সাংবাদিক জামাল খাশোগির নিখোঁজ হওয়াকে কেন্দ্র করে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সৌদি আরব। ইতোমধ্যে সৌদি আরবের বিনিয়োগ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি সম্মেলন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যম। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, তারা ইস্তানবুলে সাংবাদিক খাশোগিকে হত্যার সময়কার অডিও-ভিডিওর রেকর্ডিং হাতে পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বিষয়টি নিয়ে তেমন আগ্রহী না হলেও খোদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চান। আর এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত আলামতে খাশোগিকে হত্যার দায়ে ফেঁসে যেতে পারে সৌদি রাষ্ট্রযন্ত্র। এদিক যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সৌদি সাংবাদিকের নিখোঁজের ঘটনার জন্য সৌদি আরবকে জবাবদিহি করতে বলেছে। তাই খাশোগি ইস্যুতে দেশটি অনেকটা নিসঃঙ্গ হয়ে পড়েছে।
এই মাসের শেষ দিকে রিয়াদে অনুষ্ঠিতব্য দ্য ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ থেকে শুক্রবার নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে বেশ কয়েকটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও তাদের মিডিয়া পার্টনার সংবাদমাধ্যমগুলো। আরও বেশকিছু প্রতিষ্ঠানও সেখান থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করবে বলে মনে করা হচ্ছে। তারা সবাই বলছে, ইস্তানবুলে সৌদি কনস্যুলেট থেকে খাশোগির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় কোনও গ্রহণযোগ্য জবাব না পাওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন।
তুর্কি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের কাছে এমন কয়েকটি অডিও-ভিডিও রেকর্ড রয়েছে, যা থেকে এটা প্রমাণ করা সম্ভব, খাসোগিকে ইস্তানবুলের সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরেই হত্যা করা হয়েছে। কেননা, সেখানে যে কথাবার্তা শোনা গেছে, তা থেকে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ অনুমান করা অসম্ভব কিছু নয়। প্রকাশে অনিচ্ছুক তুর্কি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওই রেকর্ডিংয়ে কনস্যুলেটের ভেতরে আরবিতে কয়েকজনকে কথা বলতে শোনা গেছে। কীভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ, নির্যাতন এবং খুন করা হয়েছে তা আপনি অডিওতে শুনতে পাবেন। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যকাণ্ড।
এদিকে সাংবাদিক জামাল খাশোগি নিখোঁজের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। খাশোগির ভাগ্যে আসলে কী ঘটেছে তা পরিষ্কার করতে সৌদি আরবের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তুরস্কের প্রতি বিষয়টি নিয়ে বিশদ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
খাশোগির তুর্কি বাগদত্তা হাতিস চেঙ্গিস বার্তা সংস্থা এপি’কে শুক্রবার বলেছেন, দূতাবাসে প্রবেশের সময় খাশোগির হাতে অ্যাপেলের একটি ঘড়ি ছিল। আর দূতাবাসে প্রবেশের সময় তিনি তার ফোনটি চেঙ্গিসের কাছে রেখে যান। তদন্তকারীরা তার ফোনটি পরীক্ষা করে দেখছে।
এপির প্রশ্নের লিখিত জবাবে চেঙ্গিস বলেন, ‘তুর্কি কর্তৃপক্ষ তাকে এসব রেকর্ডিংয়ের ব্যাপারে কিছু জানায়নি। তাই খাশোগি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিখোঁজ।’ চেঙ্গিস বলেন, দূতাবাসে প্রবেশের সময় খাশোগি নার্ভাস ছিল না। এছাড়া সেখানে কিছু ঘটতে পারে তিনি এমন কোনকিছু সন্দেহও করেননি। তিনি বলেন, ‘‘সে বলেছিল, তোমার সাথে একটু পর দেখা হচ্ছে প্রিয়তমা’।’’ আর এগুলোই তাকে বলা খাশোগির শেষ কথা ছিল। তারা এই সপ্তাহে বিয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল, তারা বিয়ের পর ইস্তানবুল বা যুক্তরাষ্ট্রের কোথাও বাস করবেন। ২০১৭ সালে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে যাওয়ার পর থেকে খাশোগি এসব স্থানেই বাস করে আসছেন।
খাশোগির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তদন্তে রিয়াদ থেকে একটি প্রতিনিধিদল তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় পৌঁছেছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু বলছে, সৌদি প্রতিনিধিদল যৌথ তদন্তে অংশ নেয়ার জন্য তুরস্কের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সাক্ষৎ করবে। এছাড়া সৌদি আরবের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রিন্স খালেদ আল ফয়সালকে তুরস্কে পাঠিয়েছেন সৌদি বাদশাহ সালমান বিল আব্দুল আজিজ।
সৌদি সূত্রকে উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রিন্স খালেদ আল ফয়সাল বৃহস্পতিবার তুরস্ক সফর করেছেন। খাশোগি নিখোঁজের বিষয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের সঙ্গে আলাপ করেছেন তিনি। তারা বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের সমঝোতায় পৌঁছেছেন বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। আলোচনার পরে তুরস্কের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, রিয়াদের উদ্যোগে দেশ দুইটি এই বিষয়ে যৌথভাবে তদন্ত করতে রাজি হয়েছে। সৌদির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এসপিএর প্রতিবেদনে এক সৌদি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, তাদের অনুরোধে একটি টিম গঠনের বিষয়ে তুরস্কের অনুমোদনকে স্বাগত জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত ধর্মযাজক অ্যান্ড্রু ব্রুনসনকে মুক্তি দিয়েছে তুর্কি আদালত। সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করার পর থেকেই দেশ দুইটির মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। তাকে এভাব হঠাৎ মুক্তি দেওয়ায় এমন সন্দেহ উঁকি দিয়েছে যে, তুরস্ক খাশোগি ইস্যুটি মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাইছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বলেন, খাশোগির নিখোঁজ ঘটনায় তুরস্কের এমন আচরণে সন্দেহ জেগেছে। দেশ দুইটি ঐতিহাসিক শত্রু হওয়ায় সেখানে একই ধরনের আরেকটি ‘অভিযান’ হতে পারে।
