সার্চ ইঞ্জিন জায়ান্ট গুগলে দফতরে নারীদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগে বিশ্বের বিভিন্ন শাখায় ধর্মঘট কর্মসূচি পালন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা। তাদের দাবি নারীকর্মীদের প্রতি প্রতিষ্ঠানের আচরণ পাল্টাতে এবং অভ্যন্তরীণ ‘মীমাংসা’ বন্ধ করতে হবে। এতে করে হয়রানির শিকার হওয়া নারীরা আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, সহকর্মীদের উদ্দেশে লেখা একটি নোট ডেস্কে রেখে বৃহস্পতিবার কর্মীরা কার্যালয় থেকে বেরিয়ে ধর্মঘট পালন করে। এছাড়া ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু সুনির্দিষ্ট দাবিও তুলেছেন গুগলের কর্মীরা।
গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই বলেছেন, কর্মীদের অধিকার নিয়ে এমন অবস্থানকে সমর্থন করেন তিনি। কর্মীদের এক ইমেইলের মাধ্যমে তিনি বলেছেন, ‘আমি আপনাদের ক্ষোভ ও হতাশা বুঝতে পারি। আমিও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমাদের সমাজে অনেকদিন ধরেই এই সমস্যা রয়েছে। আর এখন আমাদের গুগলেও।’
গত সপ্তাহে এক নির্বাহী চাকরি ছেড়ে দেওয়া পর ৯ কোটি ডলার পান। অথচ তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ ছিল। তবে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করা ওই কমর্কতা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মঙ্গলবার চাকরি ছাড়েন সংস্থাটির পরীক্ষাগারের এক কর্মকর্তা। তার বিরুদ্ধেও নারীদের প্রতি বিরুপ আচরণের অভিযোগ ছিল। রিচার্ড দেভোল নামে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ চাকরির সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় তিনি এক নারীর সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক আচরণ করেছিলেন। দেভোল এই ঘটনাকে ভুল বোঝাবুঝি বলে দাবি করেছেন।
এছাড়া যৌন হয়রানির ঘটনায় আরও অন্তত ৪৮ জনকে বরখাস্ত করেছে গুগল। কাউকে দেওয়া হয়নি পেআউটের অর্থ। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে পিচাই বলেন, এই বিষয়ের প্রতিবেদন পড়তে খুবই কষ্ট হয়েছে তার।
জুরিফ, লন্ডন, টোকিও, সিঙ্গাপুর এবং বার্লিনে গুগলের কর্মীরা এই ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার ওয়াক আউট করা কর্মীরা নিজেদের ডেস্কে একটি করে নোট লিখে রেখে যান। ওই নোটে সহকর্মীদের উদ্দেশে লেখা ছিল, ‘আমি ডেস্কে নেই কারণ যৌন নিপীড়ন, অসদাচরণ, স্বচ্ছতার অভাব এবং সবার জন্য কাজ না করা কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতির প্রতিবাদে আমি অন্য গুগল কর্মী ও চুক্তিকারকদের সঙ্গে ধর্মঘট করছি।’
গুগলের ব্যবস্থপনা কর্তৃপক্ষের কাছেও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কয়েকটি দাবি তুলেছেন। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব কর্মীদের নিপীড়ন এবং বৈষম্যের ঘটনায় জোর করে মীমাংসা বন্ধ করতে হবে।
২. বেতন ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
৩. যৌন নিপীড়নের বিষয়ে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
৪. যৌন অসাদাচারণের বিষয়ে বেনামে এবং নিরাপদে রিপোর্ট করতে একটি স্বচ্ছ, অভিন্ন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রক্রিয়া প্রণয়ন।
