আইলোরে লন্ডনের গাড়ি, পাসপোর্ট কর তাড়াতাড়ি! এমন ছন্দময়তা যেন নিরেট বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে বাংলাদেশে। বিশেষত দ্বিতীয় লন্ডন খ্যাত বৃহত্তর সিলেটে যুক্তরাজ্যের স্টুডেন্ট ভিসাকে কেন্দ্র করে রাতারাতি গড়ে উঠছে বিভিন্ন আইইএলটিএস কোচিং, ট্রাভেল এজেন্সিসহ সংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠান।
ইউকেবিএ (ইউকে বর্ডার এজেন্সি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ছয় লাখ পাঁচ হাজার ১৩০ জন যুক্তরাজ্যে স্টুডেন্ট ভিসা পান। এরমধ্যে এক লাখ ৫২ হাজার ৯০৫ জন ইউরোপ থেকে আসা। বাকি চার লাখ ৫২ হাজার ২২৫ জন ইউরোপের বাইরে থেকে আসা।
২০২১ সালে চার লাখ ২৪ হাজার ৪২৪ জন যুক্তরাজ্যের স্টুডেন্ট ভিসা পেলেও মোট ভিসাপ্রাপ্তদের মাত্র ৯ শতাংশ অর্থাৎ মাত্র ২০ হাজার ৭৭৫ জন ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থী। বাকি ৯১ শতাংশের বড় অংশই ছিল বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে।
২০২১ সালে ব্রিটেনের স্টুডেন্ট ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা ছিলেন সবচেয়ে এগিয়ে। ২০১৯ সালে মাত্র এক হাজার ৯৮১ জন বাংলাদেশি স্টুডেন্ট ভিসা পেলেও ২০২১ সালে তা ৪১০ শতাংশ বেড়ে ১০ হাজার ৯০ জন বাংলাদেশি ভিসা পান। ভিসা প্রাপ্তির তালিকায় আগের চেয়ে ৩৪৭ শতাংশ বেড়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছিল নাইজেরিয়া এবং ২৭০ শতাংশ বেড়ে তৃতীয় ছিল পাকিস্তানি শিক্ষার্থীরা।
২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত ডিপেডেন্টসহ ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৮৬৪ জন ব্রিটেনের স্পন্সরড স্টাডি ভিসা পান।
রেমিট্যান্স ব্যয়
প্রত্যেক শিক্ষার্থী পিছু ডিপেন্ডেন্টসহ গড়ে বছরের অর্ধেক হলেও ন্যূনতম ৭ হাজার পাউন্ড টিউশন ফি, বিমান টিকিট ও আনুষঙ্গিক খরচ হচ্ছে। বছর খানেক আগেও ঢাকা-লন্ডন রুটের আসা-যাওয়ার এয়ার টিকিটের দাম যেখানে ছিল গড়ে এক লাখ টাকা, এখন সেখানে একপথের বা ওয়ানওয়ে টিকিটের দাম পৌঁছেছে প্রায় দুই লাখ টাকায়। বছরে কমপক্ষে ১০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ব্যয় হচ্ছে কমপক্ষে সাত কোটি পাউন্ড।
এ ব্যাপারে ইমিগ্রেশন পরামর্শক অ্যাডভোকেট বিপ্লব কুমার পোদ্দার বলেন, ব্রিটেনে থাকা, খাওয়া ও ভার্সিটির ফি মেটানোই শিক্ষার্থীদের জন্য যেখানে দুরূহ ব্যাপার, সেখানে দেশে টাকা পাঠানো অনেকের জন্য অসম্ভব।
পূর্ব লন্ডনের ব্যবসায়ী নাসির আহমদ শাহিন বলেন, বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ফির অর্ধেক টাকা পরিশোধ করে আসেন। বাকি টাকা এ দেশে এসে পরিশোধ করা অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৯ বা ২০১০ সালের মতো পরিস্থিতি সামনে সৃষ্টি হতে পারে, এমন উদ্বেগ জানিয়ে শাহিন বলেন, স্টুডেন্টরা আগে যেভাবে পর্তুগাল বা ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশে বেরিয়ে যেতেন বসবাসের বৈধতার প্রয়োজনে, এখন সেই হার একেবারেই কমে গেছে। ব্রিটেনে ওয়ার্ক পারমিটসহ অন্য ভিসায় সুইস করার সুযোগ থাকলেও ওয়ার্ক পারমিট ভিসার জন্য জনপ্রতি দিতে হচ্ছে ন্যূনতম ১৫ হাজার পাউন্ড। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আবাসন সংকট তীব্র হয়ে ওঠায় ছাত্ররা থাকার জায়গার জন্য সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
