সিরিয়ার যুদ্ধ থেকে লেবাননে পালিয়ে এলেও জীবনযুদ্ধ থেমে থাকেনি মাহমুদ আব্দুল্লাহর। সন্তান আয়েশার চিকিৎসা নিয়ে চিন্তিত তিনি। শরীরে কম্বাইন্ড ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম নামের জটিল রোগ নিয়েই জন্ম শিশুটির। লেবাননে এর কোনও চিকিৎসা নেই। অথচ ছোট্ট আয়েশার জীবন বাঁচাতে বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন খুব জরুরি। হঠাৎ স্বস্তির খবর পান আবদুল্লাহ। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা থেকে জানানো হয়, শিগগিরই যুক্তরাজ্য নিয়ে যাওয়া হবে তাদের। এরপর আশার আলো দেখতে থাকেন আব্দুল্লাহ। ভাবতে থাকেন আগের সন্তান এই অসুখে মারা গেলেও এবার হয়তো সন্তানকে বাঁচাতে পারবেন তিনি।
নভেম্বরে আব্দুল্লাহর পরিবারকে জানানো হয়, ২০ হাজার সিরীয়কে যুক্তরাজ্যে নেওয়া হবে। সেভাবে চলে প্রস্তুতি। বাধ্যতামূলক কিছু কোর্সে অংশ নেন। বেশ কিছু মেডিক্যাল পরীক্ষাও করান। তাদের বলা হয়, ১৪ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে যাবেন তারা। সময় ঘনিয়ে আসতে থাকে, আর আব্দুল্লাহর স্বপ্ন দেখতে থাকেন, সুস্থ হয়ে উঠবে শিশু আয়েশা। কিন্তু নির্ধারিত সূচির ১২ দিন আগে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানায়, তাদের নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়েছে। হঠাৎ করে এমন ঘোষণা মেনে নিতে পারেননি আব্দুল্লাহ। অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে তিনিজানতে চান, কেন এমনটা করা হয়েছে। তারা জানায়, ব্রিটিশ সরকার ফোন দিয়ে তাদের অভিবাসন স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে।
তিনমাস পর আয়েশার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। তার চিকিৎসক জানায়, আয়েশা গুরুতর সংক্রমণের শিকার হয়েছে এবং তার ওজন কমে যাচ্ছে। তার এখন বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন খুবই প্রয়োজন। চিকিৎসক বলেন, ‘তার এখন অস্ত্রোপচার খুব প্রয়োজন। যতই অপেক্ষা করবো। পরিস্থিতি ততই খারাপ হবে।’ তিন মাস বয়স থেকে তিনিই আয়েশার চিকিৎসা করছেন। আব্দুল্লাহ ও তার স্ত্রী আসমা এখন উত্তর খুঁজে চলছেন, কেন তাদের লন্ডন নেওয়া হলো না।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই জানায়, ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কিছু জানা যায়নি। মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ‘সরকার এই শরণার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার সঙ্গেও নিবিড়ভাবে কাজ করি আমি। যুক্তরাজ্যে সিরীয় পরিবার আনার ব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছি আমরা।’
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত সপ্তাহ পর্যন্ত ১০ হাজার সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে যুক্তরাজ্য। আগামী দুই বছরের মধ্যে আরও ১০ হাজার শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সিরীয় শরণার্থীদের জন্য ব্রিটিশ সরকার আরও বেশি করে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারতো।
কিন্তু আয়শার অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তার বাবা-মা এক বছর বয়সী এই সন্তানকে ইমিউনোগ্লোবিন দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এসব চিকিৎসা অস্থায়ী সমাধান মাত্র। তাদের সন্তানের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজন অস্ত্রোপচার আর বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন।
লেবানিজ সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস জানায়, লেবাননের বেশিরভাগ চাকরিদাতাই সিরীয় শরণার্থীদের জন্য চিকিৎসা সুবিধা দিতে চায় না। মানবাধিকারকর্মী মেরি দানায় বলেন, ‘জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ব্যয়বহুল রোগগুলোর ব্যাপারে দায়িত্ব নিতে চায় না। ফলে সিরীয় পরিবারগুলোকে প্রতি তিন সপ্তাহে ৩৯০ ডলার ব্যয় করতে হয়। কিন্তু এটা খুবই কঠিন কারণ তাদের মাসিক আয় ৫০০ ডলার।
