সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর সেদেশের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেছে ইরান। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সোমবার (২৫ নভেম্বর) জানান, সিরিয়া ও ইরানের মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক এড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বে হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) নেতৃত্বাধীন জোটের আকস্মিক বিজয় মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক প্রজন্মের মধ্যে অন্যতম বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় আরব বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের একটি ঘাঁটি হারিয়েছে ইরান ও রাশিয়া।
আসাদের পতনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশিত বিবৃতিতে ইরান আশা প্রকাশ করে যে সিরিয়ার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পূর্বের মতোই অব্যাহত থাকবে। তেহরান একটি "সমন্বিত সরকার" গঠনের আহ্বান জানায়, যেখানে সিরিয়ার সকল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
সিরিয়ার ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন অবস্থায় রয়েছে ইরান। বিশেষত দেশটিতে তাদের প্রভাব ধরে রাখা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দেশটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছে, সিরিয়ার নতুন শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে ইরানের সঙ্গে আদর্শগত সাদৃশ্য রয়েছে এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করছে তেহরান।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ইরানের প্রধান উদ্বেগ হল আসাদের উত্তরসূরি সিরিয়াকে তেহরানের প্রভাববলয়ের বাইরে নিয়ে যেতে পারেন কি না। এটি একটি পরিস্থিতি যা এড়াতে ইরান প্রবলভাবে চেষ্টা করছে। কারণ তাদের মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্কের অর্থ হবে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর স্থলপথে রসদ সরবরাহের একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ইরানের জন্য ভূমধ্যসাগর ও ইসরায়েলের ফ্রন্ট লাইনের প্রবেশাধিকারের সুযোগ হারানো।
এদিকে, দুই ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অপসারণকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধির জন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর মাধ্যমে ইরানকে কোনও ছাড় দিতে বাধ্য করা বা ইসলামিক রিপাবলিককে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে তেহরান।
২০১৮ সালে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে সম্পাদিত ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন ট্রাম্প। এরপর থেকে তিনি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যা দেশটির অর্থনীতিকে সংকটাপন্ন করে তোলে।
২০২০ সালে ট্রাম্পের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হন ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক নেতা ও বিদেশি অভিযান পরিকল্পনার মূল ব্যক্তি, কাসেম সোলাইমানি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলি ভায়েজ বলেন, ইরানের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে: ইরাকের মাটিতে একটি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নেওয়া বা ট্রাম্পের সঙ্গে একটি চুক্তি খুঁজে নেওয়া।
আসাদের পতনে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং গাজায় হামাসের ওপর ইসরায়েলের সামরিক আক্রমণ ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা আরও দুর্বল করেছে।
২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আসাদকে টিকিয়ে রাখতে ইরানের শাসকরা কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন। সিরিয়ায় রেভ্যুলুশনারি গার্ডস মোতায়েনের মাধ্যমে আসাদকে ক্ষমতায় ধরে রাখার চেষ্টাও করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তেহরানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী 'প্রতিরোধের অক্ষ'।
তবে আসাদের পতনে ইরানের প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সিরিয়া ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনপথ ছিল, যার মাধ্যমে তেহরান তার প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্র সরবরাহ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করত। বিশেষ করে, এটি হিজবুল্লাহর জন্য একটি প্রধান রসদ সরবরাহের পথ হিসেবে কাজ করত।