রিজভী আহমেদ নামে সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটির একজন ছাত্র শনিবার (২৩ অক্টোবর) বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, লন্ডনে থাকলে মাসে থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতে কমপক্ষে একজন ছাত্রের ১১শ’ থেকে ১২শ’ পাউন্ড খরচ হয়। লন্ডনের বাইরে থাকলে খরচ দুইশ পাউন্ড কম লাগে। কিন্তু লন্ডনের বাইরে কাজও কম।
সম্প্রতি ব্রিটেনের ক্যাবিনেট অফিস মিনিস্টার ও হোম অফিস মিনিস্টার স্টুডেন্টদের সঙ্গে আসা ডিপেন্ডেন্ট ভিসা হ্রাস করার পক্ষে একযোগে কথা বলছেন। সুয়েলা এর আগেও ব্রিটেনে বিপুল সংখ্যক স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
শাফি আহমেদ নামের একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগে দুই বা তিন দিন থাকলেও এখন বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে চার থেকে পাঁচ দিন ক্লাস। ফলে কাজের সুযোগ খুব সীমিত হয়ে এসেছে। লাখ লাখ ছাত্র আসায় কাজের সুযোগ কমে গেছে। ব্রিটেনজুড়ে ঘর ভাড়া বেড়েছে কয়েকগুণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিকালীন সময় সপ্তাহে আশি নব্বই ঘণ্টা অমানুষিক শ্রমের টাকা দিয়ে ভার্সিটির ফি জোগান দিয়ে যাচ্ছি।
শাফি জানান, বাংলাদেশ থেকে আসা সিংহভাগ ছাত্রই ওয়ার্ক পারমিটে সুইচ করার চেষ্টা করছেন। কারণ থাকা খাওয়ার পর বছরে ১৪-১৫ হাজার পাউন্ড টিউশন ফি রোজগার করে পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। অনেকে দেশেও ফিরে যাচ্ছেন।
বৈধ কাগজপত্রহীনদের বৈধতা
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন লন্ডনের মেয়র থাকাকালে এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালের জুলাইতে দেশটিতে বসবাসরত প্রায় এক লাখ বৈধ কাগজপত্রবিহীন বাংলাদেশিসহ পাঁচ লক্ষাধিক অনথিভুক্ত অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। অনথিভুক্ত কর্মীদের বৈধভাবে কাজের সুযোগ দেওয়া হলে তাদের উপার্জন দেশটির অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু বরিস জনসন ক্ষমতায় থাকাকালে নতুন করে ওয়ার্ক পারমিট ভিসার শর্ত শিথিল করে নতুন করে কর্মী আনার পক্ষে পদক্ষেপ নেন। তাই এটি এখন স্পষ্ট যে বৈধ কাগজপত্রবিহীনদের বৈধতা দেবার পরিকল্পনা সরকারের নেই। কেননা, ব্রিটেনের অর্থনীতির সূচক আর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো, ছয় লক্ষাধিক মানুষকে বৈধতার কাগজপত্র দেবার সদিচ্ছা থাকলে নতুন করে কম দক্ষ, অদক্ষ বিদেশি কর্মী আনার সুযোগ খুলে দিতো না সরকার। আর অভিজ্ঞতাহীন ছাত্রদের ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় সুইচ করার সুযোগ সহজ করা হলেও যারা দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে এ দেশে কর্মরত তাদের বঞ্চিত রাখা হয়েছে কাগজপত্রের বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে। ছয় লক্ষাধিক মানুষকে বৈধভাবে কাজের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি নতুন বিদেশি কর্মীদের কাজের ক্ষেত্র এই মুহূর্তে ব্রিটেনে সেভাবে নেই।
