মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় আগে ইউরোপ থেকে পাঁচটি উড়োজাহাজ কেনার কথা জানিয়েছে ইরান। দেশটির পতাকাবাহী বিমান পরিবহন কোম্পানি জানিয়েছে, শিগগিরই ফ্রেঞ্চ-ইতালিয়ান বিমান প্রস্তুত কোম্পানি এটিআর-এর পাঁচটি বিমান তেহরানে পৌঁছাবে। শনিবার টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া ঘোষণায় ইরান এয়ার বলেছে, বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী পাঁচটি নতুন এটিআর বিমান রবিবার সকাল নয়টায় (স্থানীয় সময়) মেহরাবাদ বিমানবন্দরে পৌঁছাবে। আগামী ৬ আগস্ট থেকে পুনর্বহাল হবে ইরানের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, এটিআর ইউরোপভিত্তিক কোম্পানি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের ব্যবসা রয়েছে। আর সেকারণেই কোম্পানিটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বছরের পর বছর নতুন বিমান কিনতে পারেনি ইরান। এমনকি কেনা সম্ভব হয়নি পুরনো বিমানগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও। এসব কারণে দেশটির আকাশ পরিবহন ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে বলেও দাবি করে থাকেন অনেকে। ২০১৫ সালে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর ওই বাধা দূর হয়।
২০১৭ সালের এপ্রিলে ইরান এয়ার ২০টি বিমান কিনতে এটিআরের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে ইরান এয়ার। ওই চুক্তির আওতায় এর মধ্যে আটটি বিমান পেয়েছে তারা। নতুন পেতে যাওয়া পাঁচটিসহ চুক্তিতে থাকা সব বিমানগুলোই এটিআর-৭২৬০০ মডেলের।
গত মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করলে হুমকির মুখে পড়ে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি। এতে করে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে যুক্তরাষ্ট্র।
নতুন করে বহাল হতে যাওয়া নিষেধাজ্ঞার প্রথম পর্যায়ে থাকবে অর্থনৈতিক লেনদেন ও কাঁচামাল আমদানি, ইরানের মোটরগাড়ি সেক্টরের ওপর অবরোধ, বাণিজ্যিক বিমান কেনা এবং দেশটির কার্পেট শিল্প। এছাড়া ইরানের তেল ও গ্যাস খাত এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর মার্কিন অবরোধ কার্যকর হবে আগামী নভেম্বরের শুরু থেকে।
ফরাসি অর্থমন্ত্রী ব্রুনো লা মাইরে গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের কাছে আশা প্রকাশ করেন অবরোধ কার্যকর হওয়ার আগে আটটি এটিআর বিমান ইরানকে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে সেটি সম্ভব না হলেও পাঁচটি বিমান পেতে যাচ্ছে ইরান। দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট এই বিমানগুলো যৌথভাবে তৈরি করেছে ফ্রেঞ্চ এয়ারবাস এবং ইতালির লিওনার্দো। তবে তাদের দশ শতাংশ যন্ত্রাংশ তৈরি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ওই দশ শতাংশ যন্ত্রাংশই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ছে।
মার্কিন কোম্পানি বোয়িং এবং ইউরোপের এয়ারবাসও ইরানের এয়ারলাইন্সের সঙ্গে ৩ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলারের বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। কোম্পানিগুলো নিষেধাজ্ঞায় ছাড় পাওয়ার আবেদন করলেও তাতে কর্ণপাত করেনি ওয়াশিংটন। এয়ারবাসের কাছে ১০০ বিমানের আদেশ দিলেও নিষেধাজ্ঞার আগে মাত্র তিনটি দিতে পেরেছে তারা।
ইরান বলছে, নতুন বিমান ও যন্ত্রাংশ কেনার ওপর অবরোধ আরোপ করে ইরানের মানুষদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে।
এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে জার্গস পার্বত্য এলাকায় ৬৬ আরোহী নিয়ে একটি বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইরানের আসিমান এয়ারলাইনস তাদের কাছে থাকা সব এটিআর বিমানের উড্ডয়ন বাতিল করে।
বিমান পরিবহন বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স মাচেরাস আল জাজিরাকে বলেন, ইরানের নিবন্ধিত ১৪টি এয়ারলাইনই যেভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত তা করতে পারছে না। তিনি বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোতে পুরনো বিমানগুলোও উড়তে পারে কারণ তারা কিছু যন্ত্রাংশ কিনতে পারে আর সবসময়ই মেরামতের ওপর রাখা হয়। ইরানে যন্ত্রাংশের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণের কাজও বেশ কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ বেশির ভাগ বিমান কোম্পানিগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়।
মাচেরাস বলেন, ১৯৭৯ সাল থেকে দুই হাজারেরও বেশি ইরানের নাগরিক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় দেশটিতে বিমান পরিবহন ব্যবস্থা কতটা খারাপ অবস্থায় রয়েছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালে বিমান কোম্পানিগুলোই শুধু ইরানের বড় বড় আদেশ হারাবে না বরং এতে দেশটির আকাশ পরিবহন পরিস্থিতিও খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়বে বলেও মনে করেন তিনি।








