গত কয়েক বছরে নিকটতম প্রতিবেশী দেশগুলোতে সহিংস বিক্ষোভের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল দেখল ভারত। এই তালিকায় নতুনভাবে যুক্ত হলো নেপালের নাম। সেখানে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির প্রতিবাদে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছিল। তবে ভুয়া খবর ছড়ানোর কারণে সানাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করলে তার প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। একদিনের মধ্যেই সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও ততক্ষণে সহিংসতায় অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়। এরপর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি।
তবে ওলি পদত্যাগ করলেও সামলানো যাচ্ছিল না সহিংসতা। সেখানকার বর্তমান চিত্র অনেকটা বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় সরকার পতনের পরের পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নেপালের বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবনে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় এবং একাধিক রাজনীতিবিদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী কারফিউ জারি করেছে নেপালের সেনাবাহিনী।
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) বহুদিন ধরে নিষ্ক্রিয় থাকায় প্রতিবেশী অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিবর্তন মোকাবিলা করা ভারতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আগে থেকেই তলানিতে, বাংলাদেশের সঙ্গে এক বছর ধরে টানাপোড়েন চলছে এবং মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত।
এমনকি ভারত-নেপাল সম্পর্কেও অতীতে সংকট দেখা দিয়েছে। ২০১৯ সালে ভারত একটি মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে নেপালের দাবি করা সীমান্ত অঞ্চল ভারতের অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় নেপালও নিজের মানচিত্র প্রকাশ করে। সম্প্রতি চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছিল নেপাল, যা নিয়ে গত মাসে বেইজিং সফরে গিয়ে ওলি আপত্তি জানান।
বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল তিনটিই ভারতের নিকটতম প্রতিবেশী হলেও ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণে দিল্লি-কাঠমান্ডু সম্পর্কে একটু বাড়তি বিশেষত্বের ছোঁয়া রয়েছে। যেমন, ভারতের পাঁচ অঙ্গরাজ্য উত্তরখণ্ড, উত্তর প্রদেশ, সিকিম, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে নেপালের এক হাজার ৭৫০ কিলোমিটার উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে।
নেপালের চলমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। এখনও পরিস্থিতি শান্ত না হওয়ায় দিল্লি এখন বাড়তি সতর্ক অবস্থানে থাকবে বলে মত প্রকাশ করেছেন জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঙ্গীতা থাপলিয়াল। তিনি বলেন, দিল্লি আরেকটি বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি নেপালে দেখতে চায় না।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) বলেন, নেপালের সহিংসতা হৃদয়বিদারক। বহু তরুণ প্রাণ হারিয়েছে জেনে আমি মর্মাহত। তবে সেখানে স্থিতিশীলতা, শান্তি ও সমৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই, আমার ভাই ও বোনদের শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।
এদিনই মোদি তার মন্ত্রিসভার সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে নেপালের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের ব্যাপক বিক্ষোভের মতোই নেপালের ঘটনায়ও ভারত অপ্রস্তুত ছিল। অথচ, মাত্র সপ্তাহখানেকের মধ্যে দিল্লি সফরের কথা ছিল ওলির।
নেপালের কৌশলগত অবস্থানের কারণে সেখানকার অস্থিরতা ভারতের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, মেজর জেনারেল অশোক মেহতা বলেছেন, হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত দেশটির গা ঘেঁষেই রয়েছে চীনের সামরিক ঘাঁটি ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড, যেখান থেকে ভারতের মাটিতে সহজে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
এছাড়া, ভারতের মাটিতে অবস্থানরত প্রায় ৩৫ লাখ নেপালি এই অস্থিরতার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ শিকার হতে পারেন। এই সংখ্যাটি আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।
নেপাল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। দুই দেশের মধ্যে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর পারিবারিক বন্ধন রয়েছে। ১৯৫০ সালের এক চুক্তির অধীনে নেপালিরা ভিসা বা পাসপোর্ট ছাড়াই ভারতে যাতায়াত ও কাজ করতে পারে। একই চুক্তির আওতায় ভারতের সেনাবাহিনীতে এখনো ৩২ হাজার গুরখা সেনা কর্মরত।
অধ্যাপক থাপলিয়াল বলেন, উন্মুক্ত সীমান্তের কারণে দুই দেশের জনগণ একসঙ্গে বসবাসের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়। প্রতিদিন তারা পরস্পরের সঙ্গে মেলামেশা করে।
এছাড়া, নেপালে রয়েছে হিন্দুধর্মের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। যেমন হিমালয়ের মুক্তিনাথ মন্দির, যেখানে প্রতিবছর হাজারো ভারতীয় তীর্থযাত্রী গিয়ে থাকেন।
অর্থনীতিতেও দেশটি ভারতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তেল ও খাদ্যপণ্যের বড় অংশ ভারত থেকে যায়। দুদেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ সাড়ে আটশ কোটি ডলার।
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ভারতের জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেপালের তিন প্রধান রাজনৈতিক দল—ওলির নেতৃত্বাধীন সিপিএন (ইউএমএল), শেরবাহাদুর দেউবার নেতৃত্বাধীন নেপালি কংগ্রেস এবং পুষ্পকমল দাহাল ‘প্রচণ্ড’-এর নেতৃত্বাধীন সিপিএন (মাওবাদী কেন্দ্র)—সবার সঙ্গেই ভারতের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণে নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় বরাবরই ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আসছে চীন। আর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও বড় শক্তিগুলোর মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের উচিত হবে নেপালের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করা এবং ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্মের কাছে আস্থা গড়ে তোলা। অধ্যাপক থাপলিয়াল বলেন, নেপালে তরুণদের জন্য সুযোগ সীমিত। ভারতকে তাদের জন্য বৃত্তি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিতে হবে।
অশোক মেহতা বলেন, প্রতিবেশীদের অবহেলা করে কেবল শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়ার দৌড়ে রয়েছে ভারত। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রথমেই প্রতিবেশী দেশে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি








