শরণার্থীদের ভোটযুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিশ্ব শরণার্থী পরিষদ (ওয়ার্ল্ড রিভিউজি কাউন্সিল)। এজন্য জনতোষণবাদী রাজনীতিকে (পপুলিস্ট পলিটিক্স) দায়ী করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে গিয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে এই বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। শরণার্থী পরিষদ বলছে, জনতোষণবাদী রাজনীতি যে স্থানিকতার বোধ (নেটিভিজম) সৃষ্টি করেছে, তা শরণার্থীদের প্রতি অতীতের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে নেতিবাচক করে তুলেছে। দায়ী রাজনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ দাবি করেছে তারা।
জাতিসংঘের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যূত হওয়া মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ৮৫ লাখ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যা সর্বোচ্চ। এমন বাস্তবতায় অ্যা কল টু অ্যাকশন: ট্রান্সফর্মিং দ্য গ্লোবাল রিফিউজি সিস্টেম শিরোনামে ২১৮ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে শরণার্থী পরিষদ। এ সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের সহ-সভাপতি ও তানজানিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট জাকায়া কিকওয়েতে শরণার্থীদের নিয়ে সৃষ্ট নতুন সংকটকে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা, কর্তৃত্ববাদ, সম্প্রদায়গত বিভেদ, সহিংসতা ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শরণার্থীদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক জনতোষণবাদী রাজনীতির হাতিয়ার হতে দেখা যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম শরণার্থীদের প্রতি ঘৃণা আর বিদ্বেষ ছড়িয়েও দরিদ্র শ্বেতাঙ্গা আমেরিকানদের মন জয় করেছিলেন। সমর্থ হয়েছিলেন ক্ষমতায় আসতে। যুক্তরাজ্যের বিগত নির্বাচনেও কনজারভেটিভ নেতা থেরেসা মে শরণার্থীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছেন প্রচারণারকালে। কিকওয়েতে অভিযোগ করেছেন, ‘অসাধু রাজনীতিবিদরা তাদের ভোট বাড়ানোর জন্য শরণার্থীদেরকে ব্যবহার করছে। যখনই কেউ ভোটারদেরকে বলে তারা (শরণার্থীরা) বিপজ্জনক তখন তারা প্রতিক্রিয়া জানায় আর এতে রাজনীতিবিদরা জনপ্রিয় হয়ে যান।’
শরণার্থী পরিষদ বলছে, একসময় মানবিক প্রতিশ্রুতি বিভিন্ন দেশের সাধারণ নীতি হিসেবে গণ্য হতো। এখন স্থানিকতার রাজনীতির কাছে এই নীতি পরাজিত। ভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষকে নিয়ে ভীতি বৈরিতা বিদ্বেষ আমেরিকা ইউরোপ অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কিকওয়েতে বলেছেন, “অতীতে মানুষ বন্ধুত্বপূর্ণভাবে শরণার্থীদের স্বাগত জানাতো। আর এখন ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের জন্য বিভিন্ন দেশের দুয়ার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারা বলছে, ‘না না তোমরা আসতে পার না’। শরণার্থীরা সমস্যারূপে হাজির হচ্ছে বলে দোষারোপ করা হচ্ছে।’ বিশ্বজুড়ে শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতি সংকট বেড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী সরকারি নেতা, সামরিক কর্মকর্তা, বিরোধী ও বিদ্রোহী নেতাসহ অন্যদেরকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের মুখোমুখি করারও সুপারিশ করেছে শরণার্থী পরিষদ।
বিশ্ব শরণার্থী পরিষদের সভাপতি অ্যাক্সওয়ার্থি বিপন্ন রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, বড় ধরনের বাস্তুচ্যুতির জন্য মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তারা দায়ী। তাদেরকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের মুখোমুখি করার মধ্য দিয়ে জন্য বাস্তুচ্যুতির জন্য দায়ীদের ‘দায়মুক্তি দেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিরোধ’ করা সম্ভব হবে। শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ১৯৫১ সালের শরণার্থী সনদে একটি নতুন প্রটোকলের খসড়া তৈরিরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শরণার্থী পরিষদ প্রস্তাব দিয়েছে, কোনও দেশ যদি রাজনৈতিক কারণে শরণার্থীদের পুনর্বাসিত করতে না চায় তবে খরচ জোগাতে হিমশিম খাওয়া উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তাদেরকে আর্থিক অনুদান দিতে হবে।








