস করবে।
জৌমানা গাজী শিহাদি বলেন, “অবশ্যই আমরা কোনও কিছু উড়িয়ে দিতে যাচ্ছি না ... আমরা সবাই শুধু নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা চাইছি।”
একজন আমেরিকান নারী মিরনা। তার দুই সন্তানের বসবাস সিরিয়ায়। এই নারী বলেন, এটা পরিষ্কার যে ট্রাম্প সিরিয়ার মুসলিমদের গ্রহণ করতে চান না। তার কাছ থেকে আমরা কেবল নিকৃষ্ট জিনিসই প্রত্যাশা করতে পারি। কারণ তিনি একজন বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ। সূত্র: রয়টার্স।
/এমপি/