সৌদি ব্যবসায় সম্মেলন থেকে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের প্রত্যাহার করে নিলেও মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্টিভ মুচিন তাতে এখনও যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। এই খবরে নতুন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যে, সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এই তদন্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি এই ভয়ংকর পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুতই সৌদি বাদশাহ সালমানকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করবেন। একটি রাজনৈতিক সমাবেশে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘সেখানে কি ঘটেছে আমরা তা খুঁজে বের করতে যাচ্ছি।’
যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি সৌদি আরবের কাছে ১১ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি অনুমোদন করেছে। একই সঙ্গে তুরস্কের সঙ্গেও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই দেশ দুটি সৌদি আরবকে খাশোগি ইস্যুতে সহায়তা করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এসবের মধ্যেই সাবেক ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার ম্যালকম রিফকিন্ড বলেছেন, খাশোগির ঘটনায় দরকার হলে যুক্তরাজ্যের এককভাবে সৌদি আরবের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত। তিনি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি’কে বলেন, ‘যদি বর্তমান যুবরাজ অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের জন্য ক্ষমতায় থাকে, তাহলে যুক্তরাজ্যকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিলে কাজ করতে হবে। যাতে তারা সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ নিতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র এতে আগ্রহী না হয়, তাহলে যুক্তরাজ্যকে এককভাবে এই পদক্ষেপ নিতে হবে যা তাদের নিজেদের নামেই হবে।’
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অধীনে থাকা সৌদি আরবের উচ্চাভিলাষী ‘ভিশন-২০৩০’ ব্যাপক মাত্রায় বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। তবে আগামী মাসের ব্যবসায় সম্মেলন বাধাগ্রস্ত হলে তা সৌদি নীতিনির্ধারকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এর পাশাপাশি মার্কিন কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দেশটির ওপর ভবিষ্যতে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে তাও এই পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটাবে।
কিছু কিছু কোম্পানি বলেছে, ২৩ অক্টোবরের সম্মেলনে তারা যোগ দেবে কিনা তা খাশোগির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করবে। আর কেউ কেউ কোনও শর্ত ছাড়াই সম্মেলন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, তারা সৌদি কর্তৃপক্ষকে আগেই জানিয়েছে যে, তাদের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম সৌদি আরবের ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সম্মেলনে যোগ দেবে না। সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও সিএনএস বলেছে, তারা এই অনুষ্ঠান থেকে তাদের মিডিয়া স্পন্সরশিপ প্রত্যাহার করেছে। এজন্য তারা সেখানে নিয়োজিত সব উপস্থাপককে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গও নিজেদের অনুষ্ঠানটি থেকে সরিয়ে নিয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস দুই দিন আগেই তাদের স্পন্সরশিপ প্রত্যাহার করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্বজুড়ে সৌদি আরবের ওই সম্মেলন বর্জন শুরু হয়েছে। এর মধ্যে আছে আরিয়ানা হাফিংটন, দ্য লা টাইমসের মালিক ড. প্যাটট্রিক সুন শিয়ং ও সিএনবিসি’র উপস্থাপক অ্যান্ড্রু রস সোরকিন।
ব্যবসায়িক জগতের স্যার রিচার্ড ব্র্যানসন ও ভায়াকম তাদের বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। একই কাজ করেছে, সৌদি আরবের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের আংশিক মালিকানা প্রতিষ্ঠান উবার। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী দারা খোসরোশাহী বলেন, উদ্ভুত পরিস্থিতির গ্রহণযোগ্য সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তিনি ওই সম্মেলনে যোগ দেবেন না।
সম্মেলনে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ’র প্রধান ক্রিশ্চিয়ান লাগার্দেকে। তবে আইএমএফ’র মধ্যপ্রাচ্য প্রধান জিহাদ আজৌর তার যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘এখানকার ও সবখানের বেশিরভাগ মানুষের মতো আমরাও এই ঘটনার আরও তথ্য পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি।’
তবে আয়োজকরা এখনও সম্মেলনটি করার কথা বলেছেন। কারণ সম্মেলনটি বাতিল করা হলে যে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে তা বর্তমান বিব্রতকর পরিস্থিতির চেয়েও বেশি কঠিন হবে।








