সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সন্দেহভাজনদের সৌদি আরবেই বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবায়ের। এর আগে খাশোগি হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন ১৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুরস্কের কাছে হস্তান্তর করতে রিয়াদের প্রতি আহ্বান জানান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। তার ওই আহ্বানের জবাবে বাহরাইনে এক সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে নিজ দেশের অবস্থানের জানান দেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সাংবাদিক জামাল খাশোগি সংক্রান্ত কাভারেজে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো উন্মাদের মতো আচরণ করছে বলেও অভিযোগ করেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সন্দেহভাজন খুনিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুরস্কে পাঠানোর দাবির বিষয়ে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এই ব্যক্তিরা সৌদি নাগরিক। তারা সৌদিতে আটক রয়েছে। তদন্ত কাজ চলছে এবং সৌদিতেই তাদের বিচার হবে।
বিবিসি জানিয়েছে, সৌদি কর্মকর্তারা বলছেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডই রিয়াদের জন্য সবচেয়ে বড় আকারের সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০০১ সালের পর থেকে আর এত বড় ধরনের সংকটে নিমজ্জিত হয়নি রাজতান্ত্রিক দেশটি।
এরইমধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস বলেছেন, সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ড মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করেছে। এ খুনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আরও পদক্ষেপ নিতে পারে। শনিবার বাহরাইনের রাজধানী মানামায় এক নিরাপত্তা সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তাদের সামনে দেওয়া বক্তব্যে নিজ দেশের এমন অবস্থানের কথা জানান তিনি।
জিম ম্যাটিস তার বক্তব্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সরাসরি রিয়াদের নাম নেননি। তবে তিনি বলেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইতোমধ্যেই কিছু সৌদি ভিসা বাতিল করেছেন। এর বাইরেও আরও বাড়িত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, শান্তি ও মানবাধিকারের প্রতি আমাদের সমন্বিত শ্রদ্ধাবোধের ফলে কূটনৈতিক স্থানে জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ডে অবশ্যই আমাদের সবাইকে উদ্বেগ প্রকাশ করতে হবে। তবে সৌদি জনগণের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধের কোনও কমতি ঘটেনি। কিন্তু এই শ্রদ্ধাবোধের সঙ্গে ‘স্বচ্ছতা ও বিশ্বাস’ আবশ্যক।
মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের স্থান দখলে নিতে পারবে না বলেও সতর্ক করে দেন জিম ম্যাটিস। তিনি বলেন, মস্কোর অপরিহার্য নৈতিকতার অভাব রয়েছে।
ইতোপূর্বে জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে একাধিকবার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করলেও শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবও স্বীকারোক্তি দিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত। এক সরকারি কৌঁসুলিকে উদ্ধৃত করে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আল-আখবারিয়া টিভি এ খবর দিয়েছে।
তুর্কি বাগদত্তার সঙ্গে বিয়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আনতে গত ২ অক্টোবর ইস্তানবুলের সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশ করার পর নিখোঁজ হন ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার কলাম লেখক ও স্বেচ্ছানির্বাসিত সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি। শুরুতে অস্বীকার করলেও ১৯ অক্টোবর সৌদি জানায়, তুরস্কের ইস্তানবুল কনস্যুলেটে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে খাশোগির মৃত্যু হয়। এর দুদিন পরই খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে বলেও স্বীকার করেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে তাদের দাবি ছিল, জিজ্ঞাসাবাদের সময় ভুলবশত তার মৃত্যু হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সৌদি কর্তৃপক্ষ এই হত্যাকাণ্ডকে পূর্বপরিকল্পিত বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।
সৌদি টিভি চ্যানেল আল-আখবারিয়া জানায়, সৌদি পাবলিক প্রসিকিউটর খাশোগি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য গঠিত সৌদি আরব ও তুরস্কের যৌথ টাস্কফোর্স সূত্রে এই হত্যাকাণ্ডকে পূর্ব পরিকল্পিত বলেছেন। ঘটনা তদন্তে গঠিত সৌদি আরব ও তুরস্কের যৌথ টাস্কফোর্সের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই কৌঁসুলি সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।
সৌদি আরবের ভাষ্যমতে, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গোয়েন্দা সংস্থার উপ-প্রধান এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের দেহরক্ষীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে মোট ১৮ জনকে। তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে জোরালো অভিযোগ উঠেছে, খাশোগির খুনের পেছনে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানই কলকাঠি নেড়েছেন। মঙ্গলবার তুর্কি সংসদে দেয়া ভাষণেও হত্যার পেছনে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। তবে হত্যাকাণ্ডে যুবরাজের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে সৌদি আরব।
তুরস্কের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শুরু থেকেই সে দেশের সংবাদমাধ্যমকে বলে আসছিলেন, খাশোগিকে হত্যা করার পর তার দেহ সরিয়ে দেয়ার জন্য টুকরো টুকরো করা হয়েছে। তাদের কথার প্রমাণ হিসাবে তুর্কি সংবাদমাধ্যমগুলোতে সৌদি টিমের সদস্যদের নাম, ছবি দেয়াসহ বিমানবন্দরে তাদের উপস্থিতি এবং ইস্তানম্বুলে তাদের পদচারণারও তথ্য দিয়েছে। খাসোগি সাজা আরেকজনের সিসি ক্যামেরার ছবিও তারা এ সপ্তাহে প্রকাশ করে। আর এরপরই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেন, এ সাংবাদিককে হত্যা পূর্বপরিকল্পিত এবং এটি যে রাজনৈতিক অপরাধ তার স্পষ্ট প্রমাণ তুর্কি গোয়েন্দারা পেয়েছেন। সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা, রয়টার্স।








