প্রায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় থাকার সাংবিধানিক বন্দোবস্ত করে ফেলেছেন এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে। দেশটির সংবিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে অন্তত ২০৩৩ সাল এবং সম্ভব হলে তারপরও বহাল তবিয়তে স্বপদে থাকবেন তিনি। তবে সমালোচকরা বলেছেন, ক্ষমতায় থাকার জন্য বুকেলে দীর্ঘদিন ধরেই তোড়জোড় করে আসছিলেন।
২০১৯ সালে ক্ষমতায় এসেছেন বুকেলে। প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়ার প্রথম বছরেই সশস্ত্র সেনা নিয়ে দেশের পার্লামেন্টে প্রবেশ, পরের বছর দেশের সুপ্রিম কোর্টের সর্বোচ্চ বিচারক এবং অ্যাটর্নি জেনারেলকে নিজের অনুগত ব্যক্তিদের দিয়ে প্রতিস্থাপন, সংবিধান নিয়ে নিজের বিচারকদের সংবিধান পুনর্ব্যাখ্যার ভিত্তিতে দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া- সবই ছিল তার দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতা সুসংহত করার আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত।
কফিনের সর্বশেষ পেরেকটি ঠোকা হয় বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই)। ক্ষমতাসীন নিউ আইডিয়াস পার্টির প্রায় অপরিচিত এক আইনপ্রণেতা সেদিন প্রেসিডেন্ট পুনর্নির্বাচনের মেয়াদকাল অনির্দিষ্ট করতে সংবিধান সংশোধনের অচিন্তনীয় এক প্রস্তাব করে বসেন, যা অদ্ভুত তৎপরতার সঙ্গে অনুমোদন করে পার্লামেন্ট।
সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী প্রস্তাবটি বিশ্লেষণের জন্য কমিটিতে উত্থাপন বা পাবলিক ডিবেটের জন্য উন্মুক্ত করার তোয়াক্কা না করেই হুড়োহুড়ি করে এতে সম্মতি দিতে থাকেন বুকেলের অনুগত আইনপ্রণেতারা। ৫৭ জনের সমর্থনের মুখে বানের জলের মতো ভেসে যায় কেবল তিন আইনপ্রণেতার বিরোধী অবস্থান।
প্রস্তাব উত্থাপনের পর তিন ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই এটি আইনে পরিণত হয়।
এই সিদ্ধান্তকে গণতন্ত্রের বিজয় উল্লেখ করে পার্লামেন্টের সভাপতি এরনেস্তো ক্যাস্ত্রো বলেছেন, কোনও নেতা কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন, সে সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ। সুনির্দিষ্ট এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা আরও দৃঢ়, ন্যায্য এবং কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে যাচ্ছি।
তবে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আইনপ্রণেতা মারসেলা ভিয়াতোরো বলেছেন, এল সালভাদরে আজ গণতন্ত্রের মৃত্যু হলো।
নতুন সংশোধনীতে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধি করে ছয় বছরে উন্নীত করা, রান-অফ নির্বাচন বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী নির্বাচনের সময় দুবছর এগিয়ে ২০২৭ সালে নির্ধারণ করা হয়। এতে বিরোধীদের সংঘবদ্ধ হয়ে শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ খর্ব করার চেষ্টা করছেন বুকেলে।
প্রায় বারো বছরের ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের পর ১৯৯২ সালে দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও ব্যবস্থাটির প্রতি মানুষের খুব একটা আস্থা নেই। কেননা এরপরই দেশটিতে গ্যাং কালচার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, যা দেশটির মানুষ গণতন্ত্রের পুরোপুরি ব্যর্থ হিসেবে গণ্য করেন।
এক সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী স্ট্রিট গ্যাং (অপরাধচক্র) নিশ্চিহ্ন করার জন্য অনেক মানুষের কাছে তিনি জনপ্রিয় হলেও বুকেলের বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের আদর্শ প্রতিষ্ঠার স্বঘোষিত কাণ্ডারি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এল সালভাদরের সাংবিধানিক সংশোধনী নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলে মার্কো রুবিওর কার্যালয় থেকে কোনও সাড়া দেওয়া হয়নি।
দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর দেশটির সঙ্গে ওয়াশিংটনের মিত্রতা নতুন মাত্রা লাভ করেছে। চলতি বছর মার্চে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ২৩৮ জন ভেনেজুয়েলান অভিবাসীকে এল সালভাদরের কারাগারে রাখার মাধ্যমে হোয়াইট হাউজের প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্য প্রদর্শন করেছে বুকেলে প্রশাসন।সে সময় বুকেলের ভূয়সী প্রশংসা করে ট্রাম্প তাকে 'অসাধারণ এক প্রেসিডেন্ট' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি জিনা রোমেরো অভিযোগ করেছেন, নীরবতা পালন করে মূলত বুকেলে প্রশাসনকে রক্ষা করছে হোয়াইট হাউজ। এল সালভাদরের আদালত, পার্লামেন্ট, সংবাদমাধ্যম, বয়ান (ন্যারেটিভস) সবকিছুর ওপর বুকেলের একচ্ছত্র আধিপত্য যদি স্বৈরাচার না হয়, তবে স্বৈরাচার কাকে বলে আমি জানি না।
বুকেলের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রয়াস নিয়ে দেশটির জনগণকে খুব একটা গা করতে দেখা যায়নি। বরং সামনের কিছু সরকারি ছুটি নিয়ে মানুষ ভ্রমণ পরিকল্পনায় ব্যস্ত।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স








