করোনা মহামারি ও তুমুল বেকারত্ব পরিস্থিতির মধ্যে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। এদিন কী ঘটতে যাচ্ছে তার দিকে তাকিয়ে আছে গোটা দেশ। অন্যবারের তুলনায় এবার বেশি সংখ্যক মানুষ মানসিক চাপে ভুগছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয় মেনে না নেওয়ার আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে মনে করা হচ্ছে, নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়তে পারে। নষ্ট হতে পারে গণতন্ত্রের পরিবেশ। সহিংস পরিস্থিতিতে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে অনেকে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন। বেড়েছে অস্ত্র বিক্রির পরিমাণও।
বিগত প্রায় ৬ মাস ধরেই ট্রাম্প নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি করে আসছেন। অজুহাত আকারে হাজির করছেন ডাকযোগে ভোটকে (মেইল-ইন ভোট)। যুক্তরাষ্ট্রে সাপ্তাহিক কর্মদিবসে নির্বাচন হয় বলে অনেক মানুষ সশরীরে ভোট দিতে পারেন না৷ কাজের সূত্রে দূরে থাকার কারণে কারও কারও ভোট দিতে সমস্যা হয়৷ এমন সব মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে সে দেশে ডাকযোগে ব্যালট পাঠানোর বিধান রয়েছে৷ এবার করোনাভাইরাস মহামারির প্রেক্ষাপটে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে মেইল-ইন ভোটের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেওয়া হলেও ট্রাম্প শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করছেন। এমন অবস্থায় নির্বাচনে ট্রাম্প পরাজিত হলে সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর তা নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মনে।
এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সোমবার (২ নভেম্বর) ডাউনটাউন ওয়াশিংটনকে দেখে মনে হচ্ছিলো অবরোধের প্রস্তুতি চলছে সেখানে। সাধারণত শহরের সড়কগুলো ব্যস্ত থাকলেও এদিন সেগুলো ফাঁকা ছিল। দোকানপাটের সামনের অংশ প্লাইউডের বোর্ডে ঢেকে ফেলা হয়েছে। মোটামুটি রকমের ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়েছিল এটি। গহনার দোকানের প্রদর্শনী তাক থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে নেকলেস। ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা জো বাইডেনকে সমর্থনকারী টি-শার্টগুলো বিক্রি না হয়ে একটি স্যুভেনির দোকানের তাকেই থেকে গেছে। বোর্ডে ঢাকা জানালায় বড় প্রতীক দিয়ে নিজেদের খোলা থাকার জানান দিচ্ছে দোকানগুলো।
সোমবার গুগল সার্চেও ‘সিটি’জ বোর্ডিং আপ ফর ইলেকশন’-এর আধিপত্য দেখা গেছে। এছাড়া ‘ইলেকশন ডে রায়টস’কেও সেরা দশ সার্চিং-এর মধ্যে থাকতে দেখা গেছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জনে ৬ জন ভোটার মনে করছেন দেশ ভুল পথে আছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ লে অফের আশঙ্কায় আছেন। কারণ, দেশের অর্থনীতি দুর্দশার মধ্যে আছে এবং বেকারত্ব সুবিধা চাওয়া মানুষের সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক মনোবিজ্ঞানী লরি পল বলেছেন, নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক হারে উদ্বেগ বেড়েছে। রাজনৈতিকভাবে মিশ্র পরিবারগুলোতে সম্পর্কের টানাপড়েন দেখা গেছে। তিনি বলেন, ‘কতটা ভীতি আর উদ্বেগ অনুভূত হচ্ছে এবং এভাবে কাজে মন দেওয়াটা কতটা কঠিন সেসব কথাই বলছে তারা।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এমন সময়ে হচ্ছে, যখন কিনা সে দেশে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। আর বর্ণবাদী অস্থিরতা তো আগে থেকেই চলছিলো। পল এবং অন্য মনস্তাত্ত্বিকরা একে ডাকছেন মানসিক চাপের ‘ট্রিপল প্যানডেমিক’ বলে-সেগুলো হলো, ভাইরাস, নির্বাচন ও বর্ণবাদী অস্থিরতা (বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য)।