৫. প্রধান বৈচিত্র্যময়তা কর্মকর্তাকে সরাসরি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে এবং সরাসরি বোর্ড অব ডিরেক্টরের কাছে সুপারিশ করতে পারার ক্ষমতা দিতে হবে।
৬. বোর্ডে কর্মচারীদের প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে হবে।
৭. যৌন নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিষয়ে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ কর্মীদের জন্য জোর পূর্বক মীমাংসা বন্ধ করতে হবে।
সিলিকন ভ্যালির কর্মীদের জন্য জোরপূর্বক মীমাংসা নিয়মিত চুক্তির একটি শর্ত। এর অধীনে যেকোনও ধরনের বিরোধ আদালতের মতো প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে অভ্যন্তরীণভাবে মীমাংসা করা হয়ে থাকে। জোরপূর্বক সালিসের সমালোচকেরা বলে থাকেন, এটা শুধু কোম্পানি ও অভিযুক্তের সুরক্ষাতেই ব্যবহার হয় এমন নয় বরং এতে করে ঘটনার শিকার ব্যক্তি সালিসের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে অথবা অন্য কোনও ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়।
বুধবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে সুন্দর পিচাই বলেন, কিভাবে আমরা আমাদের নীতি এবং প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারি সে বিষয়ে কর্মীরা গঠনমূলক আইডিয়া দিয়েছেন। আমরা তাদের প্রতিক্রিয়াগুলো গ্রহণ করছি যাতে করে এই আইডিয়াগুলোকে কাজে পরিণত করা যায়।
সিলিকন ভ্যালি কোনও কোম্পানিতে এত বড় সমন্বিত পদক্ষেপের ঘটনা অভূতপূর্ব। কিন্তু এই ধর্মঘটে কর্মীদের অ্যাকটিভিজমের ক্রমবর্ধমান আবেগী উদ্দীপনার প্রবণতার অনুসরণ বলে বর্ণনা করেছে বিবিসি। হাস স্কুল অব বিজনেসের প্রফেসর কেইলি ম্যাকএলহানি বলেন, নারীরা হতাশ আর আমার মনে হয় শুধু নারীরা নয়।
২০১৫ সালে হাস স্কুল অব বিজনেসের এমবিএ প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে সূচনা করে একটি আন্দোলন। এর কর্মীরা পরিচিত হয় ‘ম্যানব্যাসাডর’ বা ’পুরুষ মিত্র’ নামে। তাদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রফেসর কেইলি ম্যাকএলহানি বলেন, ‘এদের বাইরেও অনেক ম্যানবাস্যাডর আছে যারা সমানভাবে হতাশ। তারা তাদের অবস্থানের ক্ষমতা এবং কণ্ঠস্বর ব্যবহার করছে তাতে গুগলের টাকা খরচ হচ্ছে। আমি মনে করি, এসব কোম্পানির সেসব জায়গায় আঘাত করতে হবে যেখানে করলে তা ব্যাথা পায়’। তিনি বলেন, গুগলের অন্য অফিসের নারী ও পুরুষ কর্মীরা এই ওয়াক আউট দেখে সাহস পাবে যে তারাও বসে বসে দেখা বা অন্যের সঙ্গে মন্তব্য করে বা ইমেইল আনা নেওয়া বাদ দিয়ে একই কাজ করতে পারে।
গত বছর মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সঙ্গে গুগলের ঘনিষ্ঠ কাজ, সার্চ প্রডাক্ট নিয়ে চীনের বাজারে পুনপ্রবেশ নিয়ে কথা বলেছেন এর কর্মীরা।
সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক পরামর্শক গ্রুপ টেক ওয়ার্কার কোয়ালিশন বলেছে, বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি কোম্পানিতেও একই ধরণের বিষয় ঘটা প্রয়োজন। গ্রুপটির এক মুখপাত্র বলেন, সহমর্মিতা নিয়ে গুগল কর্মীদের পাশে দাঁড়াচ্ছি আমরা। এটা পরিষ্কার যে, নির্বাহীরা আমাদের পক্ষ হয়ে এটা করছেন না, ফলে আমরাই বিষয়টা নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছি।








