দুনিয়াজুড়ে মার্কিন নজরদারির গোপন তথ্য ফাঁস করে দেওয়া আলোচিত ওয়েবসাইট উইকিলিকস এবার এমন সব গোপন দলিল ফাঁস করেছে, যেখানে সিআইএ’র হ্যাকিং কর্মসূচির বিস্তারিত উঠে এসেছে। ৭ মার্চ ২০১৭ মঙ্গলবার নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ)’র এসব নথি ফাঁস করে উইকিলিকস। এতে বলা হয়েছে, অ্যান্ড্রয়েডচালিত স্মার্টফোন, কম্পিউটার এমনকি ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে; এমন টেলিভিশনেও নজরদারি চালিয়ে থাকে সিআইএ। তবে যে সফটওয়্যার টুলের মাধ্যমে এতোদিন ধরে এ নজরদারি চালানো হয়েছে সেটা পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত ছিল না।
উইকিলিকস বলছে, সিআইএ এবং তার সহযোগী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ফোন এবং মেসেজিং সার্ভিস থেকে গোপন সংকেত পায়। এগুলোর মধ্যে সিগন্যাল, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামের মতো মেসেজিং অ্যাপও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হ্যাকাররা অ্যান্ড্রয়েডচালিত ফোনগুলোতে প্রবেশাধিকার পায়। এসব ফোন থেকে তারা সেগুলোতে থাকা লোকজনের অডিও এবং মেসেজ সংগ্রহ করতে পারে। এমনকি যেসব কম্পিউটার ইন্টারনেটে যুক্ত নয়, সেগুলোতে প্রবেশের কৌশলও উদ্ভাবন করেছে সিআইএ। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অজান্তে তার কম্পিউটারে প্রবেশাধিকার পায় মার্কিন গোয়েন্দারা।
বছরের পর বছর ধরে দুনিয়াজুড়ে এমন গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়ে আসছে সিআইএ। এজন্য তারা যে কম্পিউটার পদ্ধতি ব্যবহার করে, এবার সেই পদ্ধতিটিই ফাঁস করে দিলো উইকিলিকস। ক্ষমতাশালীদের তথ্য ফাঁস করে বিশ্বব্যাপী মার্কিন সাম্রাজ্যের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেওয়া এই বিকল্প সংবাদমাধ্যম দাবি করছে, তাদের এবারের ফাঁস করা তথ্যগুলোর কারণে বিশ্বব্যাপী নজরদারির পদ্ধতিতে সিআইএ পরিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। সিআইএ উইকিলিকস-এর দাবি অস্বীকার করেনি। তবে এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তারা।
উইকিলিকস-এর টুইটার পাতা থেকে অনায়াসে প্রবেশ করা যাচ্ছে সেই ফাঁসকৃত ফাইলগুলোতে। এক বিবৃতিতে তারা বলছে, ‘সম্প্রতি সিআইএ তার নজরদারির হাতিয়ারগুলোর বেশিরভাগেরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে লাখ লাখ লাইনের কোড যা সিআইএর নজরদারি সক্ষমতার সবটুকুকে সামনে নিয়ে আসে।’
ফাঁসকৃত এসব নথিগুলো ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে সিআইএ’র সেন্টার ফর সাইবার ইন্টেলিজেন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। এসব নথিকে নিজেদের ফাঁস করা সবচেয়ে বড় আকারের গোপন নথি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক জুলিয়ান পল অ্যাসাঞ্জ বলেছেন, এটা সিআইএ’র ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নথি ফাঁসের ঘটনা। ইতোপূর্বে অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা নথির চেয়ে এটি আকারে অনেক বড়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭ মার্চ সকালে ফাঁস হওয়া ওই নথিতে সিআইএ’র গোপন নজরদারির বিভিন্ন পদ্ধতির বিবরণ রয়েছে। অবশ্য, এ গোপন নথি ফাঁসের ব্যাপারে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সিআইএ। পলিটিকোকে সিআইএ’র মুখপাত্র জোনাথন লিউ বলেন, ‘গোয়েন্দা নথি ফাঁস হওয়ার সত্যতা কিংবা এর কন্টেন্ট এর ব্যাপারে আমরা মন্তব্য করছি না।’
উইকিলিকস-এর ফাঁস করা এসব নথি যদি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য হয়; তাহলে এটা হবে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার বিরোধী এই সংস্থাটির সাম্প্রতিকতম সবচেয়ে বড় ধরনের অভ্যুত্থান। সিআইএ’র জন্য এটা একটা গুরুতর চপেটাঘাত; যারা গুপ্তচরবৃত্তির জন্য নিজেদের হ্যাকিং সক্ষমতা বজায় রাখে।
ফাঁসকৃত প্রাথমিক নথিতে উইকিলিকস বলেছে, এটা তাদের হাতে থাকা বিপুল সংখ্যক নথির প্রথম অংশমাত্র।
উইকিলিকস জানিয়েছে, সিআইএ’র পুরো আর্কাইভটি কয়েকশ মিলিয়ন লাইনের কম্পিউটার কোড নিয়ে গঠিত।
উইকিলিকস ঠিক কিভাবে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে বা এর উৎস কি- সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানায়নি সংস্থাটি। তারা শুধু এটুকু বলেছে যে, অননুমোদিত উপায়ে সাবেক সরকারি হ্যাকার ও ঠিকাদার মধ্যে এসব চালাচালি হতো। এই সরকারি হ্যাকার ও ঠিকাদারদের মধ্য থেকেই একজন তাদের সিআইএ’র আর্কাইভের অংশবিশেষ প্রদান করেছে।
উইকিলিকসের দাবি, সিআইএ’র এ সংক্রান্ত নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন। সিআইএ’র হ্যাকিং সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়া ক্ষমতাকে অতিক্রম করেছে কিনা; সে প্রশ্নও তুলেছে উইকিলিকস। এছাড়া সিআইএ সদস্যদের অনিচ্ছাকৃত বা অসাবধানতাবশত ত্রুটিও থাকতে পারে। তাই সাইবার অস্ত্রের নিরাপত্তা, ব্যবহার, এর বিস্তার এবং গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে প্রকাশ্য বিতর্ক শুরুর কথা বলেছে উইকিলিকস।
/এমপি/








