ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন ভূমধ্যসাগরে যাত্রীবাহী বিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতকে হত্যার জন্য এই নির্দেশ দেন শ্যারন। রোনেন বার্গম্যান নামের এক সাংবাদিক তার প্রকাশিতব্য একটি বইয়ে এমনটাই দাবি করেছেন।
বার্গম্যান লিখেছেন, ১৯৮২ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৮৩ সালে জানুয়ারির মধ্যে আরাফাতকে বহনকারী বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমানকে ভূপাতিত করতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। অন্তত পাঁচবার তার নির্দেশে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান প্রস্তুতি নেয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসে এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করেছেন বার্গম্যান। তার প্রকাশিতব্য বইয়ের নাম ‘রাইজ অ্যান্ড কিল ফার্স্ট: দ্য সিক্রেট হিস্টোরি অব ইসরায়েল’স টার্গেটেড অ্যাসাসিনেশনস’। বইটিতে ইয়াসির আরাফাতকে হত্যায় ইসরায়েলের স্পেশাল টাস্কফোর্স গঠন এবং অপারেশন সল্ট ও অপারেশন গোল্ডফিশ নামের দুটি অভিযানের অভিযানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বার্গম্যান লিখেছেন, ইসরায়েলের বিমানবাহিনী বিস্তারিত পরিকল্পনা করে। তারা ভূমধ্যসাগরের একটি অঞ্চলকে নির্বাচিত করে যেখান দিয়ে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল করে। কিন্তু সব সময় রাডার নজরদারি থাকে না কোনও দেশের। সেখানে সাগর প্রায় তিন মাইল গভীর। ফলে সেখানে উদ্ধার অভিযান চালানো কঠিন, প্রায় অসম্ভব।
এই সাংবাদিক আরও লিখেছেন, যখন ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ খবর দেয় যে, আরাফাত প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)-এর সদস্যদের নিয়ে বাণিজ্যিক বিমানে অনেক বেশি যাতায়াত করছেন ফার্স্ট ক্লাস ও বিজনেস ক্লাস কেবিনে। তখন শ্যারন সিদ্ধান্ত নেন এ ধরনের ফ্লাইট ভালো টার্গেট হতে পারে।
বার্গম্যান জানান, শ্যারন নির্দেশ দেওয়ার সময় উপস্থিত থাকা অন্তত তিনজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা তাকে বাণিজ্যিক ফ্লাইটকে টার্গেট করার কথা বলেছেন। তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে, ওই সময় শ্যারনের সহকারী ওদেদ শামির জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত বিমানকে টার্গেট করা হয়েছিল।
বার্গম্যান লিখেছেন, বিমানবাহিনীর কমান্ডারদের ইচ্ছাকৃত হস্তক্ষেপের কারণে শ্যারনের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। শৃঙ্খলাবিরোধী জেনেও বিমানবাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তারা নির্দেশটি পালন করেননি।
ইসরায়েলের সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমোস গিলবোয়া বার্গম্যানকে জানান, তিনি ইসরায়েলের সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাফায়েল এইটানকে এই অভিযান সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছিলেন, যাত্রীবাহী বিমানকে ভূপাতিত করার ঘটনায় আমরা জড়িত জানাজানি হলে আন্তর্জাতিকভাবে ইসরায়েল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইসরায়েলের বিমান বাহিনীর অপারেশন প্রধান অ্যাভিয়েম সেল্লাও জানিয়েছেন, তিনি এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ আটকে দিয়েছেন। তিনি সেনাপ্রধানকে বলেন, আমরা এটা বাস্তবায়নের ইচ্ছা পোষণ করছি না। এটা সহসাই ঘটবে না। আমি বুঝতে পারছি যে, এখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রীই প্রভাবশালী। তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে কেউ সাহস দেখাবে না। ফলে তারা সবাই কৌশলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অসম্ভব করে তুলবে।
১৯৮২ সালের অক্টোবরে অ্যাথেন্স থেকে কায়রোগামী একটি পরিবহন বিমান ইসরায়েলি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান প্রায় ভূপাতিত করে ফেলেছিল। তাদের কাছে খবর ছিল বিমানটিতে আরাফাত রয়েছেন। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে মোসাদ জানায়, আরাফাতের মতো দেখতে তার ছোট ভাই বিমানে রয়েছেন। এরপর থেকেই ইসরায়েলি বিমানবাহিনী কৌশলে হত্যা পরিকল্পনাটি অসম্ভব করে তোলে।
বিমানটিতে সাবরা ও শাতিলা হত্যাযজ্ঞে আহত ৩০ ফিলিস্তিনি শিশু ছিল। লেবানিজ খ্রিস্টানদের হামলায় এই ফিলিস্তিনিরা আহত হন। বৈরুতের এই ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল ইসরায়েলের। পরে ইসরায়েলি তদন্তে ওঠে আসে, অ্যারিয়েল শ্যারন হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় সরাসরি দায়ী ছিলেন এবং পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।
আরাফাতকে হত্যার আরও কয়েকটি ইসরায়েলি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন বার্গম্যান। এরমধ্যে একটি পরিকল্পনা ছিল এক ফিলিস্তিনি বন্দিকে আততায়ী বানানো। ১৯৬২ সালের একটি চলচ্চিত্র ‘দ্য মাঞ্চুরিয়ান ক্যান্ডিডেট’ দেখার পর এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
আরেকটি হত্যার পরিকল্পনা করা হয় আরাফাতের সাক্ষাৎকার নিতে তিন ইসরায়েলি সাংবাদিক যখন লেবাননে সাক্ষাৎ করেন তখন। ইসরায়েলের পরিকল্পনা ছিল সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আরাফাতকে হত্যা করা। তবে সাংবাদিকদের হারিয়ে ফেলায় পরিকল্পনাটি বাতিল করা হয় বলে লিখেছেন বার্গম্যান।
স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনীদের মুক্তি সংগ্রামের নেতা ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যু হয় ২০০৪ সালের ১১ নভেম্বর। ফ্রান্সে চিকিৎসারত অবস্থায় তার মৃত্যুকে এখনও রহস্যজনক মনে করা হয়। যদিও ইসরায়েল আরাফাতের মৃত্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।