ব্রিটেনের অর্থনীতির সব সূচক পড়তির দিকে। নিজ দেশে লাখ লাখ কর্মী যখন বেকার, তখন ওয়ার্ক পারমিট আর স্টুডেন্ট ভিসায় লাখ লাখ ভিসা দেওয়ার ব্যাপারটিকে স্রেফ ব্যবসা হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। তারা বলছেন, বিভিন্ন ভিসায় ব্রিটেনে যারা আসছেন, তাদের আয়ের বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে ভিসা টিকিয়ে রাখতে ভার্সিটির ফি-সহ বিভিন্ন খরচ, ট্যাক্সসহ নানা খাতে। তাদের আয় করা টাকাগুলোর বড় অংশ যাতে ঘুরেফিরে সরকারের হাতে ফিরে যায়, সেই রকম কৌশল রেখেই পয়েন্ট বেইজড ভিসা সিস্টেম প্রতিনিয়ত আপডেট করা হচ্ছে। ওয়ার্ক পারমিট ভিসার ক্ষেত্রেও সরকারের বেঁধে দেওয়া ন্যূনতম আয়সীমার শর্ত পূরণে অনেকে কাজ না করেও সরকারের ট্যাক্স পরিশোধে বাধ্য হন, বৈধভাবে দেশটিতে থাকার সুবিধার আশায়। এমন ঘটনা অতীতে হরহামেশাই দেখা গেছে। ঘটেছে একই ওয়ার্ক পারমিট একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি, ওয়ার্ক পারমিটে মানুষ আনার পর কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়ার প্রতারণাও।
শাহানুর খান নামে এক শিক্ষার্থী জানান, ভার্সিটিগুলো বকেয়া টাকার জন্য হোম অফিসকে ভিসা বাতিলের চিঠি দেবার হুমকি দিচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী প্রথম দিকের কোর্সগুলো পাস করতে পারলেও একেবারে শেষের দিকে এসে একটি বা দুটি কোর্সে বারবার ফেল করছেন। তাতে স্টাডি ওয়ার্ক ভিসায় কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
গত ২ বছরে কতজন শিক্ষার্থী স্টুডেন্ট ভিসায় বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে এসেছেন, তাদের মধ্যে অনিয়মিত কত জন, এরকম কোনও তথ্য কী হাইকমিশনের কাছে আছে? এমন প্রশ্নের জবাবে লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার আশিকুন নবী চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কতজন ছাত্র বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, কতজন নিয়মিত, এ সংক্রান্ত কোনও তথ্য আমাদের কাছে নেই। লন্ডন থেকে কতজন ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে গেছেন, আমরা সেই তথ্য দিতে পারবো। সাধারণত, কাউকে ডিপোর্ট করার প্রক্রিয়ায় ইউকেবিএ স্ব-স্ব দেশের অ্যাম্বাসির সঙ্গে যোগাযোগ করে।
ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠানন স্টাডি এইডের কর্ণধার আহমদ বখত চৌধুরী রতন প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশে যাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা ব্রিটেনে পড়তে আসছেন না। যারা দেশে ভালো কিছু করতে পারছেন না তারাই ব্রিটেনমুখী হচ্ছেন। কোর্স ফির জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের চাপ দিচ্ছে সেটি খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কারণ, আপনি আসার আগে দেশের ব্যাংক স্টেটমেন্ট ভার্সিটিকে দেখিয়ে এসেছেন। এরমধ্যেও অনেকে ভালো রেজাল্ট করে ভালো চাকরি পাচ্ছে।
লন্ডনের বাঙালিপাড়ার স্বনামখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যথাযথ ইংরেজি না জেনে যারা আসছেন তারা দুর্ভোগে পড়ছেন।
কেন ব্রিটেনে পড়তে এসেছেন, এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার এমন প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। এ রকম কয়েকটি ক্ষেত্রে এয়ারপোর্টে অ্যান্ট্রি ক্যান্সেল বা ভিসা বাতিলের ঘটনাও ঘটেছে। ইংরেজি সাহিত্য পড়তে এসেছেন অথচ শেক্সপিয়রের সম্পর্কে ন্যূনতম কিছু বলতে পারছেন না এমন ঘটনা ঘটছে। অনেকে স্টুডেন্ট ভিসার নামে ইকোনমিক মাইগ্রেন্ট হিসেবে আসতে চাইছেন।
তারেক চৌধুরী বলেন, স্টুডেন্ট ভিসার মাধ্যমে অবশ্যই এখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা করছে। যারা ওয়ার্ক পারমিটে সুইচ করেছেন তারা তুলনামূলক ভালো আছেন। তবে ওয়ার্ক পারমিট কেনাবেচা সম্পূর্ণ বেআইনি। ওয়ার্ক পারমিটে সুইচের আগে কোম্পানি সম্পর্কে জেনে বুঝে আসা উচিত।









