ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক আবদুল কাফি তার ওপর হামলাকারী সাবেক শিক্ষার্থীকে সুরক্ষার জন্য ঘটনার শুরু থেকেই চেষ্টা করে গেছেন। ওই শিক্ষকের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। গত ২৬ জুলাই (শুক্রবার) এক সাবেক শিক্ষার্থী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক কাফিকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যাদবপুরের ছাত্র-শিক্ষকদের অনেকেই অভিযুক্তের কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার পর গ্রেফতার হয় রাজেশ সাঁতরা নামের ওই তরুণ। পরে তাকে নিরাপত্তা হেফাজতে পাঠানো হয়। তবে হামলার শিকার হওয়া শিক্ষক কাফি রবিবার (২৮ জুলাই) স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যাদবপুর থানায় গিয়ে জানান, তিনি চান না ওই প্রাক্তন ছাত্রের কোনও ক্ষতি হোক বা কঠোর সাজার মুখোমুখি হতে হোক তাকে। পরদিন আদালতের এজলাসে উপস্থিত হয়ে ওই শিক্ষার্থীর জামিনও চেয়েছেন তিনি।
হামলার পর গত ২৭ জুলাই (রবিবার) শিক্ষক আবদুল কাফির দেওয়া এক ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা গেছে, ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নেওয়ার আগে থেকেই তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। ২৬ জুলাই হামলার আগে ২০ জুলাই তার ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল রাজেশ। আর তারও আগে অধ্যাপক কাফিসহ তার একজন সহকর্মীকে ফেসবুক মেসেজে হুমকি দিয়েছিলো সে।
প্রথম আক্রমণের ঘটনা ও হামলাকারীকে সুরক্ষার প্রচেষ্টা সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে কাফি লিখেছেন, ‘গত ২০ জুলাই, শনিবার, সকাল আটটার সামান্য পরে রাজেশ আমার বাড়িতে চড়াও হয়। সেখানে প্রথমবার সে আমাকে আক্রমণ করে, আঘাত করে। যদিও পাশের ফ্ল্যাটের লোকজন এসে পড়ায় দ্রুত সে বেরিয়ে যায়। আমি স্বাভাবিকভাবেই হতচকিত হয়ে পড়ি। বন্ধুদের কয়েকজনকে জানাই সে ঘটনার কথা। তারা প্রায় সকলেই বলেন থানায় জানাতে। দুটি কারণে সেদিন আমি পুলিশের কাছে ঘটনাটি জানাইনি। প্রথমত, মায়ের ক্যান্সার ট্রিটমেন্ট এখন মধ্যপথে, এর মাঝখানে এই ঘটনার অভিঘাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার ভয় এবং দ্বিতীয়ত, প্রাক্তন হলেও সে আমার একদা-ছাত্র। তার বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করতে আমার দ্বিধা হচ্ছিল। বরং তার অভিভাবকদের কারও সঙ্গে যদি যোগাযোগ করা যায়, যদি তাদের সঙ্গে একবার কথা বলা যায়, সেই চেষ্টাই আমি করি। কিন্তু কোনওভাবেই তার পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা বা বাড়ির ফোন নম্বর জোগাড় করে উঠতে পারিনি এই কদিনে।’
পরের হামলাটি হয়েছে ২৬ জুলাই। এদিন দুপুরে রাজেশ বাংলা বিভাগে এসে উপস্থিত হয়। প্রথমে বিভাগীয় প্রধানের ঘরে গিয়ে অধ্যাপক শাশ্বত ভট্টাচার্য ও শেখর সমাদ্দারের খোঁজ করে। এরপর বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করে এবং ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
পরবর্তী ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে শিক্ষক কাফি লিখেছেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে চায়ের দোকানে চা খাচ্ছিলাম। আচমকা সে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় এবং বলে, বলুন কী বলবেন’। আমি কিছু বলার আগেই হাত চালায়। চশমার কাচ ভেঙে পড়ে, সামান্য চোখের পাশে এবং ঠোঁটে আঘাত লাগে। এসব সামান্য আঘাত। বলা বাহুল্য, গভীরতর আঘাত লেগেছে অন্যত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষী এবং ছাত্রদের একাংশ এরপর তাকে রেজিস্ট্রার ও প্রোভিসির অফিসে নিয়ে যায়। তাদের ক্ষোভ এবং উত্তেজনা কমাতে চেষ্টা করি আমি তখন। কারণ, অনেকেই তখন মারমুখী, উদ্বিগ্ন, উত্তেজিত। পুলিশ আসে। আমাকে পূর্বাপর ঘটনা লিখে জানাতে বলা হয়। হাসপাতালের প্রাথমিক চিকিৎসার পর আমি সমস্ত ঘটনা লিখিতভাবে জানাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সমিতির বন্ধুরা তখন হাজির হয়েছেন। আমাকে ভরসা দিচ্ছেন। সহমর্মিতা জানাচ্ছেন। পুলিশ অফিসারকে আমি সহ-উপাচার্যের সামনেই অনুরোধ করি, তাকে যেন অত্যাচার না করা হয়, যেন বড় কোনও সাজার মুখে ঠেলে না দেওয়া হয়।’
২৯ জুলাই আবদুল কাফি এজলাসে উপস্থিত হয়ে নিজের আইনজীবী মারফত আদালতে জানান, ছাত্রটি জামিন পেলে তার আপত্তি নেই। তবে পুলিশি হেফাজত থেকে সরাসরি জামিন দেওয়ার আবেদনে সাড়া দেয়নি আদালত। শিক্ষকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার কথা বিবেচনা করে ১৪ দিনের বদলে তাকে দুইদিনের জেল হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এদিনই আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কাফি এবং বাংলা বিভাগের অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করেন রাজেশের বাবা-মা এবং দিদি। বেশ খানিকক্ষণ শিক্ষকদের সঙ্গে কথা হয় তাদের।
সূত্রকে উদ্ধৃত করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই সময় জানায়, শিক্ষকদের সঙ্গে সাক্ষাতে অবসাদগ্রস্ত ছেলেকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বাবা-মা। অধ্যাপক কাফির কাছে ক্ষমাও চান তারা। তবে রাজেশ কেন এমন কাজ করলেন, সে ব্যাপারে তাদের জানা নেই বলে উল্লেখ করে পরিবার। কাফিকে রাজেশের বাবা জানান, ছাত্র থাকাকালীন কাফি সম্পর্কে ছেলের কাছে তিনি প্রশংসাই শুনেছেন বারবার। কাফি বলেন, ‘রাজেশের প্রতি আমার কোনও আক্রোশ কাজ করছে না। বরং ওর সুস্থতাই আমি চাইছি। কেন সে এই কাজ করলো, সেটা খুঁজে বের করাই আসল।’