মনস্তাত্ত্বিক ও ডি.সি. সাইকোলোজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি স্টিফেন স্টেইন জানান, ২০ বছরে যাদের নিয়ে কাজ করেননি, সেসব মানুষরাও পরামর্শ চেয়ে তাকে ফোন দিচ্ছে। স্টেইন বলেন, ‘এ তিনটি ইস্যুই এখন একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে এবং ভয় ও বিচ্ছিন্নতার একটি মিশ্র অনুভূতি তৈরি করছে।’
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন নির্বাচন তাদের মানসিক চাপ বাড়ার একটি উল্লেখযোগ্য উৎস। ২০১৬ সালে এভাবে চিন্তা করার কথা জানিয়েছিল ৫২ শতাংশ মানুষ। ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যেও আলাদা করে এ নিয়ে মানসিক চাপের অনুভূতি রয়েছে। ৭৬ শতাংশ ডেমোক্র্যাট, ৬৭ শতাংশ রিপাবলিকান ও ৬৪ শতাংশ স্বতন্ত্র সমর্থক নির্বাচন সংশ্লিষ্ট চাপ বোধ করার কথা জানিয়েছেন।
অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আর্থার ইভান্স জুনিয়র বলেন, ‘এবারের মতো পরিস্থিতি অতীতে কখনও হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না।’
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্ট ও মিলিশিয়া ওয়াচ-এর গবেষকরা গত সপ্তাহে একটি যৌথ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশজুড়ে মিলিশিয়াদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা জানানো হয়েছে সেখানে। ফ্যাসিবাদ ও বর্ণবাদবিরোধী বামপন্থী গ্রুপগুলো প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরইমধ্যে নির্বাচনের রাতে হোয়াইট হাউজের কাছে বড় সমাবেশ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে একটি সংগঠন। তারা বলছে, ‘গণতন্ত্রের সুরক্ষায় যা কিছু করা দরকার তা করতে তারা প্রস্তুত’।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এখন প্রচণ্ড ভয় ও উদ্বেগ কাজ করছে, বিশেষ করে ২০১৬ সালের আকস্মিক পরাজয়ের ভয় এখনও রয়ে গেছে ডেমোক্র্যাটদের। এবারে তাদের ভয় হলো ট্রাম্প এবং তার সমর্থকেরা ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহিংসতা কিংবা অন্য বেআইনি উপায় ব্যবহার করতে পারে।
জরুরি পরিস্থিতির জন্য মানুষকে তৈরি হতে সাহায্য করা ওয়েবসাইট দ্য প্রিপেয়ার্ড.কম-এর ডেপুটি এডিটর জন স্টোকস জানান, কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকা এবং নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সময়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়তে (তাদের ওয়েবসাইট সম্পর্কে) দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘চারপাশের সবকিছু নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ বাড়তে দেখেছি।’ মহামারির প্রাথমিক সময়ে ওয়েবসাইটটির ট্রাফিক ব্যাপক বেড়ে যায়। ওই সময়ে মানুষ খাবার ও নিত্যপণ্য মজুতের বিষয়ে তথ্য খুঁজতে শুরু করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আগ্রহী মানুষেরা বাড়ির প্রতিরক্ষা ও আগ্নেয়াস্ত্র মজুত নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। স্টোকস বলেন, আমার মনে হয় আগ্নেয়াস্ত্রের বিষয়গুলো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বিগত কয়েক মাস ধরেই আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির পরিমাণ আকাশ ছোঁয়া। এফবিআই’র সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী অক্টোবরে অস্ত্র কিনতে চাওয়া ৩৩ লাখ মানুষের প্রাক-পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। বিগত পাঁচ বছর ধরে একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল গড়ে ২১ লাখের মতো।