এখন পর্যন্ত স্থানীয় এনজিওগুলো চিকিৎসা সহায়তায় এগিয়ে আসছে। আয়েশার বিষয়টি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। ফাতেন নামে এক সিরীয় শরণার্থীও উন্নত বিশ্বে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ না পেয়ে মারা গেছেন। ক্যান্সারে ভুগছিলেন ফাতেন। ২০১৬ সালে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থায় নিবন্ধন করেন তিনি। তার বোন লায়লা বলেন, ফাতেনকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রে সময় লাগতো আটমাস। ফাতেনের জন্য আটমাস অনেক বেশি সময় ছিল। আট মাস পর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় যুক্তরাজ্যে যাওয়ার কথা ছিল ফাতেনের। কিন্তু যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে তার ফ্লাইট বাতিল করা হয়। যুক্তি দেখানো হয়, বিমানভ্রমণের জন্য খুবই দুর্বল তিনি। এর তিনদিন পরই ফাতেন মারা যান।
দানায় বলেন, পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন শিশুও রয়েছে।
চলতি মাসের ৬ ফেব্রুয়ারি আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় আয়েশাকে। চিকিৎসক জানান, তার আর এখন স্বাভাবিক অবস্থা নেই। যেকোনও সময় সেপটিক শকের মতো গুরুতর অবস্থায় চলে যেতে পারে আয়েশা।’ সম্প্রতি বেশ কয়েকবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে সে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার এক মুখপাত্র মিডল ইস্ট আইকে বলেন, তারা আয়েশার ব্যাপারে অবগত এবং সব উপায় খতিয়ে দেখছেন। তিনি বলেন, আইনি প্রক্রিয়ার কারণে বেশি কিছু বলতে পারছেন না, তবে সাধ্যমতো সবকিছু করার চেষ্টা করছেন তারা।
তবে আয়েশার বাবা-মার এখন অপেক্ষা করা সম্ভব না। নিজেরাই সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন। ইতালির রোমের ব্যম্বিনো গেসু হাসপাতালে তাকে নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। তারা বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ইতালি যেতে হলেও তাদের অনেক কাগজপত্র দেখাতে হবে। সেখানেও লাগবে অনেক সময়।
আব্দুল্লাহ এবং ফাতেনের পরিবারের মতো করেই বারবারই আশার আলো দেখার পর প্রত্যাখ্যাত হতে হচ্ছে সিরীয়দের। সর্বশেষ নজির মিলেছে পূ্র্ব ঘৌটায়। গত সপ্তাহ থেকে হঠাৎ করেই বিদ্রোহী দমনের অজুহাতে বিমান হামলা শুরু করেছে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অনুগত বাহিনী। প্রাণ হারিয়েছেন ৫ শতাধিক মানুষ, যাদের অনেকেই বেসামরিক নাগরিক। অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দিলেও আধঘণ্টা পরেই আবার শুরু হয়েছে হামলা। ফলে অসুস্থ ও আহতদের সরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও সম্ভব হচ্ছে না।
ব্রিটিশ মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, সিরিয়ার পূর্ব ঘৌটায় অন্তত ৫২৯ জনকে চিকিৎসার জন্য অন্যত্র সরানো জরুরি। গুরুতর অসুস্থ ২৯ জনকে সরিয়ে নেওয়া হলেও এখন অপেক্ষায় আছেন ৫ শতাধিক। সংস্থটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতি থেকে জানা যায়, পূর্ব ঘৌটায় চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন অন্তত ১৪ জন। ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ৫৭২ জনকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অসুস্থ ও আহতদের যুদ্ধের বাইরে রাখতে হবে। তাদের বিনা শর্তে জরুরি চিকিৎসা দিতে হবে। তবে পূর্ব ঘৌটায় দায়িত্বরত চিকিৎসকরা তাদের চিকিৎসা করতে পারছেন না। কারণ সেখানে নেই পর্যাপ্ত ওষুধ বা চিকিৎসা ব্যবস্থা। বিশেষ করে ক্যান্সার, হৃদরোগ বা ডায়বেটিসের কোনও চিকিৎসা নেই সেখানে।