পেনসিলভানিয়ার ডেলাওয়ার কাউন্ট্রিতে বসবাস করেন দুই সন্তানের মা ৫৪ বছর বয়সী বেথ ডেবরুয়িন। শুক্রবার তিনি জানান, সবকিছু ঠিকঠাকভাবে শেষ হওয়ার জন্য বাইডেনের একটি ‘অনস্বীকার্য জয়’ দরকার বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘কোনও নির্বাচনের আগেই আমার এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। প্রচণ্ডে চাপের। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে আমি নির্বাচনের অপেক্ষা করতেও পারছি না।’
পেনসিলভানিয়ার ম্যাককিসপোর্টের ৬১ বছর বয়সী বাসিন্দা ডেভ লিটকো ২০১৬ সালে ভোট দেননি। তবে এই বছর তিনি বাইডেনকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ট্রাম্প এমন পথে আগাচ্ছেন, যাতে ভয় হচ্ছে তিনি আজীবন প্রেসিডেন্ট থাকতে চান।
জর্জিয়ার আলফারেত্তা এলাকায় বসবাস করেন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ৭০ বছরের কেন্নেথ বার্টন জুনিয়র। তিনি বলেন, কে জিতলো সেটা বিষয় নয় কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে যে বর্ণবাদী উত্তেজনা তৈরি হয়েছে তা থেকে বের হতে বহু বছর লাগবে। বাইডেনের সমর্থক কৃষ্ণাঙ্গ বার্টন উগ্র ডানপন্থী একটি গ্রুপের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “অবাক হইনি যে এখান থেকে ‘প্রাউড বয়েস’-এর মতো মানুষ বের হয়েছে। অবাক লেগেছে যেটা সেটা হলো তারা সংখ্যায় এত বেশি আছে সেটা বুঝিনি।”
বেশ কয়েকটি রাজ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশের পাশাপাশি ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন রাখা হয়েছে। আর ডেনভারের মতো কয়েকটি শহর কর্তৃপক্ষ নাগরিক বিক্ষোভের জন্য প্রস্তুতি নিতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট জানায়, তারা নিজেদের তাক থেকে সব অস্ত্র ও গোলাবারুদ বের করে রাখছে। তবে শুক্রবার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে বলেছে, আশা করা হচ্ছে কোনও অশান্তি তৈরি হলে তা ভূ-রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হবে।
সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলো এবং বিশ্বের সহিংস এলাকায় কাজ করা অলাভজনক সংস্থা দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রে অশান্তির উপাদান বিদ্যমান রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচকরা মেরুকরণের মধ্যে রয়েছে, উভয় পক্ষের কাঠামোয় থাকায় সহিংস সংগঠকরা নির্বাচনি প্রক্রিয়া বিঘ্নিত করতে পারে এবং দীর্ঘ প্রতিযোগিতার আশঙ্কা রয়েছে।’
তবে ট্রাম্পের সমর্থকদের আগাম উদ্বেগ হলো ডেমোক্র্যাটরা দেশকে সমাজতন্ত্র কিংবা কমিউনিজমের পথে নিয়ে যেতে পারে। যদিও বিগত চার দশক ধরে বাইডেনের রেকর্ড মধ্যপন্থার।
অ্যারিজোনার ফনিক্স এলাকায় ‘সমাজতন্ত্র থেকে দূরে থাকুন’ লেখা টিশার্ট পরে ট্রাম্পের সমাবেশে যোগ দেওয়া ৫৩ বছর বয়সী মাইকেল বাইয়েদা বলেন, ‘আমি মনে করি কমিউনিজম সাপ হয়ে আজকের দিনের রাজনীতিতে বিদ্যমান, সাধারণত ডেমোক্র্যাটদের তরফে।’
মনোবিজ্ঞানী পল জানান, তিনি সাধারণত উদ্বিগ্ন রোগীদের বিপর্যয়কর প্রবণতার বাইরে রাখার চেষ্টা করেন। তবে সমাজে যখন ভাঙন নিকটবর্তী হতে দেখা যায় তখন সেই কাজটি জটিল হয়ে ওঠে বলে জানান তিনি। এই মনোবিজ্ঞানী বলেন, আমার মনে হচ্ছে এসব উদ্বেগের বহু অংশ বাস্তব, ফলে আমাকে সত্যিকারভাবেই কৌশল বদলাতে হবে।
পল জানান, যখন কোনও রোগী বলেন যে নির্বাচনের আগের রাতে তাকে তার গাড়ির গ্যাস ট্যাংক পূর্ণ রাখা নিশ্চিত করতে হবে, তখন তার মনে হয় এটা খুব খারাপ পরিকল্পনা নয়, তার নিজেরও এটা করা উচিত।








